
প্রয়াত আশা ভোঁসলে। ৯২ বছর বয়সে চিরবিদায় নিলেন সুরসম্রাজ্ঞী। রেখে গেলেন নিজের গানের সাম্রাজ্য। গত সাত দশকে বড় পর্দায় ছবি বদলেছে। বদলেছে গানের সুর। বাদ্যযন্ত্রের অনুষঙ্গও। কিন্তু আশার কণ্ঠ চিরনবীন।
১৯৪৮ সালে হিন্দি ছবিতে প্লেব্যাক শুরু করেন আশা ভোঁসলে। তখন নুর জাহান, শামশাদ বেগম, সুরাইয়া কিংবা গীতা দত্তদের দাপট। বড় চ্যালেঞ্জ ছিলেন নিজের দিদি লতা মঙ্গেশকর। শুরুর দিকে অনেকের মনে হত দু’জনের গলা অনেকটা একই রকম। কিন্তু আশা নিজেকে আলাদা করলেন তাঁর গায়কির নিজস্ব ঘরানায়।
আশা নিজেই বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, শুরুতে তিনি সেই গানগুলিই পেতেন যা বড় শিল্পীরা গাইতে চাইতেন না। অনেক সময় সেই গানগুলোর কথা বা আবেগ এমন ছিল যা সেই সময়ের নৈতিকতার মাপদণ্ডের সঙ্গে খাপ খেত না। আশা গেয়েছেন। গানের চরিত্রের সঙ্গে মিশে যাওয়ার কায়দাই তাঁর কণ্ঠের পরিচয় হয়ে ওঠে।
দিলীপ কুমারের ‘সঙ্গদিল’ (১৯৫২), অশোক কুমারের ‘পরিণীতা’ (১৯৫৩) কিংবা দেব আনন্দের ‘সিআইডি’ (১৯৫৬) ছবিতে তিনি সুযোগ পেলেও পাশে ছিলেন বড় মাপের শিল্পীরা। ও পি নাইয়ারের সুরে ‘সিআইডি’-র সেই আইকনিক গান ‘লেকে পহেলা পহেলা পেয়ার’-এ শামশাদ বেগমের সঙ্গে তাঁর জুড়ি আজও সঙ্গীতপ্রেমীদের কানে বাজে। নাইয়ারের সঙ্গে তাঁর সেই জয়যাত্রা পরবর্তী দু’দশক ধরে ‘নয়া দৌড়’, ‘তুমসা নহি দেখা’ কিংবা ‘হাওড়া ব্রিজ’-এর মতো একের পর এক সুপারহিট।
ও পি নাইয়ার আশাকে দিয়ে সেই গানগুলো গাওয়াতেন যা সেই সময়ের নিরিখে ছিল বেশ ‘সাহসী’ এবং পাশ্চাত্য ধাঁচের। হেলেনের ক্যাবারে ডান্সের জন্য আশার কণ্ঠই ছিল অপরিহার্য। ‘আয়ে মেহেরবাঁ’, ‘ইশারো ইশারো মে দিল লেনে ওয়ালে’ কিংবা ‘আও হুজুর তুমকো’ এই গানগুলি বুঝিয়ে দিয়েছিল সুরের জগতে আশার অবাধ বিচরণ। সাতের দশকে গায়কির স্টাইলই তাঁকে আর ডি বর্মনের প্রিয় করে তোলে।
সাতের দশকে হিন্দি ছবির জগতে এল এক আমূল পরিবর্তন। গ্যাংস্টার, ভ্যাম্প আর স্টাইলিশ ভিলেনদের নিয়ে ছবিতে আর ডি বর্মনের সুরে আশার কণ্ঠ দিল নতুন এক মাত্রা। ‘দম মারো দম’ বা ‘পিয়া তু আব তো আজা’-র মতো গানে যেমন আধুনিকতার ছোঁয়া ছিল, তেমনই ‘চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে জো দিল কো’-র মতো গানে ছিল স্নিগ্ধতা। সেই সময় রসিকতার ছলে বলা হত,'ভালো মেয়েরা লতার গান শোনে, আর বখাটেরা আশার!'
আটের দশকে আবার ভোলবদল। ‘উমরাও জান’ (১৯৮১)-এ খৈয়ামের সুরে ধ্রুপদী গজলে মন কাড়লেন আশা। গাইলেন ‘দিল চিজ কেয়া হ্যায়’ বা ‘ইন আঁখো কি মস্তি কে’। এই দশকেই দু’টি জাতীয় পুরস্কার আসে আশার ঝুলিতে। এরপর গুলজারের ‘ইজাজত’ ছবিতে তাঁর কণ্ঠের জাদুতে মোহিত হয় আসমুদ্রহিমাচল।
নয়ের দশকে অলকা ইয়াগনিক বা কবিতা কৃষ্ণমূর্তিদের দাপট। তখনও নতুন প্রজন্মের সুরকারদের তুরুপের তাস ছিলেন সেই আশাই। এ আর রহমানের সুরে ‘রঙ্গিলা’ ছবির গান বা ‘তাল’-এর ‘কহি আগ লাগে লাগ জাভে’ নতুন করে আশাকে পরিচিতি এনে দেয়। আদনান সামির সঙ্গে তাঁর অ্যালবাম ‘কভি তো নজর মিলাও’ আজও সমান জনপ্রিয়।
নতুন শতাব্দীতেও তাঁর দাপট কমেনি। যখন তিনি ‘কমবখত ইশক হ্যায় জো’ বা ‘শরারা শরারা’ গাইছেন, তখন তাঁর বয়স ৬৫ পার। ২০০৫ সালে ‘লাকি লিপস’ গাওয়ার সময় তাঁর বয়স ছিল ৭০। ২৫ বছরের তরুণীর আবেগও ফুটিয়ে তুলছিলেন। ২০১২ সালে ১২ হাজারের বেশি গান রেকর্ড করার বিশ্ব রেকর্ড।
আশা ভোঁসলে নেই ঠিকই। কিন্তু তাঁর গান আজও চিরনবীন।