
বিজেপিতে বড়সড় 'রিসাফেল'। একদিকে দলের গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক পদ থেকে অমিত মালব্যের সরে যাওয়া। অন্যদিকে বিজেপির সর্বভারতীয় মুখপাত্র শেহজ়াদ পুণাওয়ালার দলত্যাগ। আর এই সবেরই মধ্যে মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়ণবীশের দিল্লি-রাজনীতিতে যাওয়া নিয়ে জল্পনা। সব মিলিয়ে বিজেপির অন্যতম পুরনো, পরিচিত মুখগুলির স্থান বদল ঘিরে জাতীয় রাজনীতিতে জল্পনা তুঙ্গে।
তবে এই ঘটনাগুলিকে কি এখনই এক সুতোয় বাঁধা সম্ভব? সেই প্রশ্নই ভাবাচ্ছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। তবে এই অল্প সময়ের ব্যবধানেই একের পর এক পরিবর্তন যে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ, তা বলাই বাহুল্য।
ফড়ণবীশ কি দিল্লি যাচ্ছেন?
সোমবার দিল্লিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে বৈঠক করেন মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়ণবীশ। স্বাভাবিকভাবেই জল্পনা তুঙ্গে ওঠে। মহারাষ্ট্র ছেড়ে কি দিল্লির রাজনীতিতে যাচ্ছেন?
ফড়ণবীশ অবশ্য সাফ জানিয়েছেন, আপাতত এমন কোনও পরিকল্পনা নেই। তাঁর কথায়, তিনি মহারাষ্ট্রের দায়িত্বেই থাকছেন এবং রাজ্যের মানুষের জন্য কাজ করে যাবেন। দিল্লি সফরের কারণ হিসাবেও তিনি জানিয়েছেন, মহারাষ্ট্রের পরিকাঠামো এবং উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে কেন্দ্রের সঙ্গে আলোচনা করতেই তাঁর এই সফর।
অর্থাৎ, বৈঠকের সাবজেক্ট উন্নয়ন। কিন্তু তারপরও জল্পনা তুঙ্গে রাজনৈতিক মহলে।
জুলাই থেকেই জল্পনা শুরু
ফড়ণবীশের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় আনার সম্ভাবনা অবশ্য নতুন নয়। জুলাই মাস থেকেই এই জল্পনা চলছে। এমনকি কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ কোনও দায়িত্বে তাঁকে দেখা যেতে পারে, এমনটাও শোনা যাচ্ছিল।
ফলে সোমবার বিজেপির নতুন জাতীয় টিম ঘোষণার দিনই ফড়ণবীশের দিল্লি সফর এবং মোদীর সঙ্গে বৈঠক রাজনৈতিক মহলের নজর কেড়েছে। তবে মুখ্যমন্ত্রীর নিজের বক্তব্য আপাতত সেই জল্পনায় জল ঢেলেছে।
অমিত মালব্যের জায়গায় নতুন মুখ
দলের দীর্ঘদিনের আইটি এবং ডিজিটাল প্রচারের অন্যতম পরিচিত মুখ অমিত মালব্যকে নতুন জাতীয় টিমে আগের দায়িত্বে রাখা হয়নি। তাঁর জায়গায় বিজেপির আইটি সেলের দায়িত্বে এসেছেন দীপক মাসকে।
এটি নিছক পদবদল, নাকি বিজেপির ডিজিটাল স্ট্র্যাটেজিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত; সেটাই এখন দেখার। কারণ গত কয়েক বছরে ভোটের প্রচারে বিজেপির অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার ছিল সোশ্যাল মিডিয়া। সেই জায়গায় নতুন মুখ আনা মানে দলের প্রচারকৌশল, ডেটা ব্যবহারের ধরন এবং ডিজিটাল সংগঠনেও কিছু পরিবর্তন আসতে পারে।
তবে অমিত মালব্যের ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক ভূমিকা নিয়ে এখনও কোনও ঘোষণা করা হয়নি। তাই তিনি সম্পূর্ণভাবে বিজেপির বাইরে চলে গিয়েছেন, এমনটাও ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
পুরনোদের সঙ্গে নতুনদেরও আনা হচ্ছে
বিজেপির নতুন জাতীয় টিমেও একটি বিশেষ প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। একেবারে নতুন মুখের পাশাপাশি অভিজ্ঞ নেতাদেরও সমানভাবে জায়গা দেওয়া হয়েছে। রাম মাধব, বসুন্ধরা রাজে সিন্ধিয়া-সহ পরিচিত পুরনো মুখদের গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ বিজেপি একেবারে পুরনো কাঠামো ভেঙে ফেলছে না; বরং অভিজ্ঞতা এবং নতুন সংগঠনের মধ্যে ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা করছে।
শেষ পর্যন্ত দল ছাড়লেন শেহজ়াদ
এই বদলের আবহেই সোমবার বিজেপি ছাড়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করলেন শেহজ়াদ পুণাওয়ালা। দলের সর্বভারতীয় মুখপাত্রের পদ এবং প্রাথমিক সদস্যপদ ছাড়ার কথা জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, ব্যক্তিগত এবং আর্থিক পরিস্থিতির কারণেই এই সিদ্ধান্ত। গত ৩০ জুলাইও তিনি ইস্তফা দিতে চেয়েছিলেন। তখন বিজেপি নেতৃত্ব তাঁকে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করেছিল। শেষ পর্যন্ত সোমবার ফের ইস্তফা দিয়ে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, এ বার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত।
তাঁর দলত্যাগকে ঘিরে অবশ্য নানা রকম রাজনৈতিক ব্যাখ্যা শোনা যাচ্ছে। কিন্তু পুণাওয়ালা নিজে ব্যক্তিগত ও আর্থিক কারণের কথাই জানিয়েছেন। তাই এর পিছনে অন্য কোনও কারণ রয়েছে বলে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
পরিস্থিতি কোনদিকে এগোচ্ছে?
এই তিন ঘটনাকে পাশাপাশি রাখলে একটিই প্রশ্ন মাথায় আসে। বিজেপির সামনে এখন মূল প্রশ্ন; দলের পরবর্তী পর্বের জন্য কি নতুন করে মুখ এবং দায়িত্ব সাজানো হচ্ছে?
ফড়ণবীশ নিজেই জানাচ্ছেন, আপাতত তিনি মহারাষ্ট্রেই থাকছেন। মালব্যের জায়গায় ডিজিটাল সংগঠনে নতুন মুখ এসেছে। পুণাওয়ালার ক্ষেত্রে একটি পরিচিত জাতীয় মুখ দল ছেড়েছেন। একই সঙ্গে নতুন জাতীয় টিমে অভিজ্ঞ এবং নতুন; দুই ধরনের মুখকেই রাখা হয়েছে।
তাই এটিকে শুধু 'পুরনোদের বিদায়' বলা সম্ভবত অতি সরলীকরণ হয়ে যাবে। বরং বিজেপির সংগঠনে প্রজন্ম, দায়িত্ব এবং কাজের ধরন অনুযায়ী নতুন করে ভারসাম্য তৈরির প্রক্রিয়া চলছে কি না, আগামী কয়েক মাসে তার উত্তর মিলতে পারে। বিশেষ করে সামনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক লড়াই। তাই সংগঠনকে আরও অ্যাকটিভ করে তোলাই এই রদবদলের লক্ষ্য কি না, সেটাই দেখার।