
১৯ দিন অতিক্রান্ত। এখনও খোঁজ মেলেনি পরিচালক-লেখক ও চিত্রনাট্যকার উৎসব মুখোপাধ্যায়ের। আনন্দপুর থানায় স্ত্রী মৌপিয়া বন্দ্যোপাধ্যায় মিসিং ডায়েরি করলেও সেখান থেকেও কোনও নতুন আপডেট আসেনি। স্বামীর সম্পর্কে কোনও খোঁজ না পেয়ে রীতিমতো দিশেহারা অবস্থা মৌপিয়ার। তিনি নিজেও অসুস্থ। ক্রমাগত সোশ্যাল মিডিয়াতে উৎসব সংক্রান্ত পোস্ট তিনি করেই চলেছেন। আর এরই মাঝে কলকাতা পুলিশের পক্ষ থেকে নিখোঁজ পরিচালককে নিয়ে সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি মৌপিয়াও উৎসবকে নিয়ে কিছু বিষয় পোস্ট করেছেন।
স্ত্রী মৌপিয়া রবিবার তাঁর ফেসবুক পোস্টে একটি দীর্ঘ লেখা শেয়ার করেন। যেখানে তিনি জানান যে আজও তাঁর পরিচালক-স্বামীর কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। তিনি নিজেও জানেন না উৎসব কোথায়, কেমন আছেন। পুলিশের কাছ থেকে শুধু এটুকুই জানতে পারছেন যে তদন্ত চলছে। মৌপিয়া বলেন যে প্রত্যেকটা দিনই তাঁর আশা এবং স্বাস্থ্য দুটোই ভেঙে পড়ছে। মৌপিয়া তাঁর পোস্টে আশঙ্কা করছেন যে তিনি হয়তো বেঁচে নাও থাকতে পারেন, তাই তিনি কিছু কথা জানিয়ে যেতে চান। মৌপিয়া বলেন যে পুলিশকে তিনি সবটাই জানিয়েছেন কিন্তু তিনি এটা জানেন না পুলিশ আদৌও সেইসব দিক খতিয়ে দেখছেন কিনা। পরিচালকের স্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালের অগাস্ট থেকে আমি উৎসবকে চিনি। কাজের সূত্রে আমাদের যোগাযোগ, যা পরবর্তীতে খুব ভাল বন্ধুত্বে পরিণত হয়। এই সম্পর্ক এরপর একে-অপরের প্রতি নির্ভরশীলতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতাকে বাড়ায়। পরিচালকের স্ত্রী এও জানিয়েছেন যে তিনি নিজের জীবন ও কাজ নিয়েই থাকতে পছন্দ করেন। অন্য কারোর জীবনে নাক গলানো তাঁর পছন্দ নয়, যদি না মৌপিয়ার জীবনের ঝুঁকি থাকে।
প্রথম দিন থেকেই উৎসব মৌপিয়াকে তাঁর সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ায় যোগাযোগ করতে বারণ করে দিয়েছিলেন। আর পরিচালকের স্ত্রীও সেই সিদ্ধান্তকে মেনে নেন। মৌপিয়ার কথায়, তাঁরা নিজেদের ব্যক্তিগত জীবনকে কখনই সোশ্যাল মিডিয়ায় তুলে ধরেননি। ২০২৫ সালে উৎসব তাঁর এই সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে আতঙ্কের পিছনে থাকা কারণ জানায়। পরিচালক জানান যে ২০১৯ সাল থেকে তাঁর ফেসবুক অ্যাকাউন্ট কোনও অজ্ঞাত ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। যখনই পরিচালক কোনও ছবি পোস্ট করতেন, তখনই ফেক আইডি থেকে অশ্লীল মন্তব্য করা শুরু করত। সেই কমেন্ট পরিচালক মুছতে চাইলেও তা একাধিক হয়ে যেত এবং পরবর্তীতে পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যায়। পরিচালক উৎসব এবং প্রযোজনা সংস্থার পক্ষ থেকে সেই সময় সাইবার ক্রাইমে অভিযোগও দায়ের করেন বলে জানান স্ত্রী মৌপিয়া। কিন্তু সুরাহা হয়নি। সেই সাইবার হামলা ব্যক্তিগত স্তর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। সেই সব ফেক আইডির না ছিল কোনও ছবি, না প্রকৃত পরিচয়। ফেসবুক থেকে সেই সাইবার হামলা ইনস্টাগ্রাম সহ অন্যান্য ভার্চুয়াল মাধ্যমেও পৌঁছায়। বাইরের কেউ একজন রয়েছে যে উৎসবকে পুরোপুরি ধ্বংস করতে চায়। মৌপিয়া বলেন, এটি ছিল নিছকই প্রতিহিংসা। ধীরে ধীরে উৎসব নিজের ভেতর গুটিয়ে যেতে শুরু করল; বন্ধু-বান্ধব, পরিবার এবং সহকর্মীদের কাছ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলল। ছবি তোলা হবে—এই ভয়ে সে বিভিন্ন পার্টি ও অনুষ্ঠানে যাওয়া এড়িয়ে চলতে শুরু করল।
মৌপিয়া এও বলেন, এর ফলে তার পেশাগত জীবনে ব্যাপক ক্ষতি হলো। সে আর স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারছিল না, স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছিল না কিংবা মানুষের সঙ্গে মন খুলে কথা বলতে পারছিল না। সে একের পর এক প্রজেক্ট ছেড়ে দিতে লাগল; নিজেকে কেবল এমন কিছু নির্দিষ্ট কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলল, যেখানে সে নিজেকে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ মনে করত—এবং কেবল সেই গুটিকয়েক মানুষের গণ্ডিতেই বিচরণ করত, যাদের সে বিশ্বাস করতে পারত। যখন আমি এই বিষয়টি জানতে পারলাম, তখন আমি ভীষণভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি। আমি তাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে অনুপ্রাণিত করলাম। তার বাবার মৃত্যুর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই, সেই সাইবার হামলাকারী আবারও ঘটনা ঘটাবো। এবার আমি তাকে পরামর্শ দিলাম—আর চুপ করে না থেকে সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে এবং সবার সামনে এই আক্রমণের কথা তুলে ধরতে। সে তার ফেসবুক ওয়াল, কভার ফটো এবং হোয়াটসঅ্যাপ প্রোফাইল পিকচারে লিখে জানাল যে, সে একটি সাইবার আক্রমণের শিকার হয়েছে। সে একটি ভিডিও পোস্ট করল, যেখানে সে সবাইকে জানাল যে গত বেশ কয়েক বছর ধরে তার সঙ্গে ঠিক কী কী ঘটে চলেছে। সেই সময়ও পুলিশের দ্বারস্থ হন উৎসব ও তাঁর স্ত্রী মৌপিয়া। কিন্তু তাতেও ফল কিছু হয়নি। মৌপিয়ার বর্ণনা অনুযায়ী, তাঁদের বিয়ের পর এই সাইবার অ্যাটার আরও বেড়ে যায়। তাঁদের বিয়ের ছবিতে অত্যন্ত কুরুচিকর ও বিদ্বেষমূলক মন্তব্য করতে শুরু করে। এমনকি উৎসবের নামে একটি সম্পূর্ণ আলাদা ওয়েবসাইট বা 'ডোমেইন' তৈরি করা হলো, যেখানে আমাদের দুজনকে নিয়েই কুৎসা রটানো হচ্ছিল। আক্রমণকারীরা উৎসবের IMDB প্রোফাইলের 'বায়ো' (bio) বা পরিচিতি অংশটি পরিবর্তন করে দিল এবং সেখানে তার সম্পর্কে নানা ধরনের আপত্তিকর ও বিদ্বেষমূলক কথা লিখে রাখল। 'মুভি ডেটাবেস' (Movie Database)-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতেও তার সম্পর্কে নানা কুৎসা রটানো হতে লাগল। উৎসবের নামে একটি ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইলও খোলা হলো; সেখানে আমাদের বিয়ের ছবি ব্যবহার করা হলো এবং নিয়মিত বিরতিতে আমাদের মানহানি করার উদ্দেশ্যে নানা ধরনের পোস্ট আপলোড করা হতে লাগল।
এইসব ঘটনা তাঁদের দুজনকে মানসিক ও পেশাগতভাবে বিধ্বস্ত করে তুলেছিল। এরপরই গত ২ এপ্রিল আনন্দপুরের বাড়ি থেকে নিমতা এলাকার ব্যাঙ্কে যাবেন বলে বেরিয়ে নিখোঁজ হয়ে যান পরিচালক উৎসব। সেদিন দুপুরের পর থেকে আর তাঁর সঙ্গে কোনওভাবেই যোগাযোগ করা যায়নি বলে জানিয়েছিলেন উৎসবের স্ত্রী মৌপিয়া বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু ১৯ দিন পরও পরিচালকের কোনও খোঁজ নেই। তাঁর শেষ লোকেশন ছিল উল্টোডাঙা স্টেশন। তারপর থেকে আর কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। পুলিশও কোনও নতুন আপডেট মৌপিয়াকে দেয়নি। তবে লালবাজারের পক্ষ থেকে দুটি সংবাদপত্রে পরিচালক উৎসবের নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছেন। কবে ফিরে আসেন উৎসব, সেই দিকেই তাকিয়ে স্ত্রী মৌপিয়া।