
ইলিশের দেশ বাংলাদেশ। অথচ সেই বাংলাদেশেই এখন ভারতের ইলিশ ঢুকছে টনে টনে। সবথেকে চমকপ্রদ তথ্য হল এই আমদানির বড় অংশের উৎস পশ্চিমবঙ্গ নয়, গুজরাত। গত জুলাই ও অগাস্ট মাত্র দুই মাসে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে ঢুকেছে ৩ লাখ ৫২ হাজার ৪৮৪ কেজি ইলিশ। আমদানি করা মাছের বড় অংশই গুজরাত থেকে পশ্চিমবঙ্গ হয়ে পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পৌঁছেছে।
অথচ ছবিটা গতবছর পর্যন্তও ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। দুর্গাপুজোর আগে প্রতিবারই বাংলাদেশ থেকে ইলিশ আসে ভারতে। বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের বাজারে। ২০২৫ সালেও তা অল্প পরিমাণে এসেছিল। অথচ চলতি বছর থেকে গুজরাতের ইলিশ যাচ্ছে বাংলাদেশে। কিন্তু কেন বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা নিজের দেশের মাছের বদলে ভারতের ইলিশ কিনছেন?
গুজরাত থেকে এত ইলিশ বাংলাদেশে যাচ্ছে কেন?
বাংলাদেশে ইলিশের সরবরাহ কমে যাওয়া এই আমদানির অন্যতম বড় কারণ। বাংলাদেশের মৎস্য দফতরের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক বছর ধরে ইলিশের উৎপাদন ক্রমাগত কমেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে যেখানে প্রায় ৫ লাখ ৭১ হাজার মেট্রিক টন ইলিশ উৎপাদন হয়েছিল, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা নেমে হয় ৫ লাখ ২৯ হাজার মেট্রিক টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন আরও কমে দাঁড়ায় প্রায় ৫ লাখ ৪ হাজার মেট্রিক টনে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাব এখনও পাওয়া যায়নি, তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, উৎপাদন ৫ লাখ টনের নিচে নেমে থাকতে পারে।
ফলে বাংলাদেশের বাজারে ইলিশের জোগান কমেছে। কিন্তু চাহিদা কমেনি। বরং ইলিশ বাংলাদেশের খাদ্যসংস্কৃতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়ায় বাজারে মাছটির চাহিদা রয়েছে। এই পরিস্থিতিতেই ব্যবসায়ীরা ভারত থেকে ইলিশ আমদানি করছেন।
গুজরাতই কেন হয়ে উঠল বড় উৎস?
পশ্চিমবঙ্গের ব্যবসায়ীদের দাবি, গত প্রায় দুই মাসে পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশে প্রায় ৫০০ মেট্রিক টন ইলিশ রফতানি হয়েছে। তার প্রায় পুরোটাই গুজরাত থেকে সংগ্রহ করা। গুজরাতের ভাদভূত, বিশেষ করে নর্মদা নদী যেখানে সাগরে মিশেছে, সেই অঞ্চলে ইলিশের ভালো জোগান রয়েছে। ভাদভূতের পাশাপাশি জম্বুসার ও হানসোট এলাকাতেও ইলিশ পাওয়া যায়। স্থানীয় মাছ ব্যবসায়ীদের সংগঠনের এক কর্তার দাবি, গত প্রায় পাঁচ বছর ধরে ওই এলাকায় ইলিশের উৎপাদন ভালো হচ্ছে। ফলে গুজরাতের কিছু এলাকায় ইলিশের জোগান বেড়েছে। সেই মাছ রেফ্রিজারেটেড ট্রাকে করে প্রথমে হাওড়ার পাইকারি বাজারে আসছে। সেখান থেকে পেট্রাপোল সীমান্ত পেরিয়ে বেনাপোল হয়ে ঢুকছে বাংলাদেশে।
বাংলাদেশের বাজারে গুজরাতের ইলিশের এত চাহিদা কেন?
এর প্রধান কারণ, বাংলাদেশের বাজারে ইলিশের দাম অনেকটাই বেশি। বিভিন্ন বাজারে ৫০০ গ্রামের বেশি ওজনের ইলিশ কেজি প্রতি প্রায় ১,৬০০ টাকা, ৭০০ গ্রামের মাছ প্রায় ১,৮০০ টাকা, ৮০০-৯০০ গ্রামের মাছ ২,২০০-২,৪০০ টাকা এবং এক কেজির বেশি ওজনের ইলিশ প্রায় ২,৮০০ টাকা বা তার কাছাকাছি দামে বিক্রি হচ্ছে। তবে ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভারত থেকে আমদানি করা ইলিশের সর্বোচ্চ ক্রয়মূল্য কেজি প্রতি প্রায় ২ ডলার বা ২৪৬ টাকার কাছাকাছি। আমদানি শুল্ক ও অন্যান্য খরচ যোগ হওয়ার পরেও একই ওজনের দেশি ইলিশের তুলনায় এই মাছ ব্যবসায়ীদের কাছে তুলনামূলক সস্তা পড়ছে। ফলে লাভের সুযোগও তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের বাজারে ভারতীয় ইলিশ ঢোকার পিছনে শুধু মাছের অভাব নয়, দামের বড় পার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
বড় মাছ, ডিমভরা ইলিশও টানছে ক্রেতাদের
গুজরাতের ইলিশের আর একটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তা হল গুজরাতের ইলিশের আকার এবং মাছ ডিমভরা। বাংলাদেশের বাজারে এই ধরনের ইলিশের চাহিদা রয়েছে। এমনকি ইলিশের ডিমেরও আলাদা চাহিদা রয়েছে। ফলে গুজরাতে যখন বড় আকারের ইলিশের সরবরাহ বাড়ছে এবং দাম তুলনামূলক কম থাকছে, তখন সেই মাছ বাংলাদেশে পাঠানো ব্যবসায়ীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশে ইলিশ উৎপাদন কেন কমছে?
মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রধান কারণ ইলিশের প্রাকৃতিক চলাচলের পথ বা মাইগ্রেটরি রুটে সমস্যা। এছাড়াও ক্ষতিকর উপায়ে মাছ ধরা এবং জলদূষণের মতো কারণও রয়েছে। ইলিশ মূলত সমুদ্রের মাছ হলেও প্রজননের জন্য নদীতে আসে। ফলে সমুদ্র থেকে নদীতে তার স্বাভাবিক যাতায়াত ব্যাহত হলে উৎপাদনে প্রভাব পড়তে পারে। অন্যদিকে গুজরাতের নর্মদা মোহনা সংলগ্ন এলাকায় ইলিশের জোগান তুলনামূলক ভালো হওয়ায় সেখানে উদ্বৃত্ত মাছ তৈরি হচ্ছে।
পদ্মার ইলিশ কি আসবে না?
দুর্গাপুজো যত এগিয়ে আসছে, ততই বাংলাদেশের ইলিশ কবে আসবে- তা নিয়ে কৌতুহল বাড়ছে মানুষের। কিন্তু এবার সেই ইলিশ ভারতে আসবে কি না, এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বাংলাদেশের ১৮টি সংস্থা ইতিমধ্যেই ভারতে ইলিশ রফতানির অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছে। বাংলাদেশের বাণিজ্যসচিব আতাউর রহমান খান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। একদিকে বাংলাদেশ থেকে ভারতে ইলিশ রফতানির উপর দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, অন্যদিকে ভারতীয় মাছ আমদানিকারকরা সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে দুর্গাপুজোর আগে ইলিশ পাঠানোর অনুমতি দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের কাছে আবেদন জানিয়েছেন।
তবে আবেদন করা মানেই রফতানির অনুমতি পাওয়া নয়। এখন বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রকের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা। ফলে এই মুহূর্তে নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না, কত টন ইলিশ ভারতে আসবে বা আদৌ রফতানির অনুমতি দেওয়া হবে কি না। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ সরকার দুর্গাপুজোর আগে ৩,০০০ টন ইলিশ ভারতে রফতানির অনুমতি দিয়েছিল। ২০২৫ সালেও ১,২০০ টন ইলিশ রফতানি অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, যদিও শেষ পর্যন্ত তার পুরোটা পাঠানো হয়নি। এবার তাই নজর বাংলাদেশের সিদ্ধান্তের দিকে।