
Amaira Jaipur School Case CCTV Footage: গত বছরের নভেম্বর মাসে জয়পুরের বিখ্যাত নীরজা মোদী স্কুলের চারতলা থেকে ঝাঁপ দিয়ে মৃত্যু হয়েছিল চতুর্থ শ্রেণীর নয় বছরের ছাত্রী আমাইরার, সেই মর্মান্তিক ঘটনার পর কেটে গিয়েছে বেশ কিছুটা সময়, এবার মৃত ছাত্রীর মা বাবা নতুন একটি সিসিটিভি ফুটেজ জনসমক্ষে এনেছেন যা ঘিরে গোটা দেশজুড়ে নতুন করে তোলপাড় শুরু হয়েছে। এই নতুন ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে কীভাবে ক্লাসরুমের ভেতরে সহপাঠীদের দ্বারা লাগাতার বুলিং বা হেনস্থার শিকার হতে হয়েছিল ছোট্ট আমাইরাকে, অথচ বারবার শিক্ষিকার কাছে গিয়েও সে কোনও সাহায্য পায়নি।
আমাইরার পরিবারের পক্ষ থেকে এই ঘটনায় পুলিশের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয়তার মারাত্মক অভিযোগ তোলা হয়েছে, তারা দাবি করেছেন যে অভিযুক্ত শ্রেণী শিক্ষিকার পাশাপাশি স্কুলের প্রিন্সিপাল এবং চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধেও জুভেনাইল জাস্টিস অ্যাক্ট বা জেজে আইনের আরও কঠোর ধারা প্রয়োগ করতে হবে। গত বছরের পয়লা নভেম্বর স্কুলের চারতলার রেলিং থেকে প্রায় আটচল্লিশ ফুট নীচে ঝাঁপ দিয়েছিল আমাইরা। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে দ্রুত কাছের একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।মেয়ের মৃত্যুর পর থেকেই মা বাবা অভিযোগ করে আসছিলেন যে লাগাতার মানসিক নির্যাতন এবং স্কুলের অসহযোগিতাই আমাইরাকে এই চরম পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করেছিল।
নতুন সিসিটিভি ফুটেজে আমাইরার মৃত্যুর ঠিক আগের মুহূর্তের ক্লাসরুমের ভেতরের সম্পূর্ণ দৃশ্য ধরা পড়েছে যেখানে মৃত ছাত্রীর পরিবার একটি ভয়েস ওভার বা বিবৃতি অ্যাড করেছে। ভিডিওর শুরুতে দেখা যাচ্ছে আমাইরা অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই ক্লাসরুমে প্রবেশ করে নিজের এক বন্ধুর সঙ্গে কুশল বিনিময় করছে এবং পরে অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে একটি নাচের অনুষ্ঠানেও অংশ নিচ্ছে। কিন্তু পরিস্থিতি বদলে যায় যখন ক্লাসরুমের ভেতরে কয়েকজন পড়ুয়া একটি ডিজিটাল স্লেট বা ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিয়ে আসে। ভয়েস ওভারে দাবি করা হয়েছে যে বেশ কিছু পড়ুয়া বারবার সেই স্লেটটি আমাইরার মুখের সামনে তুলে ধরছিল।
ডিজিটাল স্লেটটি দেখার পর থেকেই আমাইরার শারীরিক ভাষা এবং আচরণের মধ্যে এক অদ্ভুত পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। সহপাঠীদের অনবরত বিরক্তিকর আচরণের সামনে সে অত্যন্ত অস্বস্তি, মানসিক চাপ এবং লজ্জার মধ্যে পড়ে যায়। নিজেকে বাঁচাতে আমাইরা বারবার শ্রেণী শিক্ষিকা পুনীতা শর্মার কাছে ছুটে যায় এবং তাকে পুরো বিষয়টি বুঝিয়ে বলার আপ্রাণ চেষ্টা করে। কিন্তু সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যাচ্ছে যে শিক্ষিকা তার কথা আড়ালে বা গুরুত্ব দিয়ে শোনার বদলে অন্য পড়ুয়াদের কথায় কান দিচ্ছিলেন। যারা শিক্ষিকার কাছে গিয়ে আমাইরার বিরুদ্ধেই নানা কথা বলছিল।
সহপাঠীদের কথা শুনে শিক্ষিকা উল্টে আমাইরাকে অত্যন্ত কড়া এবং হুমকিসুলভ গলায় বকাঝকা করেন যা দেখে আমাইরার মানসিক উদ্বেগ ও ভয় বহুগুণ বেড়ে যায়। ফুটেজে দেখা গিয়েছে অসহায় আমাইরা হাত জোড় করে শিক্ষিকাকে নিজের অবস্থান বোঝানোর চেষ্টা করছে। ভয়ে ও আতঙ্কে নিজের মুখ এবং মাথা চেপে ধরছে। কিন্তু কোনও সহমর্মিতা না পেয়ে চরম অপমানের হাত থেকে বাঁচতে এবং শিক্ষিকার শাস্তির ভয় থেকে পালাতে সে আচমকাই ক্লাসরুম থেকে এক দৌড়ে বেরিয়ে যায়। ক্লাসরুমটি গ্রাউন্ড ফ্লোরে বা ভূতলে হওয়া সত্ত্বেও আমাইরা যখন একাই দৌড়ে চারতলায় চলে গেল, তখন কোনও শিক্ষক বা কর্মী তাকে আটকানোর চেষ্টা করেননি।
এই নতুন ফুটেজ সামনে আসার পর আমাইরার মা শিবানি এবং বাবা বিজয় ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন, শিবানির অভিযোগ যে তাদের বারবার করা ফোন পুলিশ তুলছে না এবং ইতিমধ্যেই তদন্তকারী অফিসার তিনবার বদলে ফেলা হয়েছে। তিনি সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে স্কুলের প্রিন্সিপাল ইন্দু দুবেকে আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কারণ তিনি স্কুলের ন্যূনতম নজরদারি এবং সিসিটিভি মনিটরিং ব্যবস্থা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। যদি আমাইরা সেদিনের অপমান সয়ে কোনওভাবে বাড়ি ফিরতে পারত তবে হয়তো তাকে বোঝানো যেত, কিন্তু শিক্ষিকার হুমকির মুখে পড়ে সে স্কুল চত্বরেই চরম পথ বেছে নিতে বাধ্য হলো।
ইতিমধ্যেই পুলিশ ভারতীয় ন্যায় সংহিতা বা বিএনএস এর ফৌজদারি গাফিলতির ধারায় স্কুলের মালিক সৌরভ মোদী, প্রিন্সিপাল ইন্দু দুবে এবং শ্রেণী শিক্ষিকা পুনীতা শর্মার বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেছে, অন্যদিকে সেন্ট্রাল বোর্ড অফ সেকেন্ডারি এডুকেশন বা সিবিএসই এই ঘটনার পর নীরজা মোদী স্কুলকে কড়া শোকজ নোটিশ পাঠিয়েছে। সিবিএসইর পরিদর্শক দল তদন্তে নেমে জানতে পেরেছে যে পাঁচ হাজারেরও বেশি পড়ুয়া থাকা সত্ত্বেও স্কুলে কোনও বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা কমিটি বা সিসিটিভি নজরদারির নির্দিষ্ট ব্যবস্থা ছিল না, এমনকী চারতলার বারান্দায় কোনও সুরক্ষা নেট বা সুরক্ষিত রেলিং ছিল না।
সিবিএসইর রিপোর্টে আরও একটি মারাত্মক তথ্য উঠে এসেছে যে ঘটনার পর ফরেনসিক দল পৌঁছানোর আগেই আমাইরা যেখানে পড়ে গিয়েছিল, সেই জায়গাটি জল দিয়ে ধুয়ে ফেলা হয়েছিল। তাছাড়া স্কুলের শিক্ষক ও কর্মীদের গলায় বাধ্যতামূলক পরিচয়পত্রও ছিল না, মৃত ছাত্রীর মা বাবার অভিযোগ যে গত আঠারো মাস ধরে আমাইরা স্কুলে লাগাতার বুলিং এর শিকার হচ্ছিল। কিন্তু স্কুলের অ্যান্টি বুলিং কমিটি বা কাউন্সেলিং দল কোনও পদক্ষেপই করেনি। প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ সত্ত্বেও মেয়ের ন্যায়বিচারের জন্য শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছেন আমাইরার বাবা।