
শিলিগুড়ি করিডোর থেকে মাত্র ১০০-২০০ কিলোমিটার দূরে বাংলাদেশের বগুড়া। আর সেখানেই তুরস্কের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ড্রোন তৈরির কারখানা গড়ার পরিকল্পনা করছে ঢাকা। একই সময়ে চিনের সঙ্গেও স্থানীয়ভাবে ড্রোন তৈরির চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। ফলে ভারতের পূর্ব সীমান্তে শুধু বিদেশি ড্রোন কেনার ছবি নয়, ধীরে ধীরে স্থানীয় উৎপাদন ক্ষমতা তৈরির সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে। ভারতের জন্য উদ্বেগের জায়গাটা ঠিক এখানেই। কারণ বগুড়ার প্রস্তাবিত কারখানা এমন এক কৌশলগত অঞ্চলের কাছে, যেখান থেকে শিলিগুড়ি করিডোর খুব বেশি দূরে নয়।
শিলিগুড়ি করিডোর, যাকে ‘চিকেনস নেক’ বলা হয়, ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথ। সেই করিডোরের কাছে বাংলাদেশের ড্রোন উৎপাদন ও মেরামতির সক্ষমতা তৈরি হলে ভবিষ্যতে বিষয়টি শুধু একটি শিল্প প্রকল্প হিসেবে দেখার সুযোগ কমে যাবে। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বগুড়াকে বিশাল সামরিক ড্রোন ঘাঁটি বলা এখনই ঠিক হবে না। তবে ভারতকেও পাল্টা কৌশল ঠিক রাখতেই হবে।
বগুড়ার প্রস্তাবিত কারখানার পাশে বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার কাজ চলছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রথম বিমানবাহিনী ঘাঁটি তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। অর্থাৎ একই অঞ্চলে বিমান পরিকাঠামো, সামরিক উপস্থিতি এবং সম্ভাব্য ড্রোন উৎপাদন পরিকাঠামো তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশের ড্রোন কর্মসূচি অবশ্য একেবারে নতুন নয়। ২০২২ সালে তুরস্কের Bayraktar TB2 ড্রোনের জন্য চুক্তি করেছিল ঢাকা। রিপোর্ট অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশের হাতে ১২টি TB2 রয়েছে। তুরস্কের Roketsan TRG-300 Kaplan গাইডেড রকেটও বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জামের অংশ।
এরপর আরও বড় পদক্ষেপের সম্ভাবনা সামনে আসে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে Baykar-এর সঙ্গে TB2-এর কিছু অংশ বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে তৈরির বিষয়ে আলোচনা চলছিল বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। এয়ারফ্রেমের বিভিন্ন অংশ, সেন্সর হাউজিং এবং গ্রাউন্ড-কন্ট্রোল মডিউলের মতো সরঞ্জাম স্থানীয়ভাবে তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে। তুরস্কের ইঞ্জিনিয়াররা বাংলাদেশি কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথাও রিপোর্টে উঠে এসেছে।
এখানেই ভারতের জন্য আসল উদ্বেগ বলে মত আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের। বাংলাদেশ এখন কতগুলি ড্রোন কিনছে, সেটাই একমাত্র বিষয় নয়। বরং আগামী দিনে বাংলাদেশ কতটা নিজের দেশে ড্রোনের অংশ তৈরি করতে পারবে, কত দ্রুত মেরামত করতে পারবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ড্রোনের জায়গায় নতুন ড্রোন তৈরি করতে পারবে, সেটাই কৌশলগতভাবে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ আমদানি করা ড্রোনের ক্ষেত্রে বিদেশি স্পেয়ার পার্টস এবং মেরামতির ব্যবস্থার উপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু স্থানীয় উৎপাদন ব্যবস্থা তৈরি হলে সেই নির্ভরতা কমতে পারে। কোনও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত বা উত্তেজনার পরিস্থিতিতে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত ড্রোন মেরামত কিংবা নতুন ড্রোন তৈরির ক্ষমতা সামরিক ক্ষেত্রে বড় সুবিধা হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের হাতে এই শিল্প গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আরও একটি সুবিধা রয়েছে। সেটি হল দেশের বিশাল পোশাক ও টেক্সটাইল শিল্প। প্রায় ৪০ লক্ষ পোশাককর্মীর দক্ষতা ভবিষ্যতে ড্রোনের কম্পোজিট কাঠামো তৈরির কিছু কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে বলে সামরিক পর্যবেক্ষকদের মত। আধুনিক ড্রোনের কাঠামোতে কম্পোজিট উপাদানের ব্যবহার রয়েছে। টেক্সটাইল শিল্পের নির্ভুল কাটিং, প্যাটার্ন এবং হাতে কাজের অভিজ্ঞতা কম্পোজিট প্লাই কাটিং, কিটিং, লে-আপ এবং স্টিচড প্রি-ফর্ম তৈরিতে কাজে লাগতে পারে।
আর এই জায়গায় তুরস্কের প্রযুক্তিগত সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ভারতের মতো বাংলাদেশকে শূন্য থেকে পুরো অ্যারোস্পেস শিল্প তৈরি করতে হবে না। তুরস্ক যদি ডিজাইন, উপকরণ, উৎপাদন পদ্ধতি এবং মান নিয়ন্ত্রণের প্রযুক্তি সরবরাহ করে, তাহলে সেই শিল্পগত পরিবর্তন অনেক দ্রুত ঘটতে পারে। রিপোর্টে এমন সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে যে, ভারতের ক্ষেত্রে যেখানে এই ধরনের সক্ষমতা গড়ে উঠতে ১৫-২০ বছর লেগেছে, বাংলাদেশ প্রযুক্তি হস্তান্তরের সুবিধায় ৫-৮ বছরের মধ্যে অনেকটা পথ এগিয়ে যেতে পারে। তবে এটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ, নিশ্চিত ফল নয়।
তুরস্কের পাশাপাশি চিনও বাংলাদেশের ড্রোন কর্মসূচির আরেক গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি অংশীদার। চলতি বছরের জানুয়ারিতে চিনের CETC ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে ৬০৮ কোটি বাংলাদেশি টাকার, অর্থাৎ প্রায় ৫০ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি করেছে ঢাকা। সেই চুক্তির আওতায় XY-I ড্রোন বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। এই ড্রোনকে বিভিন্ন রিপোর্টে TB2-এর সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তৈরি হচ্ছে একটি দ্বিমুখী পথ। একদিকে তুরস্কের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে বগুড়ায় ড্রোন কারখানার পরিকল্পনা, অন্যদিকে চিনের সঙ্গে স্থানীয়ভাবে ড্রোন তৈরির চুক্তি। দুই দেশের কাছ থেকে প্রযুক্তি পাওয়ার ফলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের নিজস্ব ড্রোন উৎপাদন ক্ষমতা কতটা বাড়ে, সেটিই এখন নজরে রাখার বিষয়।
ভারতের উদ্বেগ আরও বাড়তে পারে ড্রোনের সংখ্যা নিয়ে। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে শুধু অত্যাধুনিক একটি ড্রোন থাকা যথেষ্ট নয়। তুলনামূলক কম খরচে দ্রুত বিপুল সংখ্যায় ড্রোন তৈরি করা গেলে ক্ষয়ক্ষতির পরেও দ্রুত নতুন ড্রোন নামানো সম্ভব। তাই স্থানীয় উৎপাদন ও মেরামতির ক্ষমতা তৈরি হলে বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতার চরিত্রও বদলাতে পারে।
ভারতের সামনে আরও একটি সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ রয়েছে। পাকিস্তান ইতিমধ্যেই তুরস্কের ড্রোন ব্যবহার করছে। ভবিষ্যতে ভারতের পশ্চিম সীমান্তে পাকিস্তানের তুরস্ক-নির্মিত ড্রোন এবং পূর্বদিকে বাংলাদেশের তুরস্ক-সমর্থিত উৎপাদন ও মেরামতি পরিকাঠামো তৈরি হলে ভারতের কাউন্টার-ড্রোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উপর দুই দিক থেকে চাপ বাড়তে পারে। তবে এটিকে সম্ভাব্য পরিস্থিতি হিসেবেই দেখা হচ্ছে, বর্তমান বাস্তবতা হিসেবে নয়।
তাহলে ভারতের করণীয় কী? রিপোর্টে বলা হয়েছে, ভারতের ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের তুলনায় উন্নত টেকনিক্যাল-টেক্সটাইল শিল্প রয়েছে। সুরাত ও কোয়েম্বাটোরের মতো জায়গায় গ্লাস ও কার্বন ফাইবারের শিল্প রয়েছে। এই পরিকাঠামোকে ভারতীয় ড্রোন নির্মাতাদের সঙ্গে যুক্ত করে বড় আকারে ড্রোনের এয়ারফ্রেম উৎপাদন বাড়ানো যেতে পারে।
পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ, অসম এবং শিলিগুড়ি করিডোর এলাকায় বহুস্তরীয় কাউন্টার-ড্রোন ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা গুরুত্বপূর্ণ। ড্রোন শনাক্ত করা থেকে শুরু করে দ্রুত তা নিষ্ক্রিয় করা, গোটা ব্যবস্থাকেই আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন হতে পারে।
ভারতের নজর রাখতে হবে বাংলাদেশে শিল্প পরিকাঠামোর পরিবর্তনের দিকেও। তুরস্কের কম্পোজিট বা টেকনিক্যাল-টেক্সটাইল সংস্থা বাংলাদেশে ঢুকছে কি না, নতুন রিইনফোর্সমেন্ট-ফ্যাব্রিক কারখানা হচ্ছে কি না, অটোক্লেভ, কিউরিং ওভেন বা নন-ডেস্ট্রাকটিভ টেস্টিংয়ের মতো শিল্প সরঞ্জাম আমদানি বাড়ছে কি না, এগুলি বাংলাদেশের ড্রোন শিল্প কতটা গভীরে যাচ্ছে তার গুরুত্বপূর্ণ সূচক হতে পারে।
আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের জন্য সতর্ক হওয়ার জায়গাটা যথেষ্ট স্পষ্ট। আজ বাংলাদেশের হাতে কতগুলি ড্রোন রয়েছে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশ নিজের মাটিতে কতগুলি ড্রোন তৈরি, মেরামত এবং দ্রুত প্রতিস্থাপন করতে পারবে। আর সেই সম্ভাব্য সক্ষমতার কেন্দ্র যদি শিলিগুড়ি করিডোর থেকে মাত্র ১০০-২০০ কিলোমিটার দূরে তৈরি হয়, তাহলে ভারতের পূর্ব সীমান্তের কৌশলগত হিসাবেও তার প্রভাব পড়তে পারে।