
গ্যাস সঙ্কটের মধ্যেই বাংলাদেশ জুড়ে তীব্র আকার ধারণ করেছে লোডশেডিং। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় নাজেহাল অবস্থা সাধারণ মানুষের। সকাল, দুপুর কিংবা রাত নেই, সবসময়ই বিদ্যুৎ যাচ্ছে- এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলে পরের দেড় ঘণ্টা থাকে না, এমনটাই অভিযোগ সেদেশের আম জনতার। তীব্র গরমে ধারাবাহিক বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে বিপাকে পড়েছেন সকলে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বৃহস্পতিবার অর্থাৎ আজ থেকে রাত ৮টার মধ্যেই সারাদেশে শপিংমল ও দোকানপাট বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে সরকার। এ সংক্রান্ত একটি নির্দেশিকারও জারি করা হয়েছে।
সরকারি নির্দেশিকা জারি
বুধবার (১২ অগাস্ট) বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রকের উপসচিব মামুন ভুইঁয়া স্বাক্ষরিত এই নির্দেশিকা দেওয়া হয়। যাতে বলা হয়েছে, গত ১১ জুন রাত ৯টা পর্যন্ত দোকানপাট খোলা রাখার সিদ্ধান্ত বলবৎ ছিল। তবে বর্তমানে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলমান বিদ্যুৎ সঙ্কট মোকাবিলায় ১২ অগাস্ট এই সিদ্ধান্ত হয় যে, আগামী ১৩ অগাস্ট থেকে সারাদেশের সকল শপিংমল ও দোকানপাট রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ করতে হবে। এদিকে সকাল ১১টা থেকে দোকানপাট, শপিংমল খুলতে হবে। অর্থাৎ সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত শপিংমল ও দোকানপাট খোলা রাখা যাবে।
মেলা ও জলসাতেও কোপ
নির্দেশিকায় আরও বলা হয়েছে, সারাদেশে যে কোনোও প্রকার বিলবোর্ড ও সাইনবোর্ড সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বন্ধ করতে হবে। তবে খাবারের দোকান, ওষুধের দোকান ও হাসপাতাল এই নির্দেশের আওতায় পড়বে না। বর্তমানে বাংলাদেশে কোনও মেলা, কিংবা রাতের কোনও অনুষ্ঠান এবং যেকোনও প্রকার সাজসজ্জাও বন্ধ থাকবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালায়। পাল্টা হামলা করে ইরান। তারপর যুদ্ধ পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। তখন জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি সঙ্কট আরও প্রকট রূপ নেয়। তার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ে। গ্যাস সঙ্কটে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সঙ্কট আরও তীব্র হচ্ছে। এর ফলে গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দারা দীর্ঘ সময় লোডশেডিংয়ের শিকার হচ্ছেন। গ্রাহকদের অভিযোগ, কোনও কোনও জায়গায় দিনে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। বিদ্যুতের এই সঙ্কটে বাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও কৃষিকাজ ব্যাহত হচ্ছে। এদিকে বিদ্যুৎ নিয়ে জনঅসন্তোষ বাড়তে থাকায় কয়েকটি জেলার বিদ্যুৎ বিতরণ কর্তৃপক্ষ নিজেদের কার্যালয় ও উপকেন্দ্রে বাড়তি নিরাপত্তা চেয়েছে।
কত ঘাটতি?
বড় শহরগুলোর বাইরে বিদ্যুতের ঘাটতি বিশেষভাবে তীব্র হয়ে উঠেছে। জাতীয় গ্রিডের বুধবার (১২ Dieস্ট) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সকাল ৮টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ২৪৯ মেগাওয়াট, বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১২ হাজার ৯৩৫ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি ছিল ২ হাজার ৩১৪ মেগাওয়াট। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও জরুরি সেবাও ব্যাহত হচ্ছে। গরমের মধ্যে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষ দুর্ভোগে পড়ছেন। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় সমস্যা হচ্ছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও ক্ষতির মুখে পড়ছে।
আমদানি নির্ভরতায় ভুগছে জ্বালানি খাত
বাংলাদেশে ব্যবহৃত জ্বালানির ৬৫ শতাংশের বেশি আমদানি করতে হয়। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতারও ৯ শতাংশের উৎস আমদানি। প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এতে বেড়ে গেছে গ্যাসের সঙ্কট। আমদানি করা বিদ্যুৎ থেকেও কমেছে সরবরাহ। তাই বেড়েছে লোডশেডিং। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমদানিনির্ভরতার কারণেই ভুগছে বংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত। এই পরিস্থিতি কবে পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে সেটি নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন বলেও জানিয়েছেন মন্ত্রী।
যে ৩ কারণে বিদ্যুৎ সঙ্কট
বাংলাদেশে বর্তমানে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের কিছু বেশি। কিন্তু খাতা কলমে বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৩৩ হাজার ৯২ মেগাওয়াট। কিন্তু তারপরও বিদ্যুৎ নিয়ে কেন এই অস্থিরতা? বর্তমানে তীব্র বিদ্যুৎ সঙ্কট এবং রেকর্ড পরিমাণ লোডশেডিংয়ের পেছনে তিনটি কারণ চিহ্নিত করেছেন বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশই গ্যাসভিত্তিক। কিন্তু সম্প্রতি মহেশখালীতে এলএনজি (তরল প্রাকৃতিক গ্যাস) টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে গেছে। চাহিদার তুলনায় অনেক কম গ্যাস পাওয়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না। এছাড়া দেশের অন্যতম বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতেও কয়লা সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। কারিগরি ত্রুটির কারণে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে বড়পুকুরিয়ার মতো বৃহৎ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে। অন্যদিকে, বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন বেসরকারি কেন্দ্র ও আমদানিকারকদের কাছে সরকারের বড় অঙ্কের বকেয়া বিল জমে যাওয়ার কারণেও এই নিয়ে জটিলতা বেড়েছে। গ্যাস ও কয়লার তীব্র সঙ্কটের সঙ্গে যোগ হয়েছে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি হ্রাস। প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে ভারত থেকে বিদ্যুৎ রফতানি। আদানির কাছ থেকে ১৪৯৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসে প্রায় দিনই বাংলাদেশে। এখন তা ১০১৩ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে। এ ছাড়াও সঞ্চালন লাইনের সমস্যা এবং বিদ্যুৎ বিতরণী কোম্পানিগুলোর অন্তর্কোন্দলের কারণে গ্রাহকরা বিদ্যুৎ নিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েন বলেও কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। যা পরিস্থিতি, সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে আরও অন্তত এক সপ্তাহ লাগতে পারে।