
শিরোনামে পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়। টেকনিশিয়ান স্টুডিওতে আয়োজিত বিশেষ বৈঠকে অভিনেতা- পরিচালকের করা মন্তব্যের পর থেকেই চরম কটাক্ষের মুখে পড়েছেন তিনি। সেই সঙ্গে 'গোঁদের উপর বিষফোঁড়া'-র মতো, তাঁর করা ২০২১ সালের একটি পোস্ট এবং যার জেরে থানায় অভিযোগ দায়ের। সব মিলিয়ে বিপাকে তিনি। সোশ্যাল মিডিয়ায় 'পাল্টিবাজ', 'সুবিধাভোগী' থেকে শুরু করে আরও নানা রকম তকমা দেওয়া হয়েছে পরমব্রতকে। এই নিয়ে সংবাদমাধ্যমের সামনে নিজের সাফাইও দিয়েছেন অভিনেতা। রুদ্রনীলের পাশে বসে করা পরমব্রতর বক্তব্য ভাইরাল হয়েছে। এরপরই হঠাৎ ভাইরাল হয় তাঁর রুদ্রনীলের বিরুদ্ধে বলা একটি ভিডিও।
রুদ্রনীলকে নিয়ে আগে কী বলেছিলেন?
ভাইরাল হওয়া পুরনো ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, এক সাংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে 'বন্ধু' রুডির বিরুদ্ধে কথা বলছেন পরম। তাঁকে সাংবাদিক জিজ্ঞেস করেছিলেন 'রুদ্রনীল বলছে ও কোনও কাজ পায় না, বিজেপি বলে এবং মুখ খোলে বলে এবং প্রায় বাড়ি বিক্রি করে দিতে হবে এরকম অবস্থা, আপনি জানেন এই ব্যাপারটা?' উত্তরে পরমব্রত বলেছিলেন, 'রুদ্রনীলের ব্যাপারটা আলাদা। কারণ অনেক ঘাটের জল খাবো, অনেক দিক থেকে সুবিধা নেবো, এটা করতে গেলে মুশকিল হয় বিষয়টা। করতাম ডিওয়াইএফআই (DYFI), হয়ে গেলাম তৃণমূল কংগ্রেস (TMC)। তখন তাদের সঙ্গে ওঠা- বসা, সেই সূত্রে পদ পাওয়া, লাল বাতি হওয়া, তারপর আবার কোনও একটা ঘটনা ঘটা। সেটা কি ঘটনা আমি জানতে চাই না। সেখান থেকে আবার বিজেপি (BJP) হয়ে যাওয়া। এত কিছু করলে...খুব সত্যি বলতে গেলে আমি রুদ্রনীলের সঙ্গে নিজের তুলনা টানতে চাই না। এটা বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন। আমি রুদ্রনীলের সঙ্গে, একসঙ্গে বিশ্বাসযোগ্যতা অনুজায়ী উচ্চারিত হতে চাই না।"
রুদ্রনীলকে নিয়ে সম্প্রতি কী বলেছেন?
টেকনিশিয়ান স্টুডিওর বৈঠকে রুদ্রনীলের পাশে বসে সকলের সমস্যা শোনেন পরমব্রত। এই চিত্র দেখে সকলেরই শুরুতে অবাক হয়েছিলেন। এরপর, সেই বৈঠকেই বিস্ফোরক মন্তব্য করেন অভিনেতা- পরিচালক। কিছুটা আগেবপ্রবণ হয়ে পরমব্রত উপস্থিত সকলকে বলেন, "আমি যে অধিকারে এখানে বসে কথা বলছি, আমার প্রাথমিক ধারণা, রুদ্র আর আমার ২৫ বছরের বন্ধুত্বের জন্য। রুদ্র ও আমার বন্ধুত্বের মধ্যে, যতটা বেশি বন্ধুত্ব রয়েছে, তার থেকে বেশি মত পার্থক্য রয়েছে। সেই মত প্রার্থক্য কখনও ব্যক্তিগত, কখনও রাজনৈতিকও। কিন্তু আমরা এই বন্ধুত্বের মধ্যে কখনও রাজনীতি আসতে দিইনি। আমার মনে হয়, আমাদের এই ইন্ডাস্ট্রিতে সবার আগে এটাই করা দরকার। আমার মনে হয় যাঁরা যাঁরা ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে থাকবেন, তাঁদের রুজি- রুটি, তাঁদের প্রাথমিক পেশা যেন সিনেমা হয়। এটা সবার আগে হওয়া দরকার। কারণ একজন সিনেমাকর্মী, তিনি একজন শিল্পী হতে পারেন, কলাকুশলী হতে পারেন, পরিচালক হতে পারেন, প্রযোজক হতে পারেন, এমনকী, ডিস্ট্রিবিউটার ও একজিবিটার হতে পারেন, একমাত্র তিনি বা তাঁরাই বুঝতে পারে, সিনেমার কীভাবে বিবর্তন ঘটছে। শুধুমাত্র একটা রাজনৈতিক কারণে, যদি একটা সংগঠনের মাথার উপর কাউকে বসিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে আজকে যে পরিস্থিতিটা আমরা দেখছি, সেই পরিস্থিতির সম্মুখীন আবার হতে হবে। এই যে অনেকেই বলছেন, যে ২০১১ এর আগে আমরা খুব আনন্দে কাজ করতাম, তা আমিও স্বীকার করি। এই পরিবেশ আমাদের ফিরিয়ে আনতে হবে। এখানে কেউ জয় বাংলা বলবেন, কেউ জয় শ্রীরাম বলবেন, কেউ বন্দে মাতরম বলবেন, কেউ লাল সেলাম বলবেন। কিন্তু সিনেমার কাজের সময় সেটা গুরুত্ব পাবে না।"
'দাঁতে দাঁত চেপে ক্ষমা চেয়েছিলাম' মন্তব্য
সেদিন টেকনিশিয়ান স্টুডিওর বৈঠকে পরমব্রত স্পষ্ট জানান, ফেডারেশনের বিরুদ্ধে মামলা করার কারণে টলিউডে অলিখিতভাবে 'ব্যান' হয়েছিলেন তিনি। ফলে কোনও কাজ পাচ্ছিলেন না। আর সেসময়ই পরম ও তাঁর স্ত্রী পিয়ার সন্তানের জন্ম হয়। তাঁর কথায়, "সেদিন আমার সদ্যোজাত সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে, দাঁতে দাঁত চেপে ক্ষমা চেয়েছিলাম। আর কোনও উপায় ছিল না তাই। আমি কারও বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত বিষোদগারের জন্য এখানে আসিনি। আমি কারও বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত রাগও পেশ করতে চাই না। কিন্তু আপনাদের যেহেতু বাড়ির লোক ভাবি, সেইজন্য ব্যক্তিগত অপমানের কথাটা ভাগ করে নিলাম। ভবিষ্যতে যেন এরকম পরিস্থিতি তৈরি না হয়।" পরমব্রতর করা মন্তব্য, 'সদ্যোজাত সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে, দাঁতে দাঁত চেপে ক্ষমা চেয়েছিলাম', নিয়েই সব মহলে আরও চর্চা বাড়ে।
কটাক্ষের পর সংবাদমাধ্যমের কাছে পরমব্রতর সাফাই
"আমায় পাল্টিবাজ বলার বা আমার সমালোচনা করারই কথা। আমি যদি সাধারণ মানুষের জায়গায় থাকতাম, যিনি ভিতরের ব্যাপারটা জানেন না, তার তো মনে হওয়ারই কথা, এ তো লাস্ট দু'দিন প্রচারে গিয়েছে। এ কেন হঠাৎ করে...তার কারণটা হচ্ছে, মানুষ খুব সহজ এবং সঙ্গত কারণেই ফেডারেশন বলব না, ফেডারেশন যিনি এতদিন সভাপতি ছিলেন সেই স্বরূপ বিশ্বাস এবং তাঁর দাদা প্রাক্তন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস এবং তৃণমূল -কংগ্রেস এই পুরো ব্যাপারটাকে এক করে দেখতেন। বা এখনও তাই দেখেন। আমি যদি একজন সাধারণ পাঠক বা দর্শক হই, আমি তো অত ডিটেলে ঢুকব না। আমি তো জানব যে, প্রাক্তন মন্ত্রী তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা অরূপ বিশ্বাস, তাঁর ভাই স্বরূপ বিশ্বাস, তিনি তৃণমূল কংগ্রেস কর্মী। তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আছে। তিনি তৃণমূল কংগ্রেসকে রিপ্রেজেন্ট করছেন। আমি এতদিন তাঁদের বিরুদ্ধে লড়াই করলাম সামনে থেকে। সামনের সারিতে থেকে। তারপর সুর নরম করলাম।"
তিনি যোগ করেন, "তারপর আমাকে, যদিও মাত্র দু'দিন, আমার অনেক সহকর্মীরা আমার থেকে অনেক বেশীদিন প্রচারে গিয়েছেন। তাঁদেরকে দেখলাম চার তারিখ রাত্রি থেকেই ভীষণভাবে নতুন সরকারকে আগমন করছেন। সেটা তাঁরা করুন। তাতে আমার কোনও সমস্যা নেই। কিন্তু তাঁরা অনেক বেশি সংখ্যায় এবং নানা রকমের সমীকরণে তাঁরা প্রচারে গিয়েছেন। তাঁদের জাজ করছি না আমি। তাঁদের ওপরেও নিশ্চয়ই কোনও চাপ ছিল বা অন্য কোনও কারণ ছিল। আমিও গিয়েছি সামান্য কয়েকটা প্রচারে। এবার এই পুরো জিনিসটার সঙ্গে যেই মুহূর্তে আমাকে ৪ঠা মে-এর জিজ্ঞেস করা হল, যে আপনার কী প্রত্যাশা নতুন সরকারের থেকে। তখন, যখন আমি ফেডারেশন বা প্রাক্তন সভাপতি কী কী করতেন দাদাগিরি ইত্যাদির প্রসঙ্গ তুললাম তখন একটা সাধারণ দর্শকের মনে হওয়াটা খুব স্বাভাবিক যে একি, এটা বলছে কেন। সেটা হয়তো কিছুটা কোনও ইন্টারভিউ বা আগামীতে যখন হবে তখন হয়তো এই কথাগুলির মধ্যে দিয়ে সেই স্টান্সটা স্পষ্ট হবে।"
পরমব্রতর বিরুদ্ধে এফআইআর (FIR)
বৃহস্পতিবার পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় ও স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে গড়িয়াহাট থানায় অভিযোগ দায়ের করেন জয়দীপ সেন নামে এক আইনজীবী। তাঁর দাবি, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের দিন সোশ্যাল মিডিয়ায় ওই দু'জন যে মন্তব্য করেছিলেন, তা আসলে নির্বাচন পরবর্তী সন্ত্রাসে মদত দেওয়া ছা়ড়া আর কিছু নয়। অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ২০২১ সালের ২ মে বিকেল প্রায় ৪টে নাগাদ পরমব্রত সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখেন, 'আজ বিশ্ব রগড়ানি দিবস ঘোষিত হোক।' এর কিছুক্ষণ পর স্বস্তিকা সেই পোস্টের উত্তরে লেখেন, 'হা হা হা হোক হোকস'। অভিযোগকারীর দাবি, নির্বাচনের ফল ঘোষণার মতো উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে এই ধরনের মন্তব্য প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের তরফে হিংসা উস্কে দেওয়ার সামিল।
রুদ্র- পরমের একসঙ্গে কাজ
রুদ্রনীল ও পরমব্রত 'আড়ি- আড়ি- ভাব- ভাব' সম্পর্কের কথা টলিউড ইন্ডাস্ট্রির প্রায় সকলেরই জানা। বিভিন্ন সময় তাঁদের মনোমালিন্য 'ওপেন সিক্রেট'। এক সময় দারুণ বন্ধুত্ব, তারপর বিস্তর দূরত্ব আবার সব ঠিকথাক। এরকম প্রায়ই চলতেই থেকেছে। একসঙ্গে 'কালের রাখাল', 'হাওয়া বদল', 'চলো লেটস গো', 'দুর্গ রহস্য', 'সাবাস ফেলুদা' ছবিতে কাজ করেছেন দু'জনে। খুব শীঘ্রই 'হাওয়া বদল ২'-র কাজ শুরু হওয়ার কথা আছে।