
১৯৯৯ সালে দক্ষিণ দিল্লির বসন্ত বিহারের একটি ভাড়া বাড়ি। বাইরে কোনও নামফলক নেই, কর্মীদের হাতে নিয়োগপত্র নেই, সরকারি গাড়িও নেই। চরম গোপনীয়তার মধ্যে এখান থেকে এভাবেই শুরু হয়েছিল ভারতের ব্রহ্মোস ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প। ২৫ বছর পর সেই ব্রহ্মোসই ভারতের অন্যতম বড় কৌশলগত সম্পদ।
সম্প্রতি 'ডেকান হেরাল্ড'-এর এক প্রতিবেদনে সেই অজানা গল্প সামনে এসেছে। শুরুতে ব্রহ্মোস প্রকল্পে কর্মী নিয়োগের বিজ্ঞাপনও বহুজাতিক সংস্থার নামে প্রকাশ করা হত। নির্বাচিত প্রার্থীরাও যোগদানের আগে জানতেন না, তাঁরা আসলে ভারতের অন্যতম গোপন প্রতিরক্ষা প্রকল্পে কাজ করতে চলেছেন।
অথচ আজ ব্রহ্মোস ভারতের তিন বাহিনীর অন্যতম প্রধান অস্ত্র। অপারেশন সিঁদুরেও এর সাফল্য বিশ্বকে অবাক করেছে। তার জেরে ফিলিপিন্স, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়াসহ একাধিক দেশে ব্রহ্মোস রফতানিও করা হয়।
হার্ভার্ডের ক্লাসরুমে জন্ম ব্রহ্মোসের ভাবনা
ব্রহ্মোসের ধারণার জন্ম কোনও গবেষণাগারে নয়, বরং ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ চলাকালীন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ক্লাসরুমে।
ব্রহ্মোস অ্যারোস্পেসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রাক্তন সিইও ড. এ. শিবথানু পিল্লাই জানান, ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ও 'মিসাইল ম্যান' এপিজে আবদুল কালামই তাঁকে এই প্রকল্পের অনুপ্রেরণা দেন। কালাম বলেছিলেন, 'অগ্নি ক্ষেপণাস্ত্রের ক্ষেত্রে আমরা ষষ্ঠ দেশ, পিএসএলভির ক্ষেত্রে সপ্তম দেশ, পরমাণু পরীক্ষাতেও ষষ্ঠ দেশ। কিন্তু প্রথম কবে হব?'
কালামের পরামর্শে হার্ভার্ডে পড়তে গিয়ে পিল্লাই লক্ষ্য করেন, উপসাগরীয় যুদ্ধে আমেরিকা কীভাবে টমাহক ক্রুজ মিসাইল ব্যবহার করে ইরাকের সামরিক পরিকাঠামো ধ্বংস করছে। তখনই তিনি কালামকে ফোন করে বলেন, 'ভারতেরও একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দরকার।'
রাশিয়ার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ
পরবর্তীতে ভারতের বিজ্ঞানীরা রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সেখানে জানা যায়, রাশিয়ার কাছেই বিশ্বের একমাত্র সুপারসনিক ক্রুজ মিসাইল ইঞ্জিন রয়েছে। শুধু ইঞ্জিন নয়, সম্পূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা বুস্টার, গাইডেন্স সিস্টেম এবং লঞ্চ প্রযুক্তি, একসঙ্গে তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ভারত ও রাশিয়ার যৌথ ডিজাইন টিম এই প্রকল্পে কাজ শুরু করে।
ব্রহ্মপুত্র ও মস্কভা নদীর নাম মিলিয়ে ক্ষেপণাস্ত্রটির নাম রাখা হয় ব্রহ্মোস।
এমটিসিআর-এর বাধা
সেই সময় মিসাইল টেকনোলজি কন্ট্রোল রেজিম (MTCR)-এর নিয়ম অনুযায়ী রাশিয়া ৩০০ কিলোমিটারের বেশি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে ভারতকে সাহায্য করতে পারত না। তাই প্রথম ব্রহ্মোসের পাল্লা সীমাবদ্ধ রাখা হয় ২৯০ কিলোমিটারের মধ্যে।
১৯৯৮ সালে ভারত-রাশিয়ার মধ্যে আন্তঃসরকারি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং BrahMos Aerospace গঠিত হয়। দুই দেশ যৌথভাবে ২৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে।
প্রথম সফল পরীক্ষা
২০০১ সালের ১২ জুন ওড়িশা উপকূলে প্রথম সফল উৎক্ষেপণ হয় ব্রহ্মোসের।
চার বছর পরেআইএনএস রাজপুত থেকে উৎক্ষেপণ করা একটি ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্র অবসরপ্রাপ্ত যুদ্ধজাহাজ আইএনএস সিন্ধুদুর্গ-কে ডুবিয়ে দেয়। ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রায় ম্যাক ২.৮ গতিতে উড়েছিল, যা শব্দের গতির প্রায় তিন গুণ।
অপারেশন সিঁদুরে বিশ্বজোড়া আলোচনায়
অপারেশন সিঁদুরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ব্রহ্মোস ব্যবহারের পর আন্তর্জাতিক মহলে এর গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ স্বীকার করেন, ব্রহ্মোস পাকিস্তানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে নুর খান এয়ারবেস, রাওয়ালপিন্ডি, সরগোধা, স্কার্দু, সুক্কুর ও মুরিদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় আঘাত হেনেছিল। পাকিস্তানের এক শীর্ষ নেতা জানান, ব্রহ্মোসের গতি এত বেশি যে প্রতিরোধের জন্য মাত্র ৩০-৪০ সেকেন্ড সময় পাওয়া গিয়েছিল।
ভারতের সশস্ত্র বাহিনীর মেরুদণ্ড
প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং ব্রহ্মোসকেশুধু একটি ক্ষেপণাস্ত্র নয়, আত্মনির্ভর ভারতের প্রতীক বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর কথায়, ব্রহ্মোসের গতি, নির্ভুলতা ও বিধ্বংসী ক্ষমতা একে বিশ্বের অন্যতম সেরা ক্ষেপণাস্ত্রে পরিণত করেছে। এটি এখন ভারতের সশস্ত্র বাহিনীর মেরুদণ্ড।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
২০১৬ সালে ভারত MTCR-এ যোগ দেওয়ার পর ব্রহ্মোসের পাল্লা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়। বর্তমানে ৪৫০–৫০০ কিলোমিটার এবং ৮০০ কিলোমিটারেরও বেশি পাল্লার সংস্করণ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি ম্যাক ৬-এর বেশি গতিসম্পন্ন হাইপারসনিক পুনর্ব্যবহারযোগ্য ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির গবেষণাও চলছে। সবশেষে রাজনাথ সিং জানান, ভারতের নতুন যুদ্ধজাহাজ আইএনএস মহেন্দ্রগিরিতেও ব্রহ্মোস মোতায়েন করা যাবে।
২৫ বছরের এই যাত্রায় গোপন প্রকল্প থেকে বিশ্বমানের সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রে পরিণত হয়েছে ব্রহ্মোস। আজ এটি শুধু ভারতের প্রতিরক্ষা শক্তির প্রতীক নয়, বরং 'মেক ইন ইন্ডিয়া' থেকে 'মেক ফর দ্য ওয়ার্ল্ড'-এর অন্যতম সফল উদাহরণ।