
বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির করুণ কাহিনীর কথা অজানা কারোরই নয়। বিশ্বাস ব্রাদার্স তথা প্রাক্তন ফেডারেশন সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাসের দাপটে টলিপাড়ায় শ্বাস নেওয়াও দায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। শ্যুটিং বন্ধ করে দেওয়া, ইন্ডাস্ট্রিতে অচলাবস্থা, একাধিক অনিয়মের বেড়াজাল এইসব তো ছিলই, এরই সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ব্যান কালচার। যার জেরে অনির্বাণ ভট্টাচার্য, ঋদ্ধি সেন সহ বেশ কিছু পরিচালক, কলা-কুশলীদের কাজ ছিল না বহুদিন। টলিপাড়ার অন্দরে এইসব নিয়ে কম জলঘোলা হয়নি। তবে ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যে পালা বদল ঘটেছে। বিজেপি সরকারের হাত ধরে বাংলা বিনোদন জগতের অরাজকতা একরকম শেষ হয়েছে। ভেঙে গেছে ফেডারেশন, ইমপা সহ বহু সংগঠন, গিল্ড। সিনেপাড়ার সেই অচলাবস্থার নিষ্পত্তি করতেই মাস দুয়েক আগে সরাসরি নির্বাচনের (Tollywood Election) মাধ্যমে টলিউডের ‘নর্দমা সাফ করা’র হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন মিঠুন চক্রবর্তী। এ বার গিল্ডের ভোট তদারক করার দায়িত্বে ছিলেন বিজেপি নেতা এবং রাজ্যের তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের উপদেষ্টা মিঠুন চক্রবর্তী।
নির্বিঘ্নে মিটল ভোট প্রক্রিয়া
রবিবারই শেষ হয়েছে স্টুডিওপাড়ার কলাকুশলীদের বিভিন্ন গিল্ডের নির্বাচন প্রক্রিয়া। টলিউড সূত্রের খবর, ২৩টি গিল্ডের নির্বাচিত বা মনোনীত (সব গিল্ডে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়নি) সদস্যরাই ফেডারেশনের সভাপতি ও বাকি সদস্যদের এবার নির্বাচন করবেন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দীর্ঘদিন পরে হওয়া টলিউডের এই ভোটে মোট ৪,৯০৮ জন কলাকুশলী ভোট দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ মেকআপ আর্টিস্ট, কেউ ক্যামেরাম্যান, কেউ হেয়ারড্রেসার, কেউ বা সাউন্ডের কাজ করেন। এই কলাকুশলীদের ২৩টি গিল্ডের মোট প্রার্থী ছিলেন ৩৩৩ জন। রাজ্যে এ বছর মে মাসে রাজনৈতিক পালাবদলের পরে টলিউডের কলাকুশলীদের এই সব গিল্ডের নির্বাচন স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু ভাবে করাই ছিল রাজ্য প্রশাসনের কাছে সব চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। মিঠুন চক্রবর্তী, রুদ্রনীল ঘোষের কড়া নজরদারিতে তিনটে স্টুডিওতে চলেছে এই ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া।
নির্বাচন নিয়ে মিঠুন চক্রবর্তীর বক্তব্য
সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মিঠুন বলেন, 'এতদিন টলিউডে একনায়কতন্ত্র চলছিল। কেউ কাজ করতে চাইছিল না। তবে এবার ভোটের পর টলিপাড়ায় ছবি বদলে যাবে।' পরিচালকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, 'রাজ্য সরকার ৩০ শতাংশ ভর্তুকি দিচ্ছে, আপনারা ছবি করুন।' মিঠুন চক্রবর্তী আরও বলেন, 'মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ মেনেই তিনি কাজ করছেন।' যাঁরা নির্বাচনে জয়ী হবেন, তাঁদের উদ্দেশেও বিশেষ বার্তা দিয়েছেন তিনি। মিঠুনের মতে, 'জয়লাভের অর্থ সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর উপর অধিকাংশ মানুষের আস্থা রয়েছে। তাই দায়িত্ব পাওয়ার পর পুরনো দিনের মতো কোনও অনিয়ম বা অস্বচ্ছ কাজকর্মে জড়ানো চলবে না।' ভোট মিটলে সংশ্লিষ্ট সকলের সঙ্গে আলোচনায় বসবেন তিনি। তবে বিষয়টি সরাসরি তাঁর নিয়ন্ত্রণে নেই, শ্রম দফতরের অধীনেই রয়েছে বলে জানিয়েছেন অভিনেতা। যাঁরা বর্তমানে বৈধ ভোটার নন, তাঁদের ভবিষ্যতে কীভাবে ভোটদানের সুযোগ দেওয়া যায়, তা নিয়েও ভাবনাচিন্তার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে মৃত ব্যক্তিদের নাম ভোটার তালিকায় থেকে যাওয়ার অভিযোগও তুলেছেন মিঠুন।
মিঠুন ও পাপিয়া অধিকারীর মতভেদ
স্বরূপ বিশ্বাসের ঘনিষ্ঠদের একাংশের প্রার্থী হওয়া প্রসঙ্গ তুলে পাপিয়া শনিবার বলেছিলেন, ‘মিঠুনদাকে ভুল বোঝানো হয়েছে।’ যার জবারে রবিবার মিঠুন বলেন, ‘আমি বাচ্চা ছেলে নই যে, আমাকে যে যা বোঝাবে, বুঝে যাব।’ তবে রবিবারও পাপিয়া বলেন, ‘বহু মানুষ বাইরে থেকে গেলেন। তাঁদের নমিনেশন জমা করতে বা ভোট দিতে দেওয়া হলো না।’ সুর আরও চড়িয়ে এ দিন পাপিয়ার বক্তব্য, ‘এমন কয়েক জনকে ভোটে প্রার্থী হতে দেওয়া হয়েছে, যাঁরা আগে অত্যাচার করেছেন। আবার যদি তাঁরা অত্যাচার করেন, তা হলে টালিগঞ্জের বিধায়ক হিসেবে আমাকেই তো উত্তর দিতে হবে!’ তাঁর নিশানায় ঠিক কোন প্রার্থীরা রয়েছেন, সেটা অবশ্য পাপিয়া তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট করেননি। তবে এই বিষয়ে মিঠুন পাপিয়ার অভিযোগ কার্যত নাকচ করেছেন। তিনি বলেছেন, ৬ মাসের মধ্যে বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির চেহারা বদলে যাবে। যাঁদের নথি সত্যি, তাঁদের কাজে নেওয়া হবে। মিথ্যে কোনও কিছুকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। সব যোগ্য ব্যক্তি কাজ পাবেন, এটা গণতন্ত্র, টালিগঞ্জের ভোট প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখে মন্তব্য মিঠুন চক্রবর্তীর।
কী বলছেন রুদ্রনীল ঘোষ?
পাপিয়া অধিকারীর বক্তব্যের উল্টো সুর শোনা গিয়েছে বিধায়ক রুদ্রনীলের গলায়। ভোটে কে প্রার্থী হবেন, সেটা ঠিক করেছে শ্রম দপ্তরের আইনসিদ্ধ বিভিন্ন গিল্ডের সদস্যরা। সেখানে বাইরের কেউ কিছু করতে পারেন না। বিধায়ক-অভিনেতা বলেন, এটা অনেকে বুঝতে পারছেন না।
রূপা গঙ্গোপাধ্যায়ের বক্তব্য
স্বরূপ ঘনিষ্ঠ প্রার্থী প্রসঙ্গে রূপা গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, কে ভোটে দাঁড়াবেন আর কে দাঁড়াবেন না, সেটা এ ভাবে বলা যায় নাকি! স্বরূপের সঙ্গে কাউকে দেখা গিয়েছে বলে কেউ যদি আপত্তি করে, তা হলে তো অন্য কেউ বলতে পারে যে, ওই লোকটাকে সিপিএমের সঙ্গে দেখেছি, ওকে বিজেপির সঙ্গে দেখেছি— প্রার্থী করা যাবে না। এটা তো হতে পারে না। এটা কি কাম্য?
ইতিমধ্য়েই মেকআপ গিল্ডের সভাপতি হিসাবে নির্বাচিত হয়েছেন জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত মেকআপ শিল্পী সোমনাথ কুণ্ডু। টালিগঞ্জের স্টুডিয়োপাড়ার এই ভোট আপাত দৃষ্টিতে অরাজনৈতিক হলেও, পাপিয়া অধিকারীর অভিযোগ এবং তার উল্টো সুরে মিঠুন-রুদ্রনীল ও রূপার বক্তব্যের জেরে, টালিগঞ্জের বিধায়ক নিজেই একঘরে হয়ে যাচ্ছেন বলে মনে করছেন অনেকেই। এখনও ফেডারেশন এবং ইমপার নির্বাচনও বাকি, সেখানে কী হয় এখন সেটাই দেখার।