
বুধবার ভার্চুয়ালি সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে শেখ হাসিনা সাফ জানিয়েছেন, তিনি বাংলাদেশে ফিরবেন। বিএনপি সরকারের তরফে আগেই জানানো হয়েছিল, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হাসিনা বাংলাদেশে ফিরলে তাঁকে আত্মসমর্পণের সুযোগও দেওয়া হবে না। গ্রেফতার করা হবে। তবে হাসিনা বলেন, '১৯৮১ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলেও আমাকে বাংলাদেশে ফিরতে বাধা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। তবে সেই বাধা উপেক্ষা করে দেশে ফিরেছিলাম। এবারও ফিরব।'
মুজিবুর রহমানের মৃত্যু ও হাসিনার নির্বাসন
হাসিনা গতকাল বলেন, এর আগে তিনি যখন বাংলাদেশে ফিরেছিলেন তখনও তাঁর প্রাণের সঙ্কট ছিল। কেন একথা বললেন তিনি? জানতে গেলে ফিরে যেতে হবে সেই ১৯৭৫ সালে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের হাত থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে নিয়ে বাংলাদেশ আত্মপ্রকাশ করে। মুজিব প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেন। তবে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশকে একাধিক বড় সঙ্কটের মুখে পড়তে হয়। খাদ্যাভাব, প্রশাসনিক দুর্বলতা, দুর্নীতি, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ সরকারের উপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করে। বঙ্গবন্ধুর নিজের দলের অভ্যন্তরেও বিদ্রোহ শুরু হয়। একই সময়ে বিভিন্ন সশস্ত্র রাজনৈতিক গোষ্ঠীর কার্যকলাপ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিও পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে।
এই পরিস্থিতিতে ১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থা চালু হয়। তখন বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামি লিগ (বাকশাল) নামে একদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন মুজিবুর রহমান। অধিকাংশ রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা হয়। সংবাদপত্রের সংখ্যাও সীমিত করা হয়। এই পদক্ষেপের জেরে বিরোধের মুখে পড়েন মুজিবুর।
অসন্তোষের জেরে ক্রমাগত অচলাবস্থা জারি হয় বাংলাদেশে। ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট মুজিবুর রহমানের বাসভবনে হামলা চালায় একদল সশস্ত্র দুষ্কৃতী। তাঁকে ও পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হত্যা করা হয়। তখন বিদেশে ছিলেন মুজিবের দুই কন্যা হাসিনা ও রেহেনা। তাঁরা প্রাণে বেঁচে যান। এই হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশে একের পর এক সামরিক অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটে। দীর্ঘ সময় ধরে সামরিক শাসন চলতে থাকে।
তখন হাসিনার অবস্থান
মুজিবুর রহমানকে যখন হত্যা করা হয় তখন হাসিনা তাঁর দুই সন্তান ও স্বামীর সঙ্গে ছিলেন পশ্চিম জার্মানিতে। বাবার মৃত্যুর খবর শুনেও তিনি বাংলাদেশে ফিরতেও পারেননি। তাঁকে তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার দেশে ফেরার অনুমতি দেয়নি। তবে ভারত হাসিনা ও তাঁর পরিবারকে সাহায্য করেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী মুজিবুর-কন্যাকে ভারতে আশ্রয় দেন। ১৯৭৫ সালের শেষের দিকে তিনি আসেন ভারতে। প্রায় ৬ বছর থাকেন সরকারের কড়া নিরাপত্তায়। এরপর ১৯৮১ সালের ১৭ মে তিনি বাংলাদেশে ফেরেন।
ভারতে থেকেই আওয়ামি লিগের কাজ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা দাবি করেন, মুজিবুর রহমান বেঁচে থাকাকালীন শেখ হাসিনা রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না। তবে ভারতে থাকাকালীন আওয়ামি লিগের রাশ নিজের হাতে তুলে নেন। ভারতে থাকাকালীনই আওয়ামি লিগ তাঁকে দলের সভাপতি নির্বাচিত করে। সেখান থেকেই সাংগঠনিক কাজকর্ম করতে থাকেন। বিপুল জনসমর্থনও পান। আর সেই কারণেই তাঁর বাংলাদেশে ফেরার পথ প্রশস্ত হয়।
হাসিনার প্রত্যাবতর্ণের সময় বাংলাদেশের অবস্থা
১৯৮১ সালে হাসিনার ফেরার সময় বাংলাদেশের অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। ক্ষমতায় ছিল জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত বিএনপি। রাষ্ট্রপতি ছিলেন জিয়াউর নিজেই। গতকাল হাসিনা জানিয়েছিলেন, জিয়াউর রহমানের আমলে তাঁকে দেশে ফিরতে বাধা দেওয়া হয়েছিল। তবে জিয়াউর রহমান নিজে বা তাঁর সরকার বাধা দিয়েছিলেন কি না সেই সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায় না। ঐতিহাসিক দলিল, প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ এবং শেখ হাসিনার নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ছিল। তবে তিনি ফিরেছিলেন।
হাসিনার ফেরার সেই ঐতিহাসিক দিন
১৯৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরেছিলেন। আওয়ামি লিগের কর্মী-সমর্থকরা দিনটিকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালন করে থাকে। সেদিন মুজিব-কন্যাকে স্বাগত জানাতে ঢাকার কুর্মিটোলা বিমানবন্দরের বাইরে মানুষের ঢল নেমেছিল। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখো মানুষ সেখানে জড়ো হয়েছিলেন। ফার্মগেট থেকে কুর্মিটোলা পর্যন্ত পুরো রাস্তাজুড়ে ছিল মানুষের ঢল।
আওয়ামি লিগ দাবি করেছিল, হাসিনাকে সংবর্ধনা জানাতে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ জড়ো হয়েছিলেন। হাসিনা সেদিন বলেছিলেন, 'আমি আওয়ামি লিগের নেতা হতে দেশে ফিরিনি। আমি মানুষের পাশে থেকে স্বাধীনতার সংগ্রামে অংশ নিতে দেশে ফিরেছি। আমি আপনাদের বোন হিসেবে, আপনাদের মেয়ে হিসেবে এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী আওয়ামি লিগের একজন কর্মী হিসেবে আপনাদের পাশে থাকতে চাই।'
তখন ও এখনকার পরিস্থিতির ফারাক
শেখ হাসিনা গতকাল বলেন, 'বাংলাদেশে গেলে আমাকে জেলে পাঠানো হতে পারে। আমাকে হত্যা করা হতে পারে... যা-ই ঘটুক না কেন, আমাকে বাংলাদেশে ফিরতেই হবে। আমার মানুষের জন্য ফিরতেই হবে।'আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, হাসিনা বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণা করলেও তিনি জানেন, ১৯৮১ সালের পরিস্থিতি এবং আজকের পরিস্থিতির মধ্যে আকাশ পাতাল ফারাক। সেই সময় আওয়ামি লিগের সভানেত্রী হিসেবে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিলেন তিনি। তবে এখন তিনি ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী। যাঁর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগই শুধু নয়, বিভিন্ন মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। এমনকী বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মানবতাবিরোধী অপরাধে তাঁকে মৃত্যুদণ্ডের সাজাও শুনিয়েছে।
শুধু তাই নয়, হাসিনার ভারতে অবস্থানকে মোটেই ভালোভাবে নিচ্ছে না বাংলাদশ সরকার। একাধিকবার তা পরোক্ষে বুঝিয়ে দিয়েছে তারেক রহমানের সরকার। গতকাল হাসিনার ভার্চুয়ালি সংবাদ সম্মেলন যে ভালোভাবে তারা নেয়নি তা পরিষ্কার করে দিয়েছে তারা। হাসিনার বক্তব্যের পরই সেই দেশের বিদেশমন্ত্রক বিবৃতি জারি করে। সেখানে বলা হয় 'নয়াদিল্লিতে পলাতক ও দণ্ডপ্রাপ্ত এবং গণহত্যার জন্য দায়ী শেখ হাসিনাকে গণমাধ্যমের সঙ্গে সরাসরি আলাপচারিতার সুযোগ দেওয়ায় বাংলাদেশ ক্ষুব্ধ। সেখানে তিনি ও তাঁর সহযোগীরা বাংলাদেশ ও তার জনগণের বিরুদ্ধে বিষোদগার করেছেন।
দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে এই ঘটনার সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে ভারত সরকারের কাছে আগেই উদ্বেগ জানানো সত্ত্বেও এই প্রকাশ্য অনুষ্ঠান আয়োজনের অনুমতি দেওয়ায় ঢাকা গভীর দুঃখপ্রকাশ করছে। ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনার এই আলাপচারিতা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননা এবং জুলাই বিপ্লবের শহিদদের প্রতি চরম অপমান হিসেবে গণ্য হচ্ছে।'
আবার বাংলাদেশে এখন প্রধান বিরোধী দল জামাত ইসলাম। তারা নীতি ও আদর্শগতভাবে হাসিনার কট্টর বিরোধী। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী যাতে দেশে ফিরতে না পারে, সেজন্য বিএনপি সরকারের উপর তারা চাপ বাড়াতেই থাকবে। কারণ আওয়ামি লিগ ফের সক্রিয় হলে চাপ বাড়বে জামাতের উপর। তাদের অস্তিত্বের সঙ্কটও হতে পারে।
কারণ, ২০২৬ সালের ভোটে আওয়ামি লিগকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ভোটে অংশগ্রহণই করতে দেওয়া হয়নি। নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত গড় ভোটার উপস্থিতি ছিল ৫৯.৪৪%। প্রায় ১২.৭৭ কোটি নিবন্ধিত ভোটারের মধ্যে এই হারে ভোট পড়েছিল। আওয়ামি লিগ এই ভোটকে অসাংবিধানিক বলেছিল। তারা এই ভোটের ফলাফলও মানতে চায়নি।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে এই পরিস্থিতিতে, হাসিনা বাংলাদেশে ফিরতে চাইলে তাঁকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে। তিনি কীভাবে সব কিছুর মোকাবিলা করবেন, সেটাই এখন দেখার। তবে এটাও ঠিক আগের বার যখন দেশে ফিরেছিলেন তখন ক্ষমতায় ছিল বিএনপি, এখনও কিন্তু ক্ষমতায় সেই দলই।