
বর্ষা আসতেই শুরু হয়ে যায় ইলিশের মরশুম। ইতিমধ্যেই ইলিশ উঠতে শুরু করে দিয়েছে বাংলার মৎস্যজীবীদের জালে। কাকদ্বীপ, নামখানা, রায়দিঘি, পাথরপ্রতিমা থেকে এই ইলিশ ডায়মন্ডহারবারে পাঠানো হচ্ছ। বৃষ্টি বাড়লে আরও বেশি ইলিশ আসবে জালে। এই বছর মরশুমের প্রথম থেকেই মৎস্যজীবীদের জালে আসছে ইলিশ। কাকদ্বীপ ফিশারম্য়ান অ্যান্ড ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বিজন মাইতি বলছেন, '১৫ জুন থেকেই ইলিশ ধরতে ট্রলার বেরিয়ে পড়েছে। কম বেশি সব ট্রলারই মাছ নিয়ে ফিরেছে। আবার মাছ ধরতেও যাচ্ছে। আশা করছি, আগামী দিন ১৫ পর থেকেই ট্রলারগুলি আরও বেশি পরিমাণে মাছ ধরতে পারবে।' এরাজ্যে যখন কমবেশি ইলিশ উঠতে শুরু করেছে তখন প্রতিবেশী বাংলাদেশে পরিস্থিতি অনেকটাই বিপরীত। ইলিশের মরশুম শুরু বলেও বাংলাদেশে ইলিশের জন্য বিখ্যাত জেলা চাঁদপুরের বাজারে বাড়ছে না মাছটির সরবরাহ। ভরা মরশুমেও পদ্মা ও মেঘনা নদীতে মিলছে না রুপোলি ইলিশের দেখা। দিনে-রাতে নদীতে জাল ফেললেও পাওয়া যাচ্ছে না ইলিশ। যেন নিখোঁজ হয়ে গেছে ইলিশ!
পদ্মা মেঘনায় দেখা নেই ইলিশের
বাংলাদেশে ভরা মরশুমেও জেলেদের জালে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ ধরা না পড়ায় মৎস্যজীবী, আড়তদার, পাইকার, দাদন ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে হাজারো জেলে পরিবারে নেমে এসেছে হতাশা। জেলেদের দাবি, গত কয়েক বছরে পদ্মা ও মেঘনা নদীতে অসংখ্য ডুবোচর জেগে ওঠায় নদীর নাব্যতা ও গভীরতা কমে গেছে। ফলে ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণ ও অভিবাসন ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, নদী দূষণ, জলের তাপমাত্রা ও লবণাক্ততার পরিবর্তনও ইলিশ উৎপাদন কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন মৎস্য বিশেষজ্ঞরা।
কমছে ইলিশের ডিম ছাড়ার পরিমাণও
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবসহ মানুষের সৃষ্ট নানা কারণে বাংলাদেশে কমছে ইলিশের ডিম ছাড়ার পরিমাণও। নদীতে আগের মতো সব মা ইলিশ ডিম ছাড়তে পারছে না। অনেক এলাকায় ডিম ছাড়ার পরিবেশ নষ্ট হয়েছে। জাটকার বেঁচে থাকার হারও নানা কারণে কমছে। এর প্রভাব ধীরে ধীরে উৎপাদনের ওপর পড়তে শুরু করেছে। ফলে বাজারে চাহিদার তুলনায় ইলিশের সরবরাহ সীমিত থাকছে। দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) ইলিশ গবেষণা কেন্দ্রের তথ্যানুযায়ী, ইলিশের ডিম ছাড়ার পরিমাণ ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে ৯৩ হাজার ২৫৮ কেজি কমেছে। একই সময়ে ডিম ফুটে রেনু পোনা হওয়া কমেছে ৪৬ হাজার ৬১৯ কেজি। পাশাপাশি ইলিশ মাছ (জাটকা) বাঁচার পরিমাণ কমেছে ৪ হাজার ৬৬২ কোটি। এ সময়ে ইলিশ উৎপাদন হয়েছে ২০২৪ সালে ৫.২৯ লাখ টন। মৎস্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন পদ্মা ও মেঘনার মোহনায় ইলিশের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য উদ্ভিদকণা (জুপ্ল্যাংকটন) ও ১২ প্রজাতির প্রাণিকণা (ফাইটোপ্ল্যাংটন)আশঙ্কাজনকভাবে কমে আসছে। যার প্রভাব পড়ছে ইলিশের আকৃতিতেও।
১ কেজি ইলিশের দাম ৩০০০ টাকা!
ইলিশের জন্য বিখ্যাত চাঁদপুর বড় স্টেশন পাইকারি মাছঘাটে, এক কেজি ওজনের ইলিশ ২ হাজার ৭০০ থেকে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের দাম ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা এবং ৫০০ থেকে ৬০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায়। ইলিশ ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ সময় বাজার ইলিশে ভরপুর থাকার কথা। অন্য বছর যেখানে প্রতিদিন গড়ে হাজার মণ ইলিশ আমদানি হতো, সেখানে এখন মাত্র ১০০ থেকে ১৫০ মণ ইলিশ আসছে। এর মধ্যে পদ্মা-মেঘনার স্থানীয় ইলিশ মাত্র ২৫ থেকে ৩০ মণ, বাকিটা আসে সাগর এলাকা ও কক্সবাজার অঞ্চল থেকে। মরশুম শুরু হওয়ায় ইলিশের চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু নদীতে মাছ না পাওয়ায় সেই চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না। বিক্রেতাদের কাছে ইলিশ থাকলেও বেশি দামের কারণে ক্রেতা তুলনামূলক কম।
কমছে ইলিশের আকারও
বাংলাদেশে দুই বছর ধরে ইলিশের উৎপাদন কমছে। বেশি ধরা হচ্ছে ছোট আকারের ইলিশ। গত জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত ধরা পড়া ইলিশের গড় আকার দাঁড়িয়েছে ৩৪ সেন্টিমিটার বা সাড়ে ১৩ ইঞ্চির কাছাকাছি। ইলিশের এই গড় আকার গত বছরের তুলনায় এক ইঞ্চির মতো কম। ইলিশের দামও বছর বছর বাড়ছে। কৃষি বিপণন অধিদফতরের হিসাবে, ঢাকার বাজারভেদে এখন ৪০০ থেকে ৯০০ গ্রাম আকারের ইলিশের প্রতি কেজির দাম দেড় হাজার থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত, যা গত বছরের চেয়ে ৫০ শতাংশ বেশি। ২০২০ সালে ইলিশের সারা বছরের গড় দাম ছিল প্রতি কেজি ৭০১ টাকা। ঢাকার কারওয়ান বাজারের ৯০০ গ্রামের আশপাশের ইলিশের কেজি আড়াই হাজার টাকার মতো। আর ছোট ইলিশ (৪০০ গ্রাম) বিক্রি হচ্ছে দেড় হাজার টাকা কেজি। এককথায়, ইলিশ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। এখন এক কেজি ইলিশের দাম পোশাকশ্রমিকদের ছয় দিনের ন্যূনতম মজুরির সমান।
দাম কি কমবে না?
অন্যবছর এই সময় ইলিশ বেচাকেনায় চরম ব্যস্ততা থাকে। ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়ে বাজার সরগরম থাকে। কিন্তু এখন সেই সরগরম ভাব নেই, দিন দিন তা কমছে। সংবাদ মাধ্যমকে চাঁদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেছেন, নদীতে দূষণ ও ডুবোচর বেড়ে যাওয়ার কারণে চাঁদপুরে ইলিশ কমে গেছে। চাহিদা বেশি থাকায় দামও কমছে না। তবে নদীতে জল বাড়লে আগামী জুলাই থেকে ইলিশের আমদানি কিছুটা বাড়বে এবং দামও কমে আসতে পারে। ইলিশের এই সঙ্কটের প্রভাব শুধু জেলেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মাছ পরিবহন, বরফ কল, আড়ত এবং খুচরো মাছ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত অনেকের আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে ইলিশনির্ভর স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
কেন মিলছে না ইলিশ?
ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে বাংলাদেশ সরকার বড় অঙ্কের টাকা ব্যয় করছে। পাঁচ বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে মৎস্য অধিদফতর। ২০২১ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া ২২৯ কোটি টাকার এ প্রকল্প শেষ হবে দুই মাস পর, কিন্তু দেখা যাচ্ছে উৎপাদন কমছে। ‘ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্প’ নামের এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণে মৎস্য সংরক্ষণ আইন বাস্তবায়ন, অভয়াশ্রম ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ইলিশের উৎপাদন বাড়ানো, জাটকা ও মা ইলিশ আহরণকারী ৩০ হাজার জেলে পরিবারের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা, জেলেদের মধ্যে ১০ জাল বিতরণ এবং প্রচারের মাধ্যমে মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা। জেলে পরিবারকে সহায়তার ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ আছে। প্রকল্প বাস্তবায়নকালেই ইলিশের উৎপাদন কমছে। ২০২১ সালের জুলাইয়ে প্রকল্প হাতে নেওয়ার সময় ইলিশের বছরে উৎপাদন ছিল ৫ লাখ ৫০ হাজার টন। পরের দুই অর্থবছর উৎপাদন কিছুটা বাড়ে। সর্বশেষ দুই অর্থবছর উৎপাদন কমেছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ টনে (২০২২–২৩ অর্থবছরের চেয়ে ৭১ হাজার টন কম)। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের করা সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, তিন অর্থবছরে ধরা পড়া ইলিশের গড় আকারও ছোট হচ্ছে। ২০২২–২৩ অর্থবছরে ধরা পড়া ইলিশের গড় আকৃতি ছিল ১৪.৬৫ ইঞ্চি। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা নেমেছে ১৩.৩৯ ইঞ্চিতে। ইলিশ এক থেকে দুই বছরের মধ্যে দ্রুড় বড় হয়। একটি জাটকা এক বছর বাঁচলে সেটির আকৃতি ১১.৮১ ইঞ্চি পর্যন্ত হয়। একটি ইলিশ পাঁচ থেকে সাত বছর বেঁচে থাকলে ২২.৬৮ ইঞ্চি পর্যন্ত বড় হতে পারে। বাংলাদেশের জাতীয় মৎস্যজীবী সমিতির মহাসচিব ইকবাল হোসেন মনে করেন, নির্বিচার জাটকা, অর্থাৎ ছোট ইলিশ ধরাই উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণ। সবাই ইচ্ছেমতো জাটকা ধরে। সাগরে বড় হওয়ার মতো ইলিশ খুব বেশি থাকে না।