
ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যে ট্রেন পরিষেবা পুনরায় চালু করার প্রক্রিয়া চলছে। কয়েকদিন আগেই এই খবর সামনে আসে। চলতি অক্টোবর মাস থেকেই ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যে ট্রেন পরিষেবা চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এবার এল নতুন আপডেট। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ভারত-বাংলাদেশ আন্তঃদেশীয় যাত্রীবাহী ট্রেন মৈত্রী এক্সপ্রেস এবার পদ্মা সেতুর উপর দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছতে পারে। আর এমনটা হলে বর্তমান রুটের তুলনায় যাত্রীদের তিন ঘণ্টা সময় সাশ্রয় হতে পারে।
মৈত্রী এক্সপ্রেস চলবে পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে?
সম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্ঠিত ৩৮তম বাংলাদেশ-ভারত আন্তঃসরকার রেলওয়ে বৈঠকে (আইজিআরএম) মৈত্রী এক্সপ্রেসের সম্ভাব্য নতুন রুট নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে ভারতের প্রতিনিধিরা পদ্মা সেতুর উপর দিয়ে ট্রেন চলাচল নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে। প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকা যাত্রীবাহী রেল যোগাযোগ পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঢাকা-কলকাতা রুটের মৈত্রী এক্সপ্রেসকে যমুনা সেতুর পরিবর্তে পদ্মা সেতু-বেনাপোল হয়ে চালুর প্রস্তাব দিয়েছে ভারত। কূটনৈতিক সূত্র বলছে, আসন্ন দুর্গাপুজোর ছুটির আগেই নতুন রুটে ট্রেনটি চালুর বিষয়ে ঢাকা ও দিল্লি চেষ্টা করছে। তবে এ বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
সময় কতটা বাঁচবে?
দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রের দাবি, পদ্মা সেতু-বেনাপোল রুটে ট্রেন চালু হলে ঢাকা থেকে কলকাতা যেতে সময় প্রায় তিন ঘণ্টা কমে ছয় ঘণ্টায় দাঁড়াবে। একই সঙ্গে টিকেটের ভাড়া প্রায় এক হাজার টাকা কমতে পারে। যাত্রীসেবার মানোন্নয়ন ও পরিচালন ব্যয় কমানোর লক্ষ্যেই নতুন রুটের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ঢাকার কূটনৈতিক সূত্র জানাচ্ছে, পদ্মা সেতু দিয়ে এর আগে কোনও আন্তঃদেশীয় ট্রেন চলেনি। ফলে নতুন রুটে মৈত্রী এক্সপ্রেস চালুর আগে কারিগরি ও পরিচালনাগত সক্ষমতা যাচাই করতে হবে। ভারতের প্রস্তাবটি নতুন হওয়ায় বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়াও এখনও শেষ হয়নি।
ভাড়াও সাশ্রয় হবে
ঢাকা ও কলকাতার মধ্যে যাতায়াত করা মৈত্রী এক্সপ্রেস পদ্মা সেতু-বেনাপোল রুট দিয়ে চালানো হলে সময় প্রায় তিন ঘণ্টা কমে ছয় ঘণ্টায় নেমে আসতে পারে বলে জানিয়েছেন আধিকারিকরা। এতদিন ট্রেনটি যমুনা সেতু-দর্শনা রুট হয়ে চলাচল করত। প্রস্তাবিত নতুন রুট চালু করা হলে যাত্রার সময় কমার পাশাপাশি ভাড়াও কমতে পারে প্রায় ১ হাজার টাকা। এতে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগে আকাশপথের তুলনায় ট্রেন আরও সুবিধাজনক বিকল্প হয়ে উঠবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
দু'বছরের বেশি বন্ধ পরিষেবা
নিরাপত্তাজনিত কারণে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই থেকে বন্ধ রয়েছে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চলাচলকারী মৈত্রী এক্সপ্রেস। দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক টানাপোড়েন থাকলেও আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ভারতে যাওয়া বাংলাদেশি পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৮০ শতাংশ। ভারতের পর্যটন মন্ত্রকের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, অগাস্ট মাসে বাংলাদেশ থেকে ভারতে ভ্রমণ করেছেন ৭৪ হাজারের বেশি মানুষ। এদিকে গত ৯ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের রেলমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সংসদে জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বর্তমানে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল করছে। পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে যাত্রীবাহী ট্রেন চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগে আকাশপথের তুলনায় ট্রেন আরও সুবিধাজনক বিকল্প হয়ে উঠবে। উল্লেখ্য, ২০০৮ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ উদ্যোগে মৈত্রী এক্সপ্রেস চালু করা হয়। ১৯৬৫ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়া দুই দেশের যাত্রীবাহী রেল যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এরপর থেকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যাতায়াতকারী যাত্রীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন মাধ্যম হয়ে ওঠে এই ট্রেন। বিশেষ করে পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং চিকিৎসার কাজে যাতায়াতকারীরা এটি ব্যবহার করতেন বেশি।
বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই পর্যন্ত মৈত্রী এক্সপ্রেসে মোট ২ লাখ ৮৮ হাজার ৩৬০ জন যাত্রী ভ্রমণ করেছেন। বিদ্যমান তথ্য অনুযায়ী, এর প্রায় ৯৫ শতাংশ যাত্রী ছিলেন বাংলাদেশি। ট্রেনটির গড় আসন ব্যবহারের হার ছিল ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ। তবে ইদ ও দুর্গাপুজোর মতো বড় উৎসবের সময় এই হার ৯৫ শতাংশের বেশি ছিল। এতে বাংলাদেশি যাত্রীদের মধ্যে এই সেবার চাহিদার বিষয়টি উঠে আসে। আন্তসীমান্ত যাত্রীবাহী ট্রেন পরিচালনার বর্তমান ব্যবস্থায় মৈত্রী এক্সপ্রেসের টিকিট বিক্রি থেকে পাওয়া আয়ের ৭৫ শতাংশ পায় বাংলাদেশ রেলওয়ে। বাকি ২৫ শতাংশ পায় ভারতীয় রেলওয়ে। বন্ধ হওয়ার আগে মৈত্রী এক্সপ্রেস টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু-ঈশ্বরদী-দর্শনা রুটে চলাচল করত। ঢাকা ও কলকাতার মধ্যে এই রুটের দূরত্ব ছিল প্রায় ৩৯২ কিলোমিটার। অনুমোদিত সময়সূচি অনুযায়ী, ট্রেনটি সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে ঢাকা স্টেশন থেকে ছেড়ে বিকাল ৪ টায় কলকাতায় পৌঁছানোর কথা ছিল। এতে সময় লাগত ৭ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট। ফেরার পথে কলকাতার চিৎপুর টার্মিনাল স্টেশন থেকে সকাল ৭টা ১০ মিনিটে ছেড়ে বিকাল ৩টা ৩৫ মিনিটে ঢাকায় পৌঁছানোর কথা ছিল। এ যাত্রায় সময় লাগত ৮ ঘণ্টা ২৫ মিনিট। তবে বাস্তবে রেলপথের নানা কারণে যাত্রায় ৯ থেকে ১০ ঘণ্টারও বেশি সময় লাগত। বিশেষ করে ঢাকা-ঈশ্বরদী-দর্শনা অংশে এই সমস্যা বেশি ছিল। বাংলাদেশের রেল কর্মকর্তারা মনে করছেন, যমুনা সেতু-দর্শনা রুটের পরিবর্তে পদ্মা সেতু ও বেনাপোল হয়ে মৈত্রী এক্সপ্রেস চালু করা হলে সময় ও দূরত্ব কিছুটা কমে আসবে। আন্তঃসীমান্ত যাত্রীবাহী ট্রেন পরিচালনার চুক্তি অনুযায়ী, মৈত্রী এক্সপ্রেসের টিকেট বিক্রির মোট আয়ের ৭৫ শতাংশ পায় বাংলাদেশ রেলওয়ে এবং ২৫ শতাংশ যায় ভারতীয় রেলওয়ের কাছে।