
প্রয়াত বর্ষীয়ান গায়িকা সুমন কল্যাণপুর। যাঁর মিষ্টি মধুর সুরেলা কন্ঠের গান শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছিল বারংবার। রবিবার মুম্বইয়ের নিজের বাসভবনেই মৃত্যু হয় এই কিংবদন্তী গায়িকার। জানা গিয়েছে, বয়সজনিত কারণেই তিনি দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর।
সুমন কল্যাণপুরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও লেখক মঙ্গলা খাদিকর এ প্রসঙ্গে জানিয়েছেন যে সুমন কল্যাণপুর তাঁর লোখান্ডওয়ার বাসভবনে রবিবার রাত ৮টা নাগাদ মারা যান। খুব শান্তিপূর্ণভাবেই তাঁর মৃত্য হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। মঙ্গলা খাদিকর এক সংবাদসংস্থাকে জানিয়েছেন যে শেষের দিনগুলোকে গায়িকা তাঁর নিজের গান শুনেই সময় কাটাতেন। গায়িকা তাঁর মিষ্টি, সুমধুর ও হৃদয়স্পর্শী কণ্ঠ দিয়ে তিনি ভারতীয় সঙ্গীত জগতকে সমৃদ্ধ করেছেন।
ছয় দশকের বেশি সময় ধরে সুমন কল্যাণপুর একাধিক গান গেয়েছেন। তাঁর সুরেলা কন্ঠ ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ওপর তাঁর দক্ষতা সকলের মন জয় করেছে। আজকাল তেরে মেরে প্যায়ার কি চর্চে, না না করতে প্যায়ার তুমহি সে, তুমনে পুকারা অউর হাম চলে আয়ে সহ একাধিক হিন্দি গান গেয়েছেন। কালজয়ী হিটগুলির মাধ্যমে ভারতীয় প্লেব্যাক সঙ্গীতে নিজের জন্য একটি অনন্য স্থান তৈরি করেছিলেন। শুধু হিন্দি নয়, মারাঠি গানও রয়েছে তাঁর কন্ঠে। গায়িকা হওয়ার ইচ্ছে ছিল না। বরং, ছোটবেলায় ভাল লাগত ছবি আঁকতে, সেলাই করতে আর বাগানের যত্ন নিতে। আঁকার শখ বজায় ছিল জীবনের পরবর্তী পর্বেও। সেই শখের জন্যই সাবেক বম্বের সেন্ট কোলাম্বা স্কুলের পরে সুমন ভর্তি হন স্যর জেজে স্কুল অব আর্টসে। কৈশোরে ভাল লাগতে শুরু করে নূরজাহানের গান। স্কুলে বা বাড়ির অনুষ্ঠানে গান গাইতেন সুমন। সেরকমই এক অনুষ্ঠানে তাঁর গান শোনেন প্রখ্যাত মরাঠি সঙ্গীত পরিচালক কেশবরাও ভোলে। তিনি কথা বলেন সুমনের বাবা-মায়ের সঙ্গে। মেয়ের প্রতিভাকে নষ্ট না করার অনুরোধ করেন। নিজেই সুমনকে তালিম দিতে শুরু করেন তিনি। কেশবরাও বুঝেছিলেন সুমনের গলা লাইট মিউজিকের জন্য আদর্শ। তাঁর পরামর্শেই লাইট মিউজিকে মনোনিবেশ করেন সুমন।
শঙ্কর জয়কিষণ, রোশন, মদনমোহন, শচীনদেব বর্মণ, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, ওপি নায়ার, নৌশাদ, প্রমুখ সব নামী সঙ্গীত পরিচালকের নির্দেশনায় কাজ করেছেন সুমন। মহম্মদ রফি সহ-শিল্পী ছিলেন। রফি ও সুমন প্রায় ১৪০টি ডুয়েট করেন। পাশাপাশি তিনি ডুয়েট করেছেন মান্না দে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গেও। বাংলা গানও গেয়েছেন প্রচুর। ‘মনে করো আমি নেই বসন্ত এসে গেছে’ (কথা পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সুর রতু মুখোপাধ্যায়), ‘আমার স্বপ্ন দেখার দু’টি নয়ন’ (কথা মুকুল দত্ত এবং সুর রবিন বন্দ্যোপাধ্যায়) আজও অমলিন।
লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে তাঁর কন্ঠস্বরের মিল ছিল। বহুবার তা নিয়ে তুলনা যেমন হয়েছে তেমনি একাধিক গুঞ্জনও রয়েছে। সুমনের ধ্রুপদী গানের রেকর্ড বিরল। কিন্তু ধ্রুপদী গানেও তাঁর ছিল অনায়াস বিচরণ। হিন্দি ছবিতে রাগাশ্রয়ী গানের জন্য তিনি তিন বার ভূষিত হন ‘সুর শ্রীনগর সংসদ’ সম্মানে। ২০০৯ সালে মহারাষ্ট্র সরকার তাঁকে সম্মানিত করে ‘লতা মঙ্গেশকর পুরস্কারে’। ২০২৩ সালে ভারত সরকারের পদ্ম ভূষণ সম্মানে সম্মানিত হন তিনি।