
অত্যন্ত শক্তিশালী 'এল নিনো' নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ভারতের ১৮০ জনের বেশি পরিবেশ ও আবহাওয়া বিজ্ঞানী। তাঁদের আশঙ্কা, ২০২৬-২৭ সালের এই এল নিনোর প্রভাব সাধারণ বছরগুলির তুলনায় অনেক বেশি। এর প্রভাব পড়তে পারে ভারতের জঙ্গল, নদী, সমুদ্র, পাহাড় এবং বন্যপ্রাণীর উপর। ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট সবপক্ষকে দ্রুত প্রস্তুতি শুরু করার আবেদন জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
১৬ সেপ্টেম্বর 'জেনোডো'য় প্রকাশিত হয়েছে এই গবেষণাপত্র। যার নাম 'সুপার এল নিনোর দোরগোড়ায়: ২০২৬/২৭-এ পরিবেশবিদদের জন্য সতর্কবার্তা ও চ্যালেঞ্জ'। এল নিনো প্রশান্ত মহাসাগরকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা। এই সময় সমুদ্রপৃষ্ঠের জল স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি উষ্ণ হয়ে ওঠে। এর প্রভাব বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ার উপর পড়ে। ভারতে সাধারণত এল নিনোর সঙ্গে দুর্বল বা দেরিতে আসা বর্ষা এবং অতিরিক্ত গরমের সম্পর্ক। তবে প্রতিটি এল নিনোর প্রভাব এক রকম হয় না।
বিজ্ঞানীদের মতে, এবার প্রশান্ত মহাসাগরে সমুদ্রের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। ফলে আগামী কয়েক মাসের পরিস্থিতির উপর বিশেষ নজর রাখা প্রয়োজন। পরিস্থিতি সাধারণ এল নিনোর বছরগুলির তুলনায় আলাদা হতে পারে বলেই এর প্রভাব বুঝতে এখন থেকেই বড় মাপের নজরদারি জরুরি।
খরার আশঙ্কা
বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, ২০২৬ সালের নভেম্বর থেকে পরের বছর পর্যন্ত ভারতের বেশ কিছু অংশে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি গরম এবং শুষ্ক আবহাওয়া দেখা যেতে পারে। বৃষ্টির পরিমাণ কমলে জলসঙ্কট আরও বাড়তে পারে। তার সরাসরি প্রভাব পড়বে কৃষি, জঙ্গল এবং পশুপালনের উপর। যে সব এলাকায় আগে থেকেই জলের অভাব রয়েছে, সেখানে গরম ও খরার প্রভাব সবচেয়ে বেশি হতে পারে। মরু অঞ্চল এবং পার্বত্য এলাকায় বসবাসকারী উদ্ভিদ ও প্রাণীদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। জলসম্পদের উপর চাপ বাড়লে শুধু কৃষি উৎপাদনই নয়, গ্রামীণ অর্থনীতিও চাপে পড়তে পারে। শহরগুলিতেও বাড়তে পারে গরমের দাপট। কংক্রিটের কাঠামো এবং পিচের রাস্তার কারণে এমনিতেই শহর সংলগ্ন গ্রামাঞ্চলের তুলনায় বেশি উষ্ণ থাকে। দীর্ঘ সময় ধরে তীব্র গরম চললে তা মানুষের স্বাস্থ্যের পাশাপাশি শহরের গাছপালার জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
জঙ্গলে আগুনের ঝুঁকি
দীর্ঘস্থায়ী গরম এবং জলের অভাবের কারণে জঙ্গলে আগুন লাগার আশঙ্কা। শুকনো জঙ্গলে দ্রুত আগুন ধরতে পারে। আগুন দীর্ঘ সময় ধরে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। এর ফলে গাছপালার পাশাপাশি পাখি ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীরও ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে। আবহাওয়ার আকস্মিক পরিবর্তন প্রাণীদের খাদ্য, প্রজননচক্র এবং বাসস্থানের উপরও প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে জঙ্গলের বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে ভারসাম্য বদলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যার প্রভাব পড়তে পারে সম্পূর্ণ খাদ্যশৃঙ্খলের উপর। বিজ্ঞানীদের মতে, সময় থাকতে নজরদারি বাড়ানো না হলে এই পরিবর্তনগুলিকে সঠিকভাবে বোঝা কঠিন হয়ে পড়বে।
সমুদ্রেও ঝুঁকি
এল নিনোর প্রভাব শুধু স্থলভাগে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ভারতের আশপাশের সমুদ্রাঞ্চলে জলের তাপমাত্রা বাড়হতে পারে। সমুদ্রের জল অস্বাভাবিক ভাবে উষ্ণ হয়ে উঠলে প্রবাল দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এমনকি মারা যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। সমুদ্রের তাপমাত্রার পরিবর্তনের কারণে মাছের বিচরণক্ষেত্র এবং খাদ্য খোঁজার জায়গাও বদলে যেতে পারে। তার সরাসরি প্রভাব পড়বে মৎস্যজীবীদের আয়ে। মাছ ধরার উপর নির্ভরশীল উপকূলীয় সম্প্রদায়গুলি আর্থিক সমস্যার মুখে পড়তে পারে। তাই স্থলভাগের বাস্তুতন্ত্রের মতোই সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের উপরও নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।
মানুষের উপরও পড়বে প্রভাব
প্রাকৃতিক পরিবর্তনের প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনেও পৌঁছয়। কৃষক, মৎস্যজীবী এবং পশুপালকেরা আবহাওয়ার উপর অনেকটাই নির্ভরশীল। কম বৃষ্টি এবং বেশি গরমে কৃষিকাজ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। পাহাড়ি এলাকায় ঘাসের পরিমাণ কমে গেলে পশুপালকদের পশুখাদ্যের সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
এল নিনো ঠেকানো সম্ভব?
এল নিনোকে ঠেকানো সম্ভব নয়। তবে তার প্রভাব বোঝা এবং সেই সূত্রে পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক তথ্য সংরক্ষণের প্রস্তুতি এখনই নেওয়া সম্ভব। আগামী কয়েক মাস ভারতের পরিবেশ এবং জলবায়ু গবেষণার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সময় থাকতে নজরদারি ও গবেষণাকে অগ্রাধিকার দিলে ক্ষয়ক্ষতি কমানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতের জলবায়ু-চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রস্তুতিও আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।