
ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশনে ‘দিল্লি ঘোষণাপত্র ২০২৬’ সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছে ঘোষণাপত্রটির খসড়া উপস্থাপন করেন এবং কোনও দেশের এ বিষয়ে কোনও আপত্তি আছে কিনা তা জানতে চান। কোনও আপত্তি না আসায় ঘোষণাপত্রটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্রে BRICS-এর ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশ এবং বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক বিভিন্ন বিষয়ে সদস্য দেশগুলোর অভিন্ন অবস্থানের রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মোদী বলেছেন, এই ঘোষণাপত্রটি শীর্ষ সম্মেলনে অনুষ্ঠিত আলোচনার সারমর্ম এবং ব্রিকস সহযোগিতাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অগ্রাধিকারগুলোকে প্রতিফলিত করে।
পুরন প্রতিষ্ঠান সংস্কারের উপর জোর দেওয়া
সমাপনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী মোদী বলেন, BRICS দেশগুলোর মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মতামতের ভিন্নতা থাকলেও, সহযোগিতার প্রতি একটি অভিন্ন অঙ্গীকার সুস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। তিনি আরও বলেন, বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে এবং পুরনো প্রতিষ্ঠানগুলো এই পরিবর্তনশীল বিশ্বকে সামলাতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী মোদী বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতিনিধিত্ব, জবাবদিহি এবং বিধি প্রণয়ন প্রক্রিয়ার উন্নতির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন, পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক চাহিদা মেটাতে এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে সংস্কার করা প্রয়োজন।
দিল্লি ঘোষণাপত্রে কী কী ঘোষণা ও প্রস্তাব গৃহীত হল?
যুদ্ধ প্রতিরোধের ওপর জোর: BRICS দেশগুলো যুদ্ধ ও সংঘাত প্রতিরোধের প্রচেষ্টা জোরদার করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে। এ লক্ষ্যে, তারা বিরোধের মূলে পৌঁছে তা সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে।
সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির সংকল্প: সদস্য দেশগুলো সংলাপ, পারস্পরিক আলোচনা ও কূটনীতির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তির প্রতি তাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।
বিভিন্ন দেশের মতামতের প্রতি সম্মান: BRICS বৈশ্বিক বিষয়াবলীতে বহুপাক্ষিক পন্থা অবলম্বনের বিষয়ে আলোচনা করেছে, যেখানে বিভিন্ন দেশের মতামত ও জাতীয় স্বার্থকে সম্মান করা হয়।
একতরফা শুল্ক নিয়ে উদ্বেগ: ঘোষণাপত্রে একতরফা শুল্ক ও নন-ট্যারি পদক্ষেপের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। BRICS বলেছে, এই ধরনের পদক্ষেপ বাণিজ্যকে বিকৃত করে এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) নিয়মের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
পারমাণু হুমকি নিয়ে উদ্বেগ: BRICS দেশগুলো পারমাণু হুমকি এবং পারমাণু সংঘাতের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
আন্তঃসীমান্ত অর্থপ্রদান ব্যবস্থা নিয়ে কাজ অব্যাহত থাকবে: সদস্য রাষ্ট্রগুলো আন্তঃসীমান্ত অর্থপ্রদান সহজতর করার জন্য আলোচনা চালিয়ে যেতে এবং বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজে বের করতে সম্মত হয়েছে।
একতরফা জবরদস্তিমূলক পদক্ষেপের নিন্দা: BRICS একতরফা অর্থনৈতিক ও অন্যান্য জবরদস্তিমূলক পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছে, যেগুলোকে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বলে মনে করা হয়।
BRICS দেশগুলো আর কী কী প্রস্তাব গ্রহণ করেছে?
দিল্লি ঘোষণায় BRICS দেশগুলো যুদ্ধ ও সংঘাত প্রতিরোধের প্রচেষ্টার ওপর জোর দিয়েছে এবং বলেছে যে সংঘাতের মূল কারণগুলো সমাধান করা অপরিহার্য। সদস্য রাষ্ট্রগুলো সংলাপ, আলোচনা এবং কূটনীতির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধানে তাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। তারা বৈশ্বিক বিষয়গুলোতে এমন একটি বহুপাক্ষিক পদ্ধতিরও আহ্বান জানিয়েছে যা প্রতিটি দেশের জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি ও অবস্থানকে সম্মান করে।
ঘোষণাপত্রে একতরফা শুল্ক ও অশুল্ক পদক্ষেপের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। BRICS দেশগুলো বলেছে যে, এই ধরনের পদক্ষেপ বিশ্ব বাণিজ্যকে প্রভাবিত করে এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) নিয়মের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তারা পরমাণ হুমকি এবং পরমাণ সংঘাতের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
BRICS দেশগুলো আন্তঃসীমান্ত অর্থপ্রদান সহজ করার জন্য সংলাপ অব্যাহত রাখা এবং বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজে বের করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে। তারা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনকারী একতরফা জবরদস্তিমূলক পদক্ষেপেরও নিন্দা জানিয়েছে। যৌথ ঘোষণাপত্রে বৈশ্বিক বাণিজ্য, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং জ্বালানির নির্বিঘ্ন প্রবাহ বজায় রাখতে BRICS দেশগুলোকে একসঙ্গে কাজ করার প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
গ্লোবাল সাউথের জন্য প্রযুক্তিতে সমান অংশগ্রহণ
প্রধানমন্ত্রী মোদী ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিতে গ্লোবাল সাউথের ভূমিকার ওপরও জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন, নতুন প্রযুক্তির উন্নয়নে এবং তৎসংক্রান্ত বিধি প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় গ্লোবাল সাউথের সমান অংশগ্রহণ থাকা উচিত। তিনি আরও বলেন, বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত এবং তার প্রকৃত ফলাফলের মধ্যেকার ব্যবধান অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতামূলক কাজের মাধ্যমে পূরণ করতে হবে।
BRICS-এর ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ডাকটিকিট প্রকাশ করা হয়েছে
BRICS শীর্ষ সম্মেলন চলাকালীন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সংগঠনটির ২০তম বার্ষিকী উপলক্ষে দুটি ডাকটিকিটও প্রকাশ করেন। BRICS সভাপতি হিসেবে তাঁর সমাপনী ভাষণে তিনি সকল সদস্য দেশকে তাদের অবদান, সৃজনশীল চিন্তাভাবনা এবং সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। প্রধানমন্ত্রী মোদী বলেন যে, নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্র BRICS-এর অভিন্ন সংকল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দিকনির্দেশ দিয়েছে। এখন এই সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন করে সেগুলোকে বাস্তব রূপ দেওয়ার দায়িত্ব সদস্য দেশগুলোর ওপর বর্তায়। শীর্ষ সম্মেলনের রুদ্ধদ্বার অধিবেশনের পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং করমর্দন করেন এবং আলোচনা করেন।
BRICS ঘোষণায় পাহালগাঁও জঙ্গি হামলার নিন্দা জানানো হয়েছে
ঘোষণাপত্রের ৪০ নং দফায় পহেলগাঁও জঙ্গি হামলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, 'আমরা যেকোনও ধরনের জঙ্গি কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানাই, যা যেকোনও পরিস্থিতিতে, উদ্দেশ্য নির্বিশেষে, যেখানেই বা যার দ্বারাই সংঘটিত হোক না কেন, অপরাধমূলক এবং অগ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়। আমরা ২২ এপ্রিল, ২০২৫ তারিখে জম্মু ও কাশ্মীরে সংঘটিত জঙ্গি হামলার তীব্র নিন্দা জানাই, যার ফলে ২৬ জন নিহত এবং আরও অনেকে আহত হয়েছেন।' এতে আরও বলা হয়েছে, 'আমরা সন্ত্রাসবাদের সকল রূপ ও প্রকাশকে মোকাবিলা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।' চিন ও রাশিয়া সহ সকল BRICS দেশ পেহলাগাঁও জঙ্গি হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, 'ধর্মের ভিত্তিতে কাউকে হত্যা করা যায় না।'