
ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের মধ্যে একটি কূটনৈতিক জটিলতা তৈরির ইঙ্গিত মিলছে। বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরানোর দাবি করল তারেক রহমানের বিএনপি সরকার। ভারত অবশ্য জানিয়েছে, এই অনুরোধটি বিবেচনা করছে, তবে এ বিষয়ে একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ আইনি ও বিচার ব্যবস্থা প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই অগ্রসর হবে।
তাড়াহুড়ো করতে রাজি নয় কেন্দ্রীয় সরকার
ভারত স্পষ্ট জানিয়েছে, শেখ হাসিনার বিষয়টি নিয়ে তারা কোনও তাড়াহুড়ো করতে রাজি নয় কেন্দ্রীয় সরকার। ভারতের বিদেশমন্ত্রক এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এই অনুরোধটি বর্তমানে ভারতের অভ্যন্তরীণ আইনি ও বিচার প্রক্রিয়ার অধীনে গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দিল্লির এই অবস্থান থেকে স্পষ্ট, বিষয়টি কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং একটি দীর্ঘ আইনি পথে অগ্রসর হবে।
দীর্ঘদিন নীরব থাকার পর শেখ হাসিনার বিষয়ে ভারতের এই সাম্প্রতিক অবস্থানকে বিশ্লেষকরা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন। পূর্বে বিষয়টি নিয়ে কোনও মন্তব্য না করলেও, বর্তমানে ভারত সরকার একে ‘তদন্তাধীন’ এবং ‘আইনি প্রক্রিয়ার অধীন’ বলে স্বীকার করে নিয়েছে। মনে করা হচ্ছে, বাংলাদেশের বিএনপি সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখতেই নয়াদিল্লি তার কৌশলে এই সামান্য পরিবর্তন এনেছে। বিশেষ করে দুই দেশের বিদেশন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে ঢাকা যখন এই দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছে, তখন তাকে পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া ভারতের পক্ষে সম্ভব ছিল না।
শেখ হাসিনা ভারতেই রয়েছেন
২০২৪ সালের অগাস্টে মাসে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লিগ সরকারের পতনের পর থেকে শেখ হাসিনা ভারতেই অবস্থান করছেন। ডিসেম্বরে বাংলাদেশের তত্কালীন অন্তর্বর্তী সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর প্রত্যর্পণের আবেদন জানালে বিষয়টি দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। ঢাকা জানিয়েছে, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনা ও প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। এই আইনি রায়ের ওপর ভিত্তি করেই বর্তমান সরকার তাঁদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে নয়াদিল্লির ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করছে।
জটিল আইনি লড়াইয়ের দিকে মোড়
এরই মধ্যে বাংলাদেশের সংসদে একটি নতুন আইন পাস হয়েছে যা সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত সংগঠন ও ব্যক্তিদের নিষিদ্ধ করার পথ প্রশস্ত করে। যদিও এই আইনে সরাসরি কোনও রাজনৈতিক দলের নাম নেওয়া হয়নি, তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এর লক্ষ্য মূলত আওয়ামী লিগ ও তার সহযোগী সংগঠনগুলি। এই নতুন আইন এবং মৃত্যুদণ্ডের খাঁড়া ঝুলতে থাকায় শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ বিষয়টি এখন আর কেবল কূটনৈতিক অনুরোধে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা একটি জটিল আইনি লড়াইয়ের দিকে মোড় নিয়েছে।
ভারতের জন্য এই মুহূর্তে সিদ্ধান্তটি নেওয়া অত্যন্ত কঠিন এবং চ্যালেঞ্জিং। একদিকে যেমন দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র শেখ হাসিনার সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্কের দায়বদ্ধতা রয়েছে, অন্যদিকে প্রতিবেশী বাংলাদেশের নতুন প্রশাসনের সঙ্গে কৌশলগত ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাওয়াও নয়াদিল্লির জন্য জরুরি। প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক চুক্তির খুঁটিনাটি খতিয়ে দেখার ওপর ভারত যে জোর দিচ্ছে, তা মূলত এই কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষারই একটি প্রয়াস।