
শিরোনামে স্টুডিওপাড়া। টলিউডের জট যেন কাটছিলই না। ফেডারেশন বনাম ছোট পর্দার প্রযোজকদের দ্বন্দ্ব, টেকনিশিয়নদের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগ, বকেয়া পারিশ্রমিক, কলাকুশলীদের অতিরিক্ত সময় কাজ করানো থেকে থ্রেট বা ব্যান কালচার ইত্যাদি নানা সমস্যা নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে বারবার উত্তপ্ত হয় টলিপাড়া। ইন্ডাস্ট্রির হাল ফেরাতে নতুন উদ্যোগ নিল রাজ্যের তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রক। তৈরি হল উপদেষ্টামণ্ডলী। যেখানে রয়েছেন ১৯ জন সদস্য।
কারা থাকছেন?
গত ৮ জুন নবান্নে রাজ্যের তথ্যসংস্কৃতি দফতরের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়। সেখানে বাংলা ছবি ও টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রির চলতি নানা সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়। সেই বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্তই আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে প্রকাশ্যে আসে বুধবার। এরাজ্যের সিনেমা ও টেলিভিশন শিল্পের সার্বিক উন্নতির লক্ষ্যে যে উপদেষ্টামণ্ডলী তৈরি হচ্ছে, সেখানে রয়েছে রূপা গঙ্গোপাধ্যায়, পাপিয়া অধিকারী, রুদ্রনীল ঘোষ, হিরণ চট্টোপাধ্যায়, প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, দীপক অধিকারী (দেব), যিশু সেনগুপ্ত, প্রযোজক মহেন্দ্র সোনি, পরিচালক ও প্রযোজক সানি ঘোষ রায়, প্রবীণ প্রোডাকশন ম্যানেজার জয়ন্ত কুন্ডু, পরিচালক কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়, পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়, টেলিভিশন পরিচালক অমিত দাস, অভিনেতা তন্ময় দে, তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের সচিব সৌমিত্র মোহন, চলচ্চিত্র অধিকর্তা কৃত্তিবাস নায়ক, নন্দনের সিইও শর্মিষ্ঠা বন্দ্যোপাধ্যায়, মুখ্যমন্ত্রীর দফতরের অতিরিক্ত সচিব শান্তনু বসুদের নাম।
ফেডারেশন ও গিল্ড
এই বিবৃতিতে টলিউডের ভবিষ্যৎ বদলের একাধিক তাৎপর্যপূর্ণ ইঙ্গিত। জানানো হয়, ফেডারেশন ও গিল্ডগুলোর বর্তমান কাঠামো বহাল থাকতে পারে, যতক্ষণ না আইনসম্মত পদক্ষেপ ও সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সেগুলোতে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। সেই সঙ্গে উল্লেখ আছে, এই ফেডারেশন এবং গিল্ডগুলো আসলে ১৯২৬ সালের ট্রেড ইউনিয়ন আইন মেনে নথিভুক্ত। তাই গায়ের জোরে নয়, ভবিষ্যতের যেকোনও পরিবর্তন আসতে হবে সম্পূর্ণ আইনসম্মত উপায়ে এবং সরকারি নিয়ম মেনে। নতুন নির্বাহী কমিটি গঠিত হওয়ার আগে পর্যন্ত বর্তমান পরিকাঠামোই বহাল থাকবে। তবে এর আইনি অবস্থান স্পষ্ট করতে ট্রেড ইউনিয়নের রেজিস্ট্রারের কাছ থেকে একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ রিপোর্ট তলব করা হয়েছে, যা পরবর্তীতে বিধায়কদের হাতে তুলে দেওয়া হবে।
একই কমিটিতে দেব এবং হিরণের
নতুন কমিটিতে একই সঙ্গে নাম রয়েছে দেব ও হিরণের। এই দুই অভিনেতার অন্তর্দ্বন্দ্ব কারও আর অজানা নয়। বারবার প্রকাশ্যে এসেছে তাঁদের নিজেদের সমস্যা। লোকসভা নির্বাচনে ঘাটাল কেন্দ্র থেকে দাঁড়িয়েছিলেন হিরণও। কিন্তু দেবের কাছে পরাজিত হন তিনি। বিভিন্ন সময় দেবের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছিলেন হিরণ। দেবও জবাব দিতে ছাড়েনন। এবার দেখার টলিউডের ভবিষ্যতের স্বার্থে অভিনেতা- বিধায়ক হিরণ এবং অভিনেতা- সাংসদ দেব হাত মেলান কিনা।
পাপিয়া অধিকারীর কনফেডারেশন
সিনেপাড়ায় সুস্থ কাজের পরিবেশ গড়তে, এর আগে টেকনিসিয়ান্স স্টুডিওতে বৈঠক ডেকে টালিগঞ্জের নবনির্বাচিত বিধায়ক পাপিয়া অধিকারী জানিয়েছিলেন, টলিউডের কর্মপরিসরে প্রভাব বিস্তার করে আসা ফেডারেশন অব সিনে টেকনিশিয়ান্স অ্যান্ড ওয়ার্কার্স অফ ইস্টার্ন ইন্ডিয়া (Federation of Cine Technicians and Workers of Eastern India/ FCTWEI)-র পুরনো কাঠামো ভেঙে বাংলা সিনে শিল্প এগোতে চলেছে নতুন পরিচয়ে- ইস্টার্ন ইন্ডিয়া মোশন পিকচার্স অ্যান্ড কালচারাল কনফেডারেশন (Eastern India Motion Pictures & Cultural Confederation/EIMPCC)-র হাত ধরে।
নতুন কনফেডারেশন তৈরির পাশাপাশি, টালিগঞ্জের এদিনের বৈঠকে ঘোষণা হয়েছিল, এতদিন ফেডারেশনের আওতায় থাকা ২৬ গিল্ডের বর্তমান কাঠামো আর বজায় থাকবে না। পরিবর্তে পরিচালক, সিনেমাটোগ্রাফার, প্রোডাকশন ম্যানেজার এবং কস্টিউম বিভাগের মতো কয়েকটি মূল স্তম্ভকে কেন্দ্র করে নতুন কর্মপদ্ধতি গড়ে তোলা হবে। এই বিভাগগুলির সঙ্গে সমন্বয় রেখে অন্যান্য শিল্পী ও কলাকুশলীদের কাজের সুযোগ তৈরি হবে বলে জানানো হয়। বাংলা বিনোদন জগতকে আরও সুসংগঠিত, স্বচ্ছ এবং কর্মমুখী করে তুলতেই সরকারের এই উদ্যোগ বলে জানান টালিগঞ্জের বিধায়ক। তবে এই ঘোষণা হওয়ার পরে, নানা রকমের বিভ্রান্তি তৈরি হয়। অবশেষে রাজ্য সরকারের দেওয়া নতুন বিবৃতি থেকে অনেকটা স্পষ্ট হয় সব কিছু।
প্রসঙ্গত, রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছু বদলেছে। টলিপাড়ায় বদল হতে শুরু করেছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, আগেই টলিউডের নানাবিধ সমস্যা সমাধানের দায়িত্বভার দিয়েছিলেন রূপা গঙ্গোপাধ্যায়, রুদ্রনীল ঘোষ, পাপিয়া অধিকারী ও হিরণ চট্টোপাধ্যায়ের উপর। টলিউডের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন 'বিশ্বাস ব্রাদার্স' অরূপ এবং স্বরূপ বিশ্বাস। রূপা, রুদ্রনীল, পাপিয়ারা আশ্বাস দিয়েছেন ব্যান কালচার, ফেডারেশনের 'দাদাগিরি' সব বন্ধ হবে, শিল্পী- কলাকুশলীরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন এবং বাকি সব সমস্যা সমাধান।