
বরাবরই তৃণমূল কংগ্রেসের তুরুপের তাস ছিল টলিপাড়ার তারকারা। যে কোনও মিছিল-মিটিংয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে সর্বদাই দেখা যেত এঁদের। ছাব্বিশের নির্বাচনেও তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন সোহম চক্রবর্তী, অরুন্ধতী মৈত্র, সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজ চক্রবর্তী, অদিতি মুন্সী, ইন্দ্রনীল সেন। অপরদিকে, বিজেপির পক্ষ থেকে পাপিয়া অধিকারি, শর্বরী মুখোপাধ্যায়, রূপা গঙ্গোপাধ্যায়, হিরণ চট্টোপাধ্যায়, রুদ্রনীল ঘোষ, অগ্নিমিত্রা পাল। ৪ মে বঙ্গে প্রত্যাবর্তনের ঝড়ে একাধিক নক্ষত্রের পতন ঘটে গিয়েছে। দেখে নিন কোন কোন তারকা জয়ী হলেন আর কাদের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়ল না।
রাজ চক্রবর্তী
একুশের বিধানসভা নির্বাচনে ব্যারাকপুর কেন্দ্র থেকে জিতে প্রথমবারের মতো বিধায়ক পদ পেয়েছিলেন পরিচালক রাজ চক্রবর্তী। ব্যারাকপুর কেন্দ্র যতটা খুশি ছিল বিধায়কের কাজে তার চেয়েও বেশি খুশি ছিল দল। তাই ছাব্বিশের নির্বাচনেও তিনি দ্বিতীয়বারের জন্য টিকিট পান। কিন্তু ৫ বছরেই আসন খোয়ালেন রাজ। রাজকে টেক্কা দিয়ে প্রায় ১৬ হাজার ভোটে জয়ী হলেন প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপি প্রার্থী কৌস্তভ বাগচী। সোমবার স্ট্রং রুমের বাইরে রাজের গায়ে কাদা ছোঁড়া হয় এবং তাঁকে দেখে চোর চোর স্লোগানও দেওয়া হয়। এই মুহূর্তে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেছেন রাজ।
সোহম চক্রবর্তী
রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলেন সোহম। করিমপুর কেন্দ্র তাঁর কাছে অচেনা হলেও সোহম খুব আত্মবিশ্বাসী ছিলেন নিজের জয় নিয়ে। প্রচারেও কোনও খামতি রাখেননি পর্দার মাস্টার বিট্টু। সোমবার সকালে গণনা শুরুর পর থেকেই এগিয়ে ছিলেন সোহম। কিন্তু বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চিত্রটা বদলাতে শুরু করে। শেষে পদ্মপ্রার্থী সমরেন্দ্র ঘোষের থেকে ১০১৮৫ ভোটের ব্যবধানে পরাস্ত হলেন চণ্ডিপুরের বিদায়ী তৃণমূল বিধায়ক সোহম।
সায়ন্তিকা চক্রবর্তী
চব্বিশের বরানগরের উপনির্বাচনে জিতে বিধায়ক হয়েছিলেন সায়ন্তিকা। বিনোদন দুনিয়া থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখে রাজনীতির কাজেই মনোনিবেশ করেছিলেন টলিপাড়ার নায়িকা। এবারের নির্বাচনেও তৃণমূলের টিকিট পেয়ে জয় নিয়ে ভীষণভাবে আশাবাদী ছিলেন তিনি। আদা জল খেয়ে প্রচারে নেমে পড়েছিলেন সায়ন্তিকা। শেষবেলায় দেবকে এনেও চমক দিয়েছিলেন সায়ন্তিকা। কিন্তু শেষ রক্ষা হল না। বিজেপির সজল ঘোষের কাছে গোহারান হারলেন সায়ন্তিকা। সজল ঘোষের থেকে ১৬ হাজার ৯৫৬ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হলেন নেত্রী-অভিনেত্রী।
ইন্দ্রনীল সেন
গায়ক ইন্দ্রনীল সেন পরপর দু'বার চন্দননগর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে জিতে বিধায়ক হয়েছিলেন। তবে ছাব্বিশের বিধানসভা ভোটে বিজেপি প্রার্থী দীপাঞ্জনকুমার গুহর কাছে ১২ হাজারেরও বেশি ব্যবধানের ভোটে হেরে হ্যাটট্রিকের সুযোগ হাতছাড়া হল গায়কের।
লাভলি মৈত্র
টেলিপাড়ার চেনা মুখ লাভলি মৈত্র তথা অরুন্ধুতী। তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী হিসাবে সোনারপুর দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্রে দাঁড়িয়েছিলেন লাভলি। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী দুঁদে নেত্রী তথা অভিনেত্রী রূপা গঙ্গোপাধ্যায়। কোনওভাবেই জয়ের মুখ দেখতে পারলেন না লাভলি। বর্ষীয়ান অভিনেত্রী রূপার কাছে হারলেন লাভলি।
অদিতি মুন্সী
একুশের বিধানসভা ভোটে রাজারহাট-গোপালপুর কেন্দ্র থেকে জিতে বিধায়ক হন অদিতি মুন্সী। এবারও সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রে তৃণমূলের 'বাজি' ছিলেন তিনি। তবে সোমবার ভোটগণনার শুরুর দিকে এগিয়ে থাকলেও পরে পদ্মপ্রার্থী তরুণজ্যোতি তিওয়ারির কাছে প্রায় ২৮ হাজার ভোটের মার্জিনে পরাস্ত হলেন অদিতি।
রুদ্রনীল ঘোষ
ভোটের ময়দানে প্রথমবার খাতা খুললেন রুদ্রনীল। শিবপুরে ফুটল পদ্মফুল। তৃণমূল প্রার্থী রানা চট্টোপাধ্যায়কে ১৬ হাজারেরও বেশি ভোটের মার্জিনে পরাস্ত করলেন অভিনেতা। সোমবার সকাল থেকেই রুদ্রনীল এগিয়ে ছিলেন। শেষমেশ বাম থেকে ভায়া তৃণমূল হয়ে বিজেপিতে যাওয়া 'ঘরের ছেলে'কে জিতিয়ে আনন্দে ভাসল শিবপুর।
পাপিয়া অধিকারী
অরূপ বিশ্বাসের গড় টালিগঞ্জ। এই কেন্দ্রের হেভিওয়েট প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিজেপি দাঁড় করিয়েছিলেন বিবি পায়রা পাপিয়া অধিকারীকে। দীর্ঘদিন সিনেদুনিয়ায় ব্রাত্য থাকলেও ৬ হাজার ভোটের ব্যবধানে শেষ হাসি হাসলেন পাপিয়াই।
অগ্নিমিত্রা পাল
তৃণমূলপ্রার্থী তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়কে ৪০ হাজারেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে রেকর্ড মার্জিনে আসানসোল দক্ষিণে জিতলেন অগ্নিমিত্রা পল। গোড়া থেকেই নিজের জয় নিয়ে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। এবার ভোটে জিতে জানালেন, "মানুষই সব ঔদ্ধত্যের জবাব দিয়েছে।"
শর্বরী মুখোপাধ্যায়
চলতিবারে যাদবপুরের বিজেপি প্রার্থী শর্বরী মুখোপাধ্যায়ের 'জেতা' নিয়ে অনেকেই সন্দিহান ছিলেন। তবে ২৬ রাউন্ড ভোটগণনা শেষে তৃণমূল প্রার্থী দেবব্রত মজুমদার ও বামপ্রার্থী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যের মতো পোড় খাওয়া দুই রাজনীতিকদের টেক্কা দিয়ে ২৩ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়ের পথে শর্বরী মুখোপাধ্যায়।
হিরণ চট্টোপাধ্যায়
জেতা আসন খড়গপুর হাতছাড়া হলেও শ্যামপুর কেন্দ্রে শেষ হাসি হাসলেন পদ্মশিবিরের হিরো হিরণ চট্টোপাধ্যায়। গোড়ার দিকে তৃণমূল প্রার্থী নদেবাসী জানার থেকে পিছিয়ে থাকলেও পরে ২২ হাজার ২৬০ ভোটের ব্যবধানে জিতেছেন। এ বছর দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে কম বিতর্ক হয়নি হিরণের। তবে সেই সব বিতর্ককে দূরে রেখে শ্যামপুরবাসীর মন জয় করতে পারলেন 'মাচো মস্তানা'ই।