
হড়পা বান এবং ভূমিকম্পের জেরে বিধ্বস্ত নেপাল। মৃতের সংখ্যা ক্রমে বেড়েই চলেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া নেপালের পরিস্থিতি দেখে আঁতকে উঠছেন সবাই। সেই নেপালেই ছবির শ্যুটিংয়ে গিয়েছিলেন অভিনেতা খরাজ মুখোপাধ্যায়। সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী প্রতিভাও। কিন্তু ফোনে যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না তাঁদের সঙ্গে। ছেলে বিহু যদিও সোশ্যাল মিডিয়ায় মা-বাবার প্রতি মুহূর্তের খবর জানাচ্ছিলেন। শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট কলকাতায় ফেরেন সস্ত্রীক খরাজ মুখোপাধ্যায়। কীভাবে কোন পরিস্থিতিতে নেপাল থেকে কলকাতায় ফিরলেন, bangla.aajtak.in-কে জানালেন অভিনেতা নিজেই।
নেপালে বাংলাদেশের ছবি 'শিকার'-এর শ্য়ুটিংয়ে গিয়েছিলেন খরাজ। তার মাঝেই এমন ভযঙ্কর পরিস্থিতি তৈরি হবে নেপালে, তা বুঝতেও পারেননি। আজতক বাংলাকে খরাজ বলেন, 'থ্যাঙ্ক গড আমরা যেখানে শ্যুটিং করতে গিয়েছিলাম, সেই জায়গাটার নাম পোখরা। পোখরাতে শ্যুটিং করতে গিয়েছি, কাঠমান্ডুতে নেমে সেখান থেকে ফ্লাইটে করে আধ ঘণ্টা মতো লাগে এই পোখরাতে যেতে। সেই জায়গায় পৌঁছে আমরা শ্যুটিং লোকেশনে পৌঁছই। কিন্তু ২০ অগাস্ট পৌঁছনোর পর ২১, ২২, ২৩ এই তিনটে দিন আমার শ্যুটিং ছিল, কিন্তু এই তিনটে দিন শ্যুটিং করা যায়নি। আমি আরও একটি অতিরিক্ত দিন নিয়েছিলাম ২৪ অগাস্ট, কিন্তু সেদিনও শ্যুটিং করা যায়নি। সব বৃষ্টিতে পণ্ড হয়ে গিয়েছিল। তখন ছবির নির্মাতারা বললেন যে দাদা তিনদিনের কাজ দুদিনে শেষ করে দেব, ২৫ ও ২৬ অগাস্ট শ্যুটিং করে যান।' অভিনেতা বলেন, 'আমার ২৬ অগাস্টে ফেরারই কথা ছিল। যে কারণে আমি ২৬ তারিখ ফ্লাইটের টিকিটও বুক করেছিলাম, কাঠমান্ডু থেকে শেষ ফ্লাইট ছিল সন্ধে ৭টায়, সেটা ধরে নিয়ে পোখরা থেকে সরাসরি কাঠমান্ডু যাব আর সেখান থেকে সকালে কাঠমান্ডু থেকে কলকাতায় ব্যাক করা।'
খরাজ বলেন, '২৫ তারিখে শ্যুটিং করে যখন ২৬ তারিখে শ্যুটিং করছি, আমি তখন নেপালের ঘটনা সম্পর্কে জানতে পেরেছি। সেই সময় আমরা একটা জঙ্গলের মধ্যে আর প্রবল বৃষ্টি হচ্ছে। সকাল ১০টা থেকে বৃষ্টি শুরু হয়েছে আর সেটা চলেছে বিকেল সাড়ে চারটে পর্যন্ত। অঝোর ধারায় বৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে একটা তাঁবুর মধ্যে আমি, ওই ছবির হিরো, হিরোর অ্যাসিট্যান্ট এবং আমার স্ত্রী। আমরা চারজনে ওই তাঁবুর মধ্যে বসে আছি আর চারধারে বৃষ্টি হচ্ছে।' অভিনেতা বলেন, 'এরপর যখন সূর্য প্রায় অস্ত চলে যাচ্ছে, তখন ওই বৃষ্টিতে কোনও মতে শ্যুটিংটা করে ওখান থেকে বেরিয়ে এসেছি। বৃষ্টি কিছুটা থামলেও ফের শুরু হয়। যদিও এরপর আমাদের ইনডোর শ্যুট ছিল একটা থানায়। এই থানার দৃশ্যটা করলে আমি কিন্তু ফ্লাইটটা ধরতে পারব না। এরই মধ্যে আমি শুনে নিলাম যে ফ্লাইট ভর্তি হয়ে গেছে। এরপর সিনেমার নির্মাতারা বললেন যে আমায় সড়কপথে কাঠমান্ডু পাঠিয়ে দেবে, যেখান থেকে আমি সকাল ৭টায় কলকাতার ফ্লাইট ধরতে পারব। তখন আমি ওঁনাদের বলি যে আপনারা ব্যস্ত ছিলেন বলে সোশ্যাল মিডিয়ায় চোখ পরেনি, দেখুন নেপালের কী অবস্থা, আমরা কী সাংঘাতিক অবস্থার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি। তারপর ওঁনারা দেখলেন যে এই অবস্থা। আর কাঠমান্ডুর সব রাস্তা তো বন্ধ। কী করে ফিরব, কী করব বুঝতে পারছিলাম না। তখন আমাদের একজন পরামর্শ দিল যে ২৭ তারিখে পোখরা থেকে আমরা কাঠমান্ডুর দিকে না গিয়ে, সরাসরি চলে যান উত্তরপ্রদেশ। বর্ডার ক্রস করে উত্তরপ্রদেশে গিয়ে গোরখপুর চলে যান, গোরখপুর থেকে ফ্লাইট আছে, সেটা ধরে কলকাতায়। এই হচ্ছে উপায়।'
সেই পরামর্শ মেনে খরাজ ও তাঁর স্ত্রী পোখরা থেকে সড়কপথে রওনা দেন। অভিনেতা বলেন, 'পোখরা থেকে গোরখপুর যাওয়ার রাস্তাটা পাহাড়ের ওপর দিয়ে আর সেটার অভিজ্ঞতা দার্জিলিংয়ে ওঠা নামাটা যদি লাগাতার হয়। থামা নেই, ননস্টপ ওইভাবে যেতে হবে। সাড়ে সাতঘণ্টা পাহাড়ি রাস্তার ওপর দিয়ে যেতে হয়েছে। আমার স্ত্রীর তো মাথা ঘুরতে শুরু করে দেয়। আমাদেরও অস্বস্তিও হচ্ছিল। উত্তরপ্রদেশ সীমান্তে পৌঁছে একটি হোটেল বিশ্রাম নিই। তার পরের দিন ভোরে একটা গাড়ি নিয়ে আমরা গোরখপুর বিমানবন্দরে পৌঁছই, সেখান থেকে বিমানে করে কলকাতায় আসি। ছবির বাকি কলাকুশলীরা কেউ ট্রেন ধরেছে আবার কেউ কাঠমান্ডু গিয়েছে। যদিও খবর পাচ্ছিলাম একের পর এক ফ্লাইট বাতিল করা হচ্ছিল, সেনাদের অধীনেই সবটা ছিল। হেলিকপ্টারে করে উদ্ধার কাজ চলছিল।'
খরাজ বলেন, 'সিনেমার শ্যুটিংয়ে কিছু স্থানীয় টেকনিশিয়ান ছিল, তাঁদের আত্মীয়-স্বজনরা সব ওখানে। তাঁরা ফোন করে করে খোঁজ নিচ্ছিল দেখছিলাম। তার মধ্যে কেউ কেউ সব হারিয়েছে আবার কেউ কেউ নিজের মানুষদের খুঁজে পাচ্ছিলেন না। প্রিয় মানুষ, পরিজনরা নিখোঁজ, খুঁজে না পাওয়ার খবর আসছে তাঁদের কাছেও। কিন্তু আমাদের তো সান্তনা দেওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় নেই।'
গত বুধবার সকালে নেপালের রাসুয়া জেলায় ভোটেকোশী নদীতে হড়পা বান আসে। তিব্বত সীমান্তের কাছে গ্রামের পর গ্রাম ভেসে যায় নদীর জল ও কাদামাটির প্রবল স্রোতে। তার পর থেকে উদ্ধারকাজ চলছে। প্রতিদিনই বহু দেহ উদ্ধার করা হচ্ছে। নিখোঁজের সংখ্যাটাও একাধিক।