
বাংলাদেশে ফের নিশানায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এবার খুলনা রেলওয়ে স্টেশনের সীমানা প্রাচীরে থাকা রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে কালো কালি লেপে দেওয়ার অভিযোগ উঠল অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে। শুক্রবার সকালে বিষয়টি স্থানীয়দের নজরে আসে। এই ঘটনায় বাংলাদেশে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর, রবীন্দ্রনাথের ছবি বিকৃত করার পাশাপাশি সেখানে দুটি পোস্টারও লাগানো হয়েছে। ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।
খুলনা রেলওয়ে স্টেশনের সীমানা প্রাচীরে বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের ছবি আঁকা হয়েছিল। সেই তালিকায় ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ফকির লালন শাহ, চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান, কাজী নজরুল ইসলাম, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মাইকেল মধুসূদন দত্ত। কিন্তু অভিযোগ, ওই প্রাচীরে থাকা রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে কালি লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাকি ব্যক্তিত্বদের ছবিগুলি অক্ষত রয়েছে।
শুধু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের ছবিই নয়, ওই দেওয়ালে বাংলাদেশের জুলাই অভ্যুত্থান, সুন্দরবন, ষাট গম্বুজ মসজিদ এবং পাটশিল্পের ছবিও আঁকা হয়েছিল। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের খুলনা সফরের আগে খুলনা সিটি কর্পোরেশনের (কেসিসি) উদ্যোগে এই ম্যুরালগুলি তৈরি করা হয়েছিল।
রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আপত্তিকর পোস্টার
রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতির পাশে লাগানো দুটি পোস্টার নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তার মধ্যে একটিতে লেখা রয়েছে, 'মুসলিম ও পূর্ববঙ্গের প্রতি বিদ্বেষী রবীন্দ্রনাথের ঠাঁই তিতুমিরের বাংলায় নেই। ভারতকে মহিমান্বিত করার কোনও জায়গা নেই।'
এই পোস্টারের বক্তব্য ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সাংস্কৃতিক মহলের একাংশের মতে, রবীন্দ্রনাথের মতো বিশ্ববরেণ্য সাহিত্যিককে এভাবে নিশানা করা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উপরেই আঘাত।
তদন্ত শুরু পুলিশের
খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক লোকমান হোসেন জানিয়েছেন, শুক্রবার দুপুরে পুলিশ এই ঘটনার কথা জানতে পারে। এরপরই তদন্ত শুরু করা হয়েছে। তবে ঘটনার সময় ও কারা এই কাজ করেছে, তা খুঁজে বের করতে সমস্যার মুখে পড়েছে পুলিশ। লোকমান হোসেনের বক্তব্য, শুক্রবার রাস্তার উল্টোদিকের সমস্ত দোকানপাট বন্ধ ছিল। ফলে কখন এবং কারা ম্যুরালটি বিকৃত করেছে, তা চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ক্ষোভ প্রকাশ খুলনা সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসকের
ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন খুলনা সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু। তাঁর বক্তব্য, শিশু-কিশোরদের মধ্যে মুক্তচিন্তার বিকাশ ঘটানোর উদ্দেশ্যেই এই বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের ছবি আঁকা হয়েছিল। ম্যুরাল বিকৃত করে অভিযুক্তরা নিজেদের সংকীর্ণ মানসিকতা এবং অসুস্থ চিন্তাভাবনার পরিচয় দিয়েছে।
সংগঠিত গোষ্ঠীর হাত রয়েছে, দাবি সংস্কৃতিকর্মীর
ঘটনার পিছনে কোনও সংগঠিত গোষ্ঠীর হাত থাকতে পারে বলে মনে করছেন নাট্যালোকের সাধারণ সম্পাদক তথা সংস্কৃতিকর্মী শরিফুল ইসলাম সেলিম। তাঁর দাবি, ঢাকাতেও এর আগে একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। পরিকল্পিতভাবেই এই ধরনের কাজ করা হচ্ছে। অভিযুক্তদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
শরিফুলের কথায়, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও দর্শন প্রজন্মের পর প্রজন্মকে মুক্তচিন্তা, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং মানবিক মর্যাদার শিক্ষা দিয়েছে। তাঁর আশঙ্কা, এই ধরনের ঘটনা বন্ধ না হলে রবীন্দ্রনাথের পর অন্য বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদেরও নিশানা করা হতে পারে।
উল্লেখ্য, গত অক্টোবর মাসেও ঢাকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি প্রতিকৃতি বিকৃত করার অভিযোগ উঠেছিল। সেই ঘটনায় চারজনকে আটক করেছিল পুলিশ। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন স্টেট ডায়ালগ ফোরামের সদস্যসচিব আল নুর মহম্মদ আয়াশ। ফলে পরপর এই ধরনের ঘটনায় বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিসর এবং মুক্তচিন্তার পরিবেশ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।