
LPG গ্যাস সঙ্কটে ভুগছেন আম জনতা। শহরের একাধিক রেস্তোরাঁ-পাইস হোটেলের মেন্যু কাটছাঁট করা হয়েছে। বাঙালির রান্নাঘরে প্রভাব পড়েছে। খাদ্য রসিক বাঙালিরা এখন আর পঞ্চ পদে খাওয়া-দাওয়া সারছেন না, বরং এক কি দুই পদেই সারছেন খাওয়া-দাওয়া। আম জনতার পাশাপাশি টলিপাড়ার তারকাদের হেঁশেলেও সমস্যা দেখা দিয়েছে। বাকি পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতোই জ্বালানী সংকটে দুশ্চিন্তায় টলিউডের তারকারাও। তাঁরা কে কীভাবে গোটা বিষয়টা সামলাচ্ছেন, খোঁজ নিল bangla.aajtak.in।
মল্লিকা মজুমদার
আমি চেষ্টা করছি যে একবারে যতটা রান্না করে নেওয়া যায়। আলাদা আলাদা করে ভাগ না করে। আমরা বাঙালিরা এমনিই ভাগে ভাগে রান্না খেতে ভালোবাসি তো, কিন্তু এই সময় ভাজা, ডাল, মাছ, তেতো, চাটনি না করে যতটা কমপ্যাক্ট করা যায়, দুবেলার রান্না একবারে করে নেওয়া অথবা আমার স্বামী যেমন আলাদা আলাদা খেতেই পছন্দ করেন, সেক্ষেত্রে চষ্টা করি রান্নার সময়টা একই রাখতে। মায়ের কাছ থেকে শেখা যতটা ঢিমে আঁচে গ্যাস রাখা যায় ততটা গ্যাস কম লাগে কিংবা ঢাকা দিয়ে দিয়ে রান্না করা, জলের ছিটে দিয়ে রান্না করলে সেদ্ধ তাড়াতাড়ি হয়, আমি এগুলোই এখন করছি। আমার রাইস কুকার, ইন্ডাকশন আছে, এইগুলো নিয়েই চলছে। মাটন রান্না করতে হলে আমি রাইস কুকারেই করে নিচ্ছি। তোমার মেনু থেকে কিছু বাদ দেওয়ার দরকার নেই, শুধু রান্নার সঠিক পদ্ধতি জানতে হবে। খুব বড় কিছু রান্না না রেখে আমি চেষ্টা করছি একবারে কিছু করে নেওয়ার। বার বার গ্যাস অন না করে, কিছু জিনিস আগে থেকে করে রাখলে অনেক সহজ হয়। খুব বেশি ভাজাভুজি করলে সময় অনেক লাগে। এই সময় ওয়ান পট মিল খুব ভাল, অনেক ভাল ওয়ান পট মিল রান্না করে খাওয়া যায়, খাওয়ানো যায়। একটা সঙ্কটের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, এই সঙ্কটের কারণ-অকারণ নিয়ে ভেবে নিজের জীবন ব্যতিব্যস্ত করে মধ্যবিত্ত কী করবে?আমাদের তো চলতে হবে, বাঁচতে হবে, বাড়ির মানুষগুলোকে খাওয়াতে হবে। বাঙালি এমন প্রচুর পদ রয়েছে, যাতে প্রচুর পুষ্টি রয়েছে অথচ কম সময়ে হয়ে যায়। সারা বিশ্বে যখন এমন অবস্থা চলছে, তখন না হয় রোজের মেনু একটু ছোট করে নিলাম। তবে বাঙালি তো, বেশিদিন সেটা করতে পারব না।
সুদীপা চট্টোপাধ্যায়
আমার তিনটে রান্নাঘর, একটা বাড়ির হেঁশেল, দ্বিতীয়টা আমার ইউটিউবের রান্নাঘর আর তৃতীয়টা বাড়ির ঠাকুরঘরের রান্নাঘর, যেখানে নিত্য পুজোর ভোগ হয়। তিন ক্ষেত্রেই আমি একটা ম্যানেজ করেছি, যে রান্নাঘরে একটা সিলিন্ডারই রয়েছে হাতে আমার কিছু নেই। রান্নার দিদিকে আমি শেখালাম কীভাবে মাইক্রোওভেনে মাছ ভাজতে হয়, কীভাবে ইন্ডাকশন ব্যবহার করে ভাতটা করে নেওয়া যায়, আমার তিনটে পোষ্য আছে, তাদের খাবার কীভাবে করতে হয়। এইগুলো করেই আপাতত চালাচ্ছি। আমার ইউটিউবের চ্যানেলের জন্য আমি ইন্ডাকশনেই রান্না করছি। ঠাকুরের ভোগের জন্য আমার আগে থেকে কেনা নতুন ছোট্ট রাইস কুকার ছিল, সেখানেই খিচুড়ি ভোগটা হয়ে যাচ্ছে। ঠাকুরের জন্য আলাদা গ্যাস সিলিন্ডার থাকে, কিন্তু সেটা শেষ হয়ে গেছে, তাই আমার কাছে এটা ছাড়া উপায় নেই। বাড়িতে গ্যাস-ইন্ডাকশন মিলিয়ে করছি। প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া তিনটে হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরের একটিতে গ্যাস বুক করেছিলাম, সেখানে আমায় জানানো হয় যে তিনদিনের মধ্যে গ্যাস পেয়ে যাব, কিন্তু এখনও তা পাই নি। রোজের খাবারেও প্রভাব পড়েছে। এখন ভাজাভুজিটা করছি না। টাটকা মাছ এনে রান্না করে নিচ্ছিল, কারণ ফ্রিজে থাকা মাছ না ভাজলে আঁশটে গন্ধ বের হয়। রুই মাছের বাটি চচ্চড়ি, চিংড়ির মালাইকারি না করে, বাটি চচ্চড়ি করে নিচ্ছিল বা বিভিন্ন রকমের ভর্তা খাচ্ছি, শুঁটকি খেয়েছি একদিন। যেগুলো রেখে রেখে খাওয়া যায়, সেরকম করছি, প্রেশার কুকারের ব্যবহার বাড়িয়েছি। চিকেন, রাইস, মাছের ঝোল, আলু-পটলের ঝোলও করে নিচ্ছি প্রেশার কুকারে। এটা অনেকেই জানেন না যে প্রেশার কুকারে মাছের ঝোলও হয়। তবে এ ক্ষেত্রে জলের পরিমাণটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। মাইক্রোওয়েভ আভেনেও মাইক্রো গ্রিল মোডেও মাছ ভাজা যায়। এভাবেও মাছের গায়ে তেল মাখিয়ে তা ভাজা যায়।
রূপা ভট্টাচার্য
আমার ব্যক্তিগতভাবে যেহেতু খুব ছোট সংসার, দুজনের, দুবেলা যে খুব বেশি রান্না করে খাই, এরকম নয়। একবেলা ভাত, ডাল, মাছ খেলে অন্যবেলায় সবজি, স্যালাড খেয়ে নিই। এর জন্য খুব বেশি জ্বালানি লাগে না। আমরা যারা শহরে আছি, আমাদের ইন্ডাকশনের বিকল্প রয়েছে, কিন্তু যাদের বড় পরিবার, ছোট শিশু রয়েছে, বয়স্ক মানুষ রয়েছে, তাদের বারংবার গরম জল লাগতে পারে, দুধ গরম করতে হতে পারে। যারা শহরের বাইরে থাকেন, মফঃস্বলে থাকেন কিংবা অতটা প্রযুক্তিগতভাবে এগিয়ে নেই, যাদের একমাত্র ভরসা এই গ্যাস, তাদের জন্য সত্যিই এটা সঙ্কট। ২১ বা ২৫ দিনে শহরে গ্যাস পাওয়া গেলেও, জেলার ক্ষেত্রে ৪৫ দিন, এতদিন একটা গ্যাসে তাঁদের নাও চলতে পারে। তাদের ইন্ডাকশন, মাইক্রোওয়েভ নাও থাকতে পারে। আর এই যুদ্ধ পরিস্থিতি আমরা দেখতে পাচ্ছি। নানান কথাও শুনতে পারছি সংবাদমাধ্যমে। কেন্দ্র বলছে প্রচুর গ্যাস রয়েছে, রাজ্য সরকার বলছে কালোবাজারি রুখতে হবে। আমার ঘরে এখন স্টক রয়েছে, কিন্তু আমার অনেক সহকর্মী গ্যাস সমস্যায় ভুগছেন। অনলাইনে ইন্ডাকশনও নেই। সঙ্কট সত্যি হচ্ছে নাকি কালোবাজারি হচ্ছে, বিষয়টা আমার কাছে স্পষ্ট নয়। সম্প্রতি ব্রিগেডে এক রাজনৈতিক দলের সভাতে দেখলাম একাধিক গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার হচ্ছে। এরকম সঙ্কটকালীন অবস্থা, সেক্ষেত্রে একটা রাজনৈতিক সভায় এসে এরকম পিকনিকের মতো পঞ্চব্যাঞ্জন খাওয়ার কোনও যুক্তি নেই। যাঁরা ভোট দেবেন তাঁরা কোনও সুবিধা পাচ্ছেন না অথচ রাজনৈতিক দলের সভায় এতগুলো গ্যাসের ব্যবহার, তীব্র নিন্দা করছি এটার। শহর ও গ্রামের মানুষের মধ্যে এই গ্যাস পাওয়া নিয়ে যে বিভাজন, সেটাও আমার মনে হচ্ছে ঠিক নয়। আমার খাবারের মেনু খুব একটা আহামরি নয়। আমি প্রচুর সবজি খাই, ফল খাই। সবজির ক্ষেত্রে একদিন একটু কেটে সেদ্ধ করে নিলে, সেটা আমার দু-তিনদিন চলে যায়। একবেলার খাবার মাইক্রোওয়েভে গরম করে নিই। আমি সারাদিনে এত পঞ্চব্যাঞ্জন রান্না করি না, দিনে বহুবার চা-কফি খাই এমনটা নয়। তাই আমার ব্যক্তিগতভাবে রুটিন বদল করার প্রয়োজন হয়নি।
জিরো ওয়াট (সৌম্য ঘোষ)
LPG গ্যাস না থাকলে যে সমস্যা আর পাঁচজনের বাড়িতে হচ্ছে তা জিরো ওয়াটের বাড়িতেও হচ্ছে। আর যেহেতু আমাদের ভ্লগিংটা পেশা, সেখানে ভিডিওর জন্য অনেক রকমের রান্না করতে হয়, কারণ এই রান্নাটাই আমাদের সঙ্গে সকলের যোগসূত্র, খুব সঙ্কটে আছি, সমস্যায় আছি। আমি বহুদিন চ্যানেলে কোনও ভিডিও নেই, ভয়ে করতে পারছি না। কারণ একটা-দুটো পদ দিয়ে দিয়ে দিনগুজারার মতো একটা করতে পারলেই হল, কারণ গ্যাস কখন আসবে জানি না। এক তো ভিডিও করা হচ্ছে না, কারণ এটা এখন বিনোদনের সময় নয়। জীবন যাপনটাই বড় হয়ে দাঁড়িয়েছি। তবে আমাদের ভ্লগিংটার কথা ভাবতে হচ্ছে, কারণ এটা তো রান্না ও খাওয়া-দাওয়া নির্ভর, প্রচুর মানুষ দেখেন। সবাই আমার মায়ের রান্নার ফ্যান কিন্তু এই গ্যাসের অভাবটা আমাদের রীতিমতো ভাবাচ্ছে। আমার মা একটা উনুন বানিয়েছে, সেটাতেই রান্না করা হবে এবং ভিডিও করা হয়েছে। এই উনুনকে কীভাবে আবার মানুষের জীবনে ফিরিয়ে আনা যায়, সেটার ভ্লগও আসছে। বিকল্প হিসাবে ইন্ডাকশন বা ইলেকট্রিক কিছুর ব্যবহারও বেশ ব্যয় যোগ্য, সেক্ষেত্রে উনুনের রান্না স্বাস্থ্যকর। আর এরকম সময়ে একটু কম খাওয়া-দাওয়া করছি, ভিডিওটাও কম হচ্ছে। LPG গ্যাসের এই সঙ্কট ভাবাচ্ছে, কারণ এটা তো হওয়ার কথা নয়।
কনীনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়
আমার দুই বাড়িতে কোথাও কোনও সিলিন্ডার নেই। আমি লক্ষ্য করিনি প্রথমে। আমি কাল জানতে পারি যে বাড়িতে সিলিন্ডারে গ্যাস নেই। বাড়িতে অনেক সদস্য, বাচ্চাও রয়েছে। তাদের মুখে খাবার তুলে দেওয়াটা সবার আগে জরুরি। একটা জিনিস বুঝে গিয়েছি ম্যানেজ করতে হবে সবটা। উত্তেজিত হলে কিছু হবে না। আমার গৃহ সহায়িকাকেও আমি এই কথা বলে চলেছি একটা রান্না একটা ভাত, এভাবেই ম্যানে করতে হবে সবটা। খাবারটা নিঃসন্দেহে ভীষণ দরকারি, কিন্তু খাবারের নামে আমরা যে বিলাসিতাটা করি সেটা বন্ধ করতে হবে।