
তীব্র দাবদাহে সকলের একেবারে নাজেহাল অবস্থা। শুক্রবার সকাল থেকে বৃষ্টিস্নাত কলকাতা। বৃষ্টিমুখর দিনে হঠাৎ সরগরম টালিগঞ্জ স্টুডিওপাড়া। এদিনই মুক্তি পেয়েছে যিশু সেনগুপ্ত ও সৌরভ দাস প্রযোজিত প্রথম ছবি 'অভিমান'। আর মুক্তির দিনই ছবির মুখ্য অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ছবির 'ভাবনা এবং চরিত্র চুরি'র অভিযোগ আনলেন সুমন ঘোষ। সোশ্যাল মিডিয়ায় বিস্ফোরক অভিযোগ তুললেন পরিচালক। অভিযোগের পাল্টা সাফাই দিলেন প্রসেনজিৎ। নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করলেন যিশু, সৌরভও।
ছবির গল্প, চিত্রনাট্য চুরির অভিযোগ অনেক সময়ই শোনা যায়। এনিয়ে প্রচুর ঠান্ডা লড়াই, মান- অভিমান, বাগবিতণ্ডা চলে শিল্পীদের মধ্যে। ১৯ জুন মুক্তি পেয়েছে ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত পরিচালিত ছবি 'অভিমান'। আর এদিনই, এই ছবিতে প্রসেনজিতের চরিত্র নিয়ে একগুচ্ছ ক্ষোভ উগড়ে দিলেন 'কাবুলিওয়ালা' পরিচালক। তিনি অভিযোগ তুলেছেন, এই ছবিতে প্রসেনজিতের চরিত্রটির মতো একটি চরিত্র নাকি নিজের ছবির জন্য রেখেছিলেন তিনি। আর এই চরিত্রে প্রসেনজিতকেই ভেবে, তাঁর সঙ্গে কথাবার্তা এগিয়েছিলেন। এমনকী, সুমনের ছবি নাকি প্রযোজনার কথা প্রসেনজিতের প্রযোজনা সংস্থার। সদ্য পদ্মশ্রীপ্রাপ্ত অভিনেতার 'পেশাগত নীতি এবং দায়বদ্ধতা' নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সুমন।
পরিচালক জানান, গত প্রায় আড়াই বছর ধরে যে চিত্রনাট্য নিয়ে তিনি প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে আলোচনা করেছেন, তার অনেকটাই সাদৃশ্য রয়েছে 'অভিমান-র টিজার ও ট্রেলারের সঙ্গে। গত ১৭ জুন নাকি প্রসেনজিতকে এই নিয়ে একটি ই-মেইলও করেছেন পরিচালক। সোশ্যাল মিডিয়ায় সেই মেইলের অংশ তুলে ধরেন তিনি। সুমন লিখেছেন, "এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক এবং বেদনাদায়ক যে, সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া তোমার 'অভিমান' ছবির টিজার এবং ট্রেলারে প্রায় হুবহু একই রকম চরিত্রায়ণ, একই রকম দৃশ্য এবং উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে: ১. তোমার দুটি লুক—একটি সুপারস্টার, অন্যটি জরাগ্রস্ত। ২. সেই সুপারস্টারের হঠাৎ করে উধাও হয়ে যাওয়া। ৩. উধাও পরবর্তী এক ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়িতে থাকা। ৪. মস্তিষ্ক জনিত অসুখে হুইলচেয়ারে বসা দৃশ্যগুলো। ৫. নিজের (কম বয়সের) ছবি ভেঙে ফেলা। ৬. একজন বিশ্বস্ত ম্যানেজার (আমিও এই চরিত্রের জন্য কাঞ্চনকে ভেবেছিলাম তুমি জানতে)।"
তিনি আরও লেখেন, "আমার প্রশ্নটা কোনো আইনি লড়াই বা কপিরাইটের অধিকারের নয়; আমার প্রশ্নটা শিল্পের আদিম সততা নিয়ে, বিশ্বাস এবং নৈতিকতা নিয়ে। একজন লেখক বা পরিচালক যখন আড়াই বছর ধরে তাঁর স্বপ্ন এবং নিষ্ঠা কোনো অভিনেতার সামনে উজাড় করে দেন, তখন সেই বিশ্বাসের মর্যাদা কি এতটাই ঠুনকো? প্রতিষ্ঠিত নাম এবং ক্ষমতার জোরে একজন স্বাধীন পরিচালকের আইডিয়া বা ক্যারেক্টারাইজেশনকে এভাবে কি নিঃশব্দে আত্মসাৎ করে নেওয়া যায়? যদি ইন্ডাস্ট্রিতে দীর্ঘ সময় ধরে থাকা একজন মানুষের সাথে এমন আচরণ হতে পারে, তবে নতুন যে ছেলেমেয়েরা শুধুমাত্র গল্প বলার স্বপ্ন নিয়ে এই ইন্ডাস্ট্রিতে পা রাখছে, তারা কি আর প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জীদের ওপর ভরসা রাখতে পারবে? আমি বছরে বড়জোর একটা ছবি বানাই এবং তাতে আমার পুরো সত্ত্বা ঢেলে দিই। কিন্তু যারা নতুন কাজ করতে আসছে, চোখে শিল্পের, সাধনার ও উৎসাহের নতুন চশমা নিয়ে, তাদের কী হবে? আশা রাখবো তাদের সাথে যেন আগামী দিনে এমন আচরণ না হয়; কোনো শিল্পীর নিষ্ঠা ও ডেডিকেশনকে যেন এভাবে অবহেলা না করা হয়। শিল্প টিকে থাকে সততায়, ক্ষমতার দম্ভে নয়। তোমার পদ্মশ্রীর যথার্থ মর্যাদা যেন অক্ষুণ্ন থাকে। তোমার নতুন ছবির জন্য শুভকামনা রইল। হোক না তা অনৈতিকতার ওপর দাঁড়িয়ে।"
সুমনের এই পোস্ট নিয়ে চর্চা শুরু হতেই প্রসেনজিৎ একটি পোস্ট করেন তাঁর সোশ্যাল পেজে। তিনি লেখেন, "চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে সুমনের প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে। আমাদের এই শিল্প ক্ষেত্রে সৃজনশীল কাজের ক্ষেত্রে অনেক সময় একে অপরের সঙ্গে মিল বা সাদৃশ্য দেখা দিতেই পারে, কারণ আমরা সবাই মূলত মানুষের সর্বজনীন আবেগ ও বিষয়বস্তু থেকেই অনুপ্রেরণা নিই। তবে ‘অভিমান’ ছবিটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এবং আইনত নিবদ্ধ একটি প্রজেক্ট, যা আমাদের পরিচালক ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত এবং লেখক শ্রীজাতর সৃষ্টি। একজন অভিনেতা হিসেবে আমার কাজ হল—আমার হাতে আসা চিত্রনাট্যটিকে প্রাণবন্ত করে তোলা। কারও সৃজনশীল বিশ্বাসের অমর্যাদা করার কোনও উদ্দেশ্যই আমার ছিল না; সুমনের জন্য আমার অনেক অনেক শুভ কামনা রইল।"
অন্যদিকে 'অভিমান' ছবির প্রযোজক যিশু ও সৌরভ আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়ে জানান, "অভিমান-এর প্রযোজক হিসেবে, আমাদের পুরো সৃজনশীল টিমের সততা, মৌলিকতা এবং নিষ্ঠা নিয়ে আমরা অত্যন্ত গর্বিত। ছবিটির মূল ভাবনা ছিল যিশু সেনগুপ্তর। অন্যদিকে, চিত্রনাট্য ও সংলাপ স্বাধীনভাবে লিখেছেন শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং পরিচালক ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত। একটি সুশৃঙ্খল সৃজনশীল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এই প্রজেক্টটি গড়ে উঠেছে এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত রেজিস্ট্রেশন, রেকর্ড ও জিনিসপত্র যথাযথ আইনি ও শিল্প-সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সম্পন্ন করা হয়েছে। আমরা সকল চলচ্চিত্র নির্মাতার কাজ ও সৃজনশীল যাত্রার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া সত্ত্বেও দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করছি যে, 'অভিমান' একটি মৌলিক সৃষ্টি যা এর লেখক ও নির্মাতারা স্বাধীনভাবে তৈরি করেছেন। আমরা আমাদের চিত্রনাট্যের মৌলিকতা এবং এই ছবির সঙ্গে যুক্ত সকলের পেশাদারী সততার বিষয়ে দৃঢ় অবস্থানে রয়েছি। আমরা বিশ্বাস করি যে, শেষ পর্যন্ত শিল্পকর্মের মূল্যায়ন হওয়া উচিত তার নিজস্ব গুণমানের ভিত্তিতেই। আজ প্রেক্ষাগৃহে 'অভিমান' দর্শকদের সামনে আসছে; তাই আমরা দর্শক, গণমাধ্যমকর্মী এবং চলচ্চিত্র শিল্পের সকল সদস্যকে ছবিটি দেখার এবং নিজেরাই এর বিচার করার আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।"
প্রসঙ্গত, 'অভিমান' ছবিতে মুখ্য চরিত্রে রয়েছেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায় ও যিশু। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় দেখা যাবে কাঞ্চন মল্লিক, অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায়,অরিজিতা মুখোপাধ্যায়কে। 'অভিমান' ছবিতে একেবারে অন্যরকম লুকে ধরা দিয়েছেন প্রসেনজিৎ। রকস্টারের ভূমিকায় দেখা যাবে তাঁকে। এই ছবিতে প্রসেনজিতের অভিনীত চরিত্রের নাম আকাশ চট্টোপাধ্যায়। আকাশ একজন রকস্টার। ফলস্বরূপ, ফ্লোরে যাওয়ার আগে, নিজের লুক, শরীরী ভাষা, এনার্জি লেভেলের উপর কাজ করেছেন অভিনেতা। বিচ্ছেদের যন্ত্রণা ও সেই সঙ্গে অবসাদ গ্রাস করে আকাশকে। ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় তার কেরিয়ার। গল্পে আকাশের অ্যালজাইমার ধরা পড়ে। এরপর একদিন নিরুদ্দেশ হয়ে যায় সে...। কখনও তাঁকে দেখা যায় সাফল্যের শীর্ষে তো কখনও ফুটে ওঠে একাকীত্বের ছবি।