
‘টানা ৩ দিন-৩ রাত আমাকে খুব কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ফেলেছিলেন তিনি।’ IIT কানপুরের প্রাক্তন ডিরেক্টর অধ্যাপক ইন্দ্রনীল মান্নার মুখে উঠে এল ককরোচ জনতা পার্টির শীর্ষ নেতা আশুতোষ রাঙ্কার কথা। একটি ছাত্রের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে IIT কানপুরে বিক্ষোভের সময়ে কীভাবে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে চাপে ফেলা হয়েছিল, India Today-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে সেই গল্পই করলেন আশুতোষের এক সময়কার অধ্যাপক।
২০১৬-১৭ সালের আশপাশের একটি ঘটনার স্মৃতিচারণ করেন অধ্যাপক ইন্দ্রনীল মান্না। সেই সময় IIT কানপুরের ডিরেক্টর ছিলেন তিনি। আশুতোষ রাঙ্কা তখন ওই প্রতিষ্ঠানেরই প্রাক্তনী এবং স্টুডেন্টস জিমখানার সভাপতি ছিলেন। ক্যাম্পাসে এক ছাত্রের মৃত্যুর পর তাঁর নেতৃত্বে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। সেই পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে আশুতোষ কীভাবে চাপে ফেলেছেন, সে কথাই শোনালেন প্রাক্তন ডিরেক্টর।
সম্প্রতি IIT বম্বেতে দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র সাহিল ওয়াকোড়ের মৃত্যুর পর ছাত্র বিক্ষোভ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। অভিযোগ, অধ্যাপক ডুল্লার বিরুদ্ধে নকল করার অভিযোগ তোলার পর ওই ছাত্রের মৃত্যু হয়। এই ঘটনার পর ছাত্ররা ১৪ দিনের বিক্ষোভের শেষে অনশন কর্মসূচির ঘোষণা করে এবং একাধিক দাবি জানায়। একইভাবে IIT দিল্লিতেও এক MSc পড়ুয়ার আত্মহত্যার ঘটনায় ছাত্র বিক্ষোভ ও তদন্তের দাবি উঠেছিল। এই পরিস্থিতিতে দেশের প্রথম সারির শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে ছাত্র বিক্ষোভ সামলানোর অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন IIT কানপুরের প্রাক্তন ডিরেক্টর।
ঠিক কী ঘটেছিল IIT কানপুরে?
অধ্যাপক ইন্দ্রনীল মান্নার বক্তব্য অনুযায়ী, ক্রিকেট মাঠ থেকে ফেরার পর এক ছাত্র পিঠে ব্যথার অভিযোগ জানিয়েছিলেন। তাঁকে প্রতিষ্ঠানের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ব্যথার ওষুধ দিয়ে তাঁকে হস্টেলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। ফের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়।
সেই সময় অধ্যাপক ইন্দ্রনীল মান্না প্রতিষ্ঠানে ছিলেন না। তিনি ছিলেন দিল্লিতে। ঘটনার কথা জানতে পারেন তিনি। সঙ্গে এ-ও জানতে পারেন, প্রায় ২ হাজার ছাত্র জড়ো হয়েছে। ছাত্ররা ৩ রাত ধরে বিক্ষোভ চালিয়ে যায়। তৎকালীন IIT কানপুরের স্টুডেন্টস জিমখানার সভাপতি আশুতোষ রাঙ্কা বহু ছাত্রকে নিয়ে ডিরেক্টরের অফিসে পৌঁছে বিক্ষোভ দেখান।
সেই অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে অধ্যাপক ইন্দ্রনীল মান্না বলেন, 'IIT কানপুরে আশুতোষ রাঙ্কা এমন একজন ছাত্রনেতা ছিলেন, যিনি আমাকে যথেষ্ট চাপে রেখেছিলেন।' তাঁর কথায়, 'টানা ৩ দিন-৩ রাত আমাকে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে থাকতে হয়েছিল। তবে এত চাপের মধ্যেও ছাত্রদের সামনে আমি নতি স্বীকার করিনি।' তাঁর মতে, তিনি সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছিলেন।
পরে এই ঘটনার তদন্তের জন্য তৎকালীন মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রক AIIMS-এর এক চিকিৎসকের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে। অধ্যাপক ইন্দ্রনীল মান্না জানান, ওই চিকিৎসক ছাত্রের ECG পরীক্ষা খতিয়ে দেখেছিলেন। তাঁর পর্যবেক্ষণ ছিল, ECG-তে ছাত্রটির বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনার ইঙ্গিত ছিল। একইসঙ্গে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কর্মীরা ECG পরীক্ষা করেছিলেন বলে তাঁদের প্রশংসাও করেন তিনি।
অধ্যাপকের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, কমিটি তদন্ত করার পর ১০ দিনের মধ্যেই আশুতোষ রাঙ্কা এবং প্রায় ১০ জন ছাত্র ফিরে এসে ক্ষমা চেয়েছিলেন।
ছাত্র বিক্ষোভ কীভাবে সামলানো উচিত?
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিক্ষোভের পরিস্থিতি তৈরি হলে কীভাবে তা সামলানো উচিত, সেই প্রশ্নের উত্তরে অধ্যাপক ইন্দ্রনীল মান্না বলেন, 'আমার মতে, ছাত্রদের অভিযোগ শোনা এবং বিক্ষোভের সময়ে ওঠা প্রতিটি দাবি মেনে নেওয়া এক বিষয় নয়। ছাত্রদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া মানেই তাঁদের প্রতিটি দাবি মেনে নিতে হবে, এমন নয়। বিশেষ করে ঘটনার সম্পূর্ণ সত্য সামনে আসার আগেই ক্ষতিপূরণের দাবি উঠলে প্রশাসনকে সতর্ক থাকতে হবে।'
তিনি জানান, CJP নেতা আশুতোষ রাঙ্কার নেতৃত্বে বিক্ষোভকারী ছাত্ররা দাবি জানালেও তিনি সংশ্লিষ্ট অধ্যাপককে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেননি। অধ্যাপক ইন্দ্রনীল মান্নার আরও বক্তব্য, 'কোনও শিক্ষক নিজের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছেন বলে মনে হলে প্রতিষ্ঠানের প্রধানের উচিত তাঁর পাশে দাঁড়ানো।' IIT বম্বের অধ্যাপক ডুল্লাকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্কের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, 'পরিস্থিতি অনুযায়ী কোনও শিক্ষকের পাশে দাঁড়ানোর সাহস প্রতিষ্ঠানের ডিরেক্টরের থাকা প্রয়োজন।' IIT দিল্লি, IIT বম্বে-সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রদের বিক্ষোভ ও তাঁদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে ছাত্রদের অভিযোগ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন তিনি।
IIT কানপুর থেকে জননীতি, আশুতোষ রাঙ্কার কর্মজীবন
IIT কানপুরের প্রাক্তনী আশুতোষ রাঙ্কা ২০১৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সেখানে ম্যাটেরিয়ালস ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করেন। ২০১৬ সালের মার্চ থেকে ২০১৭ সালের মার্চ পর্যন্ত তিনি স্টুডেন্টস জিমখানার সভাপতি ছিলেন। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের ড্রামাটিক্স ক্লাবেরও সদস্য ছিলেন। পড়াশোনা শেষ করার পর ২০১৭ সালের অগাস্ট থেকে ২০১৯ সালের মে পর্যন্ত মুম্বইয়ে ম্যাকিনসে অ্যান্ড কোম্পানিতে পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করেন তিনি।
এরপর ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২০ সালের জুলাই পর্যন্ত দিল্লি বিধানসভার অ্যাসোসিয়েট ফেলো হিসেবে কাজ করেন। ২০২১ সালের মে থেকে ২০২২ সালের জুলাই পর্যন্ত গ্যাভি (Gavi), দ্য ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্সের সঙ্গে পরামর্শদাতা হিসেবে যুক্ত ছিলেন।
২০২২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ফের ম্যাকিনসেতে সিনিয়র অ্যাসোসিয়েট হিসেবে কাজ করেন। ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে গ্যাভির সঙ্গে সাময়িক স্বাধীন পরামর্শদাতা হিসেবে যুক্ত হন তিনি।
এছাড়াও লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্স অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্স থেকে ২০২০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন রাঙ্কা। ২০২৫ সালের অগাস্টে গ্লোবাল হেলথ ভিশনস-এ সিনিয়র অ্যাসোসিয়েট হিসেবে যোগ দেন তিনি।
IIT কানপুরে ছাত্রনেতা হিসেবে আশুতোষ রাঙ্কার ভূমিকার পরবর্তী কর্মজীবনেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর কাজের অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছে। তবে ছাত্রাবস্থায় প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনের সঙ্গে তাঁর সেই সংঘাতের স্মৃতি এখনও মনে রেখেছেন প্রাক্তন ডিরেক্টর ইন্দ্রনীল মান্না।