
দুর্গাপুজোর পর পরই কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর আরাধনায় মেতে ওঠে বাংলা। বাঙালির প্রতিটি ঘরে ঘরে আজ নিষ্ঠা সহকারে পালন হবে লক্ষ্মীপুজো। মহানায়ক উত্তমকুমারের বাড়িতে জাঁক জমকের সঙ্গে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো পালন করা হয়। আজও একই নিয়ম-রীতি মেনে সেই পুজোর দায়িত্ব বহন করছেন এই প্রজন্মের সদস্যরা। তবে উত্তমকুমারের বাড়ির পুজোর বেশ কিছু নিয়ম রয়েছে। সেই নিয়মেই লক্ষ্মীপুজো করার রীতি বছরের পর বছর হয়ে আসছে। এই বছর উত্তমকুমারের বাড়ির পুজো ৭৬ বছরে পা দিল।
১৯৫০ সালে নিজের ভবানীপুরোর বাড়িতে লক্ষ্মীপুজো শুরু করেছিলেন উত্তমকুমার। সেই বছরেই জন্ম ছেলে গৌতমের। এরপর মহানায়কের বাড়ির পুজো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে টলিউডের অন্যতম পারিবারিক উৎসবে পরিণত হল। বাংলা ইন্ডাস্ট্রির অভিনেতা-অভিনেত্রীরা শত ব্যস্ততার মাঝেও পৌঁছে যেতেন উত্তমকুমারের বাড়ির পুজোতে। আড্ডা, খাওয়া-দাওয়া চলত অনেক রাত পর্যন্ত। তবে এই মহানায়কের বাড়ির পুজোতে মা লক্ষ্মীর একটি বিশেষত্ব রয়েছে। সেই পরম্পরা আজও মেনে চলা হয়।
এই বাড়ির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল মূর্তি। মা লক্ষ্মীর মুখ অবিকল উত্তম কুমারের স্ত্রী গৌরী দেবীর আদলে তৈরি হয়। শিল্পী নিরঞ্জন পাল প্রথম এই প্রতিমা তৈরি করেছিলেন। উত্তম কুমার এবং তাঁর বাবার সঙ্গে কথা বলতে এই বাড়িতেই এসেছিলেন শিল্পী। সেইসময় গৌরীদেবীও এক বার এসেছিলেন সেই ঘরে, চা করবেন বলে কত জন আছেন তা দেখতে। শিল্পী সেই এক ঝলক দেখেই মনে গেঁথে রেখেছিলেন সেই মুখ। আর অবিকল একইরকম দেখতে প্রতিমা গড়েছিলেন তিনি। বাড়ির কেউই তা জানতেন না। বাড়িতে মূর্তি আসতেই তা দেখে অবাক হয়ে যান সকলে। আজও ওই একইরকম মূর্তিতে পুজো হয়। শিল্পীর কাছে ছাঁচ বানানো রয়েছে, যা দিয়ে প্রতি বছর একইরকম মূর্তি তৈরি করেন। যা দেখে মনে হয় একজন মানুষ বসে রয়েছে বাড়িতে।
উত্তমকুমারের বাড়ির পুজোয় থাকত এলাহি খাওয়া-দাওয়া এবং ভোগের আয়োজন। উত্তমকুমারের নাতনি এক সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আগে বাড়িতে ভিয়েন বসত। পান্তুয়া তৈরি হত, দরবেশ পাকানো হত। লুচি হত, সঙ্গে ছোলার ডাল, ফুলকপির তরকারি, ধোঁকার ডালনা, ছানার ডালনাও হত। উত্তমকুমারের পছন্দের বেগুন বাসন্তী, সেটাও হত। কিন্তু বর্তমানে এখন আর এতকিছু হয় না। এখন পনীর, ভেজিটেবল চপ, মিক্সড ভেজ, পোলাও হয়। মিষ্টিতে থাকে পান্তুয়া, কখনও কমলাভোগ।
চট্টোপাধ্যায় পরিবারে মা লক্ষ্মীর ভোগে দেওয়া হয় ঘিয়ের লুচি, আলুর দম, পোলাও, ফুলকপি বা বাঁধাকপির তরকারি, পাঁচ রকম ভাজা, লাল শাক ভাজা, চাটনি আর পায়েস। সঙ্গে থাকে মিষ্টি। উত্তমকুমার নিজে দাঁড়িয়ে থেকে অতিথিদের খাওয়াতেন। উত্তমকুমারের সেই নিয়ম ও রীতি মেনে এখন কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর দায়িত্ব নাতি গৌরব চট্টোপাধ্যায়ের কাঁধে। সঙ্গে স্ত্রী দেবলীনাও রয়েছেন। এছাড়াও বাড়ির অন্য সদস্যরাও একসঙ্গে মিলে এই লক্ষ্মীপুজোর কাজে হাত লাগান। সব মিলিয়ে ঐতিহ্য মেনেই উত্তমকুমারের বাড়ির লক্ষ্মীপুজো হয়ে থাকে।