
'আ গয়ে মেরি মউত কা তামাশা দেখনে...'। ১৯৯৪ সালের 'ক্রান্তিবীর' সিনেমার এই সংলাপটি সম্ভবত নানা পাটেকরের অভিনয় জীবনের সবচেয়ে চর্চিত ও জনপ্রিয়। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে বৃহস্পতিবার ভোরে তাঁর মৃত্যুসংবাদ আসার পর থেকে সেটিও একই ভাবে চর্চার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গোয়ার বাড়িতে ভোর ৫টা ২০ মিনিটে মৃত্য হয় এই অভিনেতার। জানা যায়, নানা পাটেকরের বুকে অসহ্য যন্ত্রণা শুরু হয়েছিল। তারপরই অচৈতন্য অবস্থায় পাওয়া যায় তাঁকে। CPR দিয়েও মেডিক্যাল টিম শেষরক্ষা করতে পারেনি। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা মৃত বলে ঘোষণা করেন বর্ষীয়ান এই অভিনেতাকে।
বয়স ৭৫-এর কোঠায় পৌঁছে গেলেও দাপটের সঙ্গে অভিনয় চালিয়ে যাচ্ছিলেন নানা। চলতি বছরও পরিচালক বিশাল ভরদ্বাজের 'ও রোমিও' সিনেমায় IB চিফ ইসমাইল খানের চরিত্রে তাঁর দক্ষ অভিনয়ের পরিচয় পাওয়া গিয়েছে। এছাড়াও চলতি বছর মার্চে মুক্তি পেয়েছে অ্যামাজন প্রাইমে 'সুবেদার' এবং তাঁর আগে OTT-তে ডেবিউ করেন প্রকাশ ঝাঁয়ের 'সংলাপ' সিরিজ দিয়ে।
আসল নাম বিশ্বনাথ পাটেকর। ১৯৭৮ সালে 'গমন' ছবিটির মাধ্যমে সিনেজগতে তাঁর হাতেখড়ি হয়। এরপর একে একে 'পরিন্দা', 'ক্রান্তিবীর', 'অগ্নিসাক্ষী', 'খামোশি', 'অব তক ছপ্পন', 'নতসম্রাট'-এর মতো সিনেমায় তাঁর দুঁদে পারফর্ম্যান্সের মাধ্যমে দর্শকদের মনজয় করে নিয়েছিলেন। হিন্দির পাশাপাশি বহু মারাঠি ছবিতেও অভিনয় করেন নানা। সিনেমাজগতে তাঁর অবদানের জন্য ২০১৩ সালে তাঁকে পদ্মশ্রী পুরস্কারে সম্মানীত করা হয়। ৩ বার জাতীয় পুরস্কারও পেয়েছেন নানা পাটেকর।
লাভারবয় হিরোর ইমেজে ঘেরা বলিউডে ৭-এর দশক থেকে কেরিয়ার শুরু করা নানা পাটেকর ছিলেন সমান্তরাল জ্যঁরের অভিনেতা। মুম্বইয়ের জেজে স্কুল অফ আর্ট থেকে অভিনয় শিক্ষায় হাতেখড়ি হয়। ১৯৮৬ সালে 'অঙ্কুশ' ছবিতে জাত চিনিয়েছিলেন এই অভিনেতা। তবে কেরিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট হয়ে দাঁড়ায় ১৯৮৯ সালে মুক্তি পাওয়া বিধু বিনোদ চোপড়ার 'পরিন্দা'। গ্যাংস্টার 'আন্না'-র চরিত্র তাঁকে প্রথম জাতীয় পুরস্কার এনে দেয়। তারপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক চ্যালেঞ্জিং রোলে দাপটের সঙ্গে অভিনয় করেন। গলার স্বরের ওঠানামা, চোখের স্থির দৃষ্টি, শরীরী ভাষা এবং সংলাপ উচ্চারণে নানা যেন এক সিগনেচার তৈরি করে ফেলেছিলেন। একজন ক্যারেক্টার অ্যার্টিস্ট যে গোটা সিনেমাটিকে নিজের দক্ষতায় এক অন্যমাত্রায় নিয়ে যেতে পারেন, নানা পাটেকর ছিলেন তার উজ্জ্বল উদাহরণ।
৯-এর দশক নানা পাটেকরের অভিনয় জীবনের সবচেয়ে সফল সময় ছিল। ১৯৯২ সালে 'অঙ্গার' ছবির জন্য সেরা ভিলেনের ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পান। এরপর ১৯৯৩ সালে সুপার ডুপার হিট হয় 'তিরঙা' ছবিটি। ১৯৯৪ সালে 'ক্রান্তিবীর'-এ তাঁর অভিনয় ছিল জ্বালাময়ী। যেখানে তিনি 'প্রতাপ নারায়ন তিলক'-এর চরিত্রে অভিনয় করেন। এটির জন্যও পেয়েছিলেন জাতীয় পুরস্কার। একইসঙ্গে ফিল্মফেয়ার পুরস্কারও জিতে নেন তিনি। ১৯৯৬ সালে 'অগ্নিসাক্ষী'-র সিনেমার জন্য তৃতীয় জাতীয় পুরস্কারটি পান নানা।
নানাবিধ চরিত্রে তাঁর সাবলীল অভিনয় দর্শকদের কাছে ফেভারিট করে তুলেছিল নানা পাটেকরকে। কখনও দেখা গিয়েছে ভয় ধরানো ভিলেনের চরিত্রে, আবার কখনও জটিল মনস্তাত্বিক প্রোটাগনিস্ট হিসেবে। আবার কখনও অভিনয় করেছেন স্পর্শকাতর কোনও চরিত্রেও। পর্দায় তাঁর উপস্থিতি সিনেমায় এক অদ্ভূত দাপট তৈরি করত।
২০০০ সাল পরবর্তী সময়েও নানা পাটেকর হিন্দি সিনামা জগতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে রয়ে গিয়েছিলেন। ২০০৪ সালে 'অব তক ছপ্পন' সিনেমায় তিনি সাধু আগাসে, এক দুঁদে মুম্বই পুলিশ অফিসারের চরিত্রে অসাধারণ অভিনয় করেছিলেন। সেই দশকের অন্যতম সেরা চরিত্র ছিল সেটি। ২০০৫ সালের 'অপহরণ' সিনেমায় তাঁর জটিল রাজনীতিবিদের চরিত্রে অভিনয় ফিল্মফেয়ারের সেরা ভিলেনের পুরস্কার এনে দেয়।
তবে নানা পাটেকর দেখিয়েছিলেন দুঁদে অভিনেতা হাল্কা কমিক চরিত্রেও দাগ কাটতে পারেন। ২০০৭ সালে 'ওয়েলকাম' ছবিতে গ্যাংস্টার উদয়ের চরিত্র সকলের পছন্দের। তাঁকে সম্পূর্ণ অন্য অবতারে পেয়েছিলেন তাঁর ভক্তরা। ২০১৫ সালে 'ওয়েলকাম ব্যাক' ছবিতেও এই চরিত্রেই পাওয়া গিয়েছিল তাঁকে। ২০১০ সালে 'রাজনীতি' ফের তাঁকে রাজনৈতিক চরিত্রে ফেরার সুযোগ করে দেয়।
২০১৬ সালে মারাঠি ছবি 'নটসম্রাট' তাঁর জীবনের অন্যতম সেরা সিনেমা হিসেবেই থেকে যাবে। এর জন্যও তিনি ফিল্মফেয়ারে সেরা অভিনেতার পুরস্কার পান। ২০১৮ সালে 'কালা' নামে তামিল ছবিতে রজনীকান্তের সঙ্গে অভিনয় করেন।
তবে শুধু অভিনেতা নন, অনেকেই হয়তো জানেন না নানা পাটেকর ছিলেন পরিচালকও। 'প্রহার' নামে জনপ্রিয় সিনেমাটিই ছিল নানা পাটেকরের প্রথম পরিচালিত ছবি। নিজেই ছিলেন প্রোটাগনিস্ট।
৭০ বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও একের পর এক সিনেমায় অভিনয় করেন নানা পাটেকর। ২০২৪ সালে 'বনবাস', ২০২৫ সালে 'হাউসফুল ৫', ২০২৬ সালে 'ও রোমিও' এবং 'সুবেদার' ছিল তাঁর শেষ ছবিগুলি।
অন্যদিকে, মহারাষ্ট্রের ক্ষরায় প্রভাবিত কৃষকদের সাহায্যার্থে তিনি সহ মারাঠি অভিনেতা মকরন্দ আনাসপুরের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে 'নাম ফাউন্ডেশন' নামে একটি NGO খুলেছিলেন। চাষীদের মসিহা হয়ে উঠেছিলেন নানা।
পরবর্তীকালে নানা পাটেকরকে দেওয়া হয়েছিল সাম্মানিত লেফটেন্যান্ট কর্নেলের পদও।