
সেমিকন্ডাক্টর শিল্প নিয়ে বিরাট প্ল্যান। এবার ভারতে অন্তত পাঁচটি বড় সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং সংস্থা, তিনটি বড় ম্যাটেরিয়াল কোম্পানি এবং উন্নত প্রযুক্তির প্যাকেজিং কারখানা তৈরি করতে চাইছে কেন্দ্র। এর মাধ্যমেই এক লক্ষেরও বেশি কাজ তৈরির টার্গেট রয়েছে। ভারতকে বিশ্বের অন্যতম বড় চিপ উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতেই এমন প্ল্যানিং করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব।
বিষয়টা নিয়ে ইন্ডিয়া টুডেকে একান্ত সাক্ষাৎকারে দিয়েছেন বৈষ্ণব। সেখানে তিনি জানান, সরকারের লক্ষ্য এখন শুধু সেমিকন্ডাক্টর তৈরির কারখানা বা ফ্যাব্রিকেশন ইউনিট তৈরি করা নয়। চিপ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, প্যাকেজিং, চিপ ডিজাইন এবং দক্ষ কর্মী তৈরি, সবকিছুকে নিয়ে একটি একটা বড়সড় পরিকাঠামো তৈরি করার চেষ্টা চলছে।
স্বপ্ন এখন বাস্তবের পথে
ভারতে সেমিকন্ডাক্টর শিল্প গড়ে তোলার প্ল্যানিং ছিলই। আর সেই পরিকল্পনাই এবার বাস্তবায়নের পথে। বৈষ্ণব জানান, ২০২১ সালে শুরু কেন্দ্র নতুন করে সেমিকন্ডাক্টর কর্মসূচি নেয়। এটা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। এর লক্ষ্য শুধু একটি-দু’টি কারখানা তৈরি করা নয়, বরং গোটা ইকোসিস্টেম তৈরি করা।
বৈষ্ণব বলেন, 'আমরা যখন এই যাত্রা শুরু করি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আমাদের বলেছিলেন, কোনও কিছুকেই গ্রান্টেড বলে ধরে নেওয়া যাবে।' সেই কারণে মোটামুটি ২০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি প্ল্যানিং করা হয়েছে।
এরপর সরকার গোটা সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো খতিয়ে দেখে। চিপ তৈরিতে প্রয়োজনীয় শত শত ধরনের রাসায়নিক ও গ্যাস, যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারী সংস্থা এবং অন্যান্য সরবরাহকারীদেরও এই পরিকল্পনার আওতায় আনা হয়।
বৈষ্ণব বলেন, 'আমরা খুব পরিকল্পনামাফিক কাজ করেছি।'
7nm, 3nm চিপ তৈরির টার্গেট
বর্তমানে ভারতে 40nm প্রযুক্তি পর্যন্ত সেমিকন্ডাক্টর তৈরির সক্ষমতা রয়েছে। তবে আগামী আট বছরের মধ্যে 7nm এবং 3nm-এর মতো আরও উন্নত প্রযুক্তির সেমিকন্ডাক্টর তৈরির টার্গেট নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
বৈষ্ণব স্বীকার করে নেন, এই ধরনের উন্নত প্রযুক্তি নিয়ে কাজ কর খুব সহজ কাজ নয়। যে দেশগুলি ইতিমধ্যেই এই প্রযুক্তিতে এগিয়ে রয়েছে, তাদেরও সেমিকন্ডাক্টর শিল্প গড়ে তুলতে কয়েক দশক সময় লেগেছে।
তবে গত চার বছরে ভারত যেভাবে এগিয়েছে, তাতে তিনি আশাবাদী। তাঁর মতে, এই গতিতে এগোতে পারলে ভারত আগামিদিনে আরও উন্নত প্রযুক্তির চিপ তৈরির দিকে এগোতে পারবে।
তবে মন্ত্রী একই সঙ্গে স্পষ্ট করে দিয়েছেন, সেমিকন্ডাক্টর তৈরি অত্যন্ত জটিল একটি শিল্প। এখানে সামান্য ভুলেরও সুযোগ নেই।
শুধু চিপের কারখানা নয়, গোটা ইকোসিস্টেমেই নজর
বৈষ্ণব জানান, সরকার শুরু থেকেই শুধু চিপ তৈরির কারখানা বসানোর দিকে নজর দেয়নি। কারণ সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের জন্য বিশেষ ধরনের রাসায়নিক, গ্যাস, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য উপকরণ প্রয়োজন। এর পাশাপাশি দরকার চিপ ডিজাইনের দক্ষতা, উন্নত প্যাকেজিং ব্যবস্থা এবং বিপুল সংখ্যক প্রশিক্ষিত ইঞ্জিনিয়ার।
বৈষ্ণব জানান, ইতিমধ্যেই ভারতে প্রায় ৮৫,০০০ সেমিকন্ডাক্টর ইঞ্জিনিয়ারকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গেও সরকার কাজ করছে। বর্তমানে টার্গেট হল, সেমিকন্ডাক্টর নিয়ে পড়াশোনার সুযোগ বাড়ানো ও পড়ুয়াদের শিল্পক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতা দেওয়া।
বাড়ছে সেমিকন্ডাক্টর স্টার্টআপ
দেশে সেমিকন্ডাক্টর এবং ডিপ-টেক স্টার্টআপের সংখ্যাও বাড়ছে বলে জানান বৈষ্ণব। তাঁর দাবি, প্রথমে সরকারের ধারণা ছিল, এই ধরনের স্টার্টআপে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল সংস্থাগুলির আগ্রহ খুব বেশি থাকবে না। কারণ এই শিল্পে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়। বিশেষজ্ঞ কর্মীর প্রয়োজন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার।
কিন্তু বাস্তবে ছবিটা অন্যরকম হয়েছে। বৈষ্ণবের দাবি, এখনও পর্যন্ত প্রায় ৩০টি ভেঞ্চার ক্যাপিটাল সংস্থা এবং ২০৫টি স্টার্টআপ এই ক্ষেত্রে আগ্রহ দেখিয়েছে।
ইন্ডিয়া ডিপ টেক অ্যালায়েন্স-ও তাদের নেটওয়ার্ক বাড়াচ্ছে। আরও অনেক সংস্থা এই উদ্যোগে যোগ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করছে বলে জানান তিনি।
এক লক্ষেরও বেশি চাকরি
সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে ভারত। এই শিল্পে চাকরির জায়গা তৈরি করতে চাইছে।
বৈষ্ণব জানান, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প আরও বড় পরিসরে ইলেকট্রনিক্স উৎপাদনের পথ খুলে দিতে পারে। কারণ, গাড়ি, মোবাইল ফোন, টেলিভিশন থেকে শুরু করে ট্রেন, প্লেন প্রায় সব ক্ষেত্রেই চিপের প্রয়োজন হয়।
তাঁর দাবি, ভারতে তৈরি হতে চলা সেমিকন্ডাক্টর ইকোসিস্টেম থেকে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে এক লক্ষেরও বেশি কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে।