
ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে ভারতে এসেছেন চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ নয়াদিল্লিতে ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন তিনি। প্রায় সাত বছর পর ভারতে এলেন শি। ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর এটাই তাঁর প্রথম ভারত সফর। ফলে মোদী-শি বৈঠককে ভারত-চিন সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
বৈঠকের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ভারতে শি জিনপিংকে উষ্ণ স্বাগত জানান। ব্রিকস সম্মেলনে চিনের প্রেসিডেন্টের ইতিবাচক বক্তব্যের জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী। ভারতের ব্রিকস সভাপতিত্বের সময়ে চিনের কাছ থেকে পাওয়া সমর্থন ও সহযোগিতার জন্যও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনার জন্য এখন তাঁদের সামনে একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে বলেও জানান মোদী।
কৌশলগত ও দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গির উপর জোর
দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেন, ভারত ও চিনকে কৌশলগত এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নিজেদের সম্পর্ককে দেখা উচিত। চিন ভারত-চিন সম্পর্ককে এই দৃষ্টিভঙ্গিতেই দেখে বলে জানান তিনি।
চিনের সরকারি সংবাদ সংস্থা শিনহুয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, শি বলেন, ভারত ও চিন একে অপরের শক্তি ও বিশেষত্ব থেকে শিক্ষা নিতে পারে এবং যৌথ উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে পারে। ‘গ্রেটার BRICS সহযোগিতা’-র আওতায় উচ্চমানের উন্নয়নের জন্য দুই দেশকে একসঙ্গে কাজ করার বার্তাও দেন তিনি।
শির বক্তব্য, দুই দেশ নিজেদের শক্তি ও অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে অভিন্ন উন্নয়নের লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ প্রতিযোগিতা ও মতপার্থক্যের পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলিকেও আরও বিস্তৃত করার উপর জোর দিয়েছেন চিনের প্রেসিডেন্ট।
মতপার্থক্য যেন বিরোধে না পৌঁছয়
দুই নেতা ভারত-চিন সম্পর্কের ক্ষেত্রে মতপার্থক্য থাকলেও তা যেন বিরোধে পরিণত না হয়, সেই বিষয়ে জোর দেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেন, দুই দেশের সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তিনটি ‘পারস্পরিক’ বিষয় গুরুত্বপূর্ণ-পারস্পরিক সম্মান, পারস্পরিক সংবেদনশীলতা এবং পারস্পরিক স্বার্থ।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়কালও রয়েছে। ২০২৫ সালের ৩১ অগস্ট তিয়ানজিনে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন বা SCO-র শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে মোদী ও শির শেষ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হয়েছিল। তার পর ২০২৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে ফের মুখোমুখি হলেন দুই নেতা। ২০২৪ সালের অক্টোবরে কাজানেও তাঁদের সাক্ষাৎ হয়েছিল।
সীমান্তে শান্তি, পুরনো চুক্তি মানার বার্তা
ভারত-চিন সম্পর্কের ক্ষেত্রে সীমান্ত পরিস্থিতি যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তা স্পষ্ট করে দেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তিনি বলেন, সীমান্ত এলাকায় শান্তি ও স্থিতাবস্থা বজায় থাকা দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ধারাবাহিক উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
সীমান্ত সংক্রান্ত বিষয়গুলিতে ইতিমধ্যে হওয়া চুক্তি এবং সমঝোতাগুলি দুই পক্ষকেই মেনে চলতে হবে বলেও জোর দেন প্রধানমন্ত্রী।
দুই নেতা ন্যায্য, যুক্তিসঙ্গত এবং উভয় পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্যভাবে সীমান্ত সমস্যার সমাধানের বিষয়ে নিজেদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। সামগ্রিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং দুই দেশের জনগণের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে মাথায় রেখে সীমান্ত সমস্যার সমাধানের পথে এগোনোর বিষয়ে তাঁরা একমত হন।
২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর ভারত-চিন সম্পর্কে দীর্ঘ টানাপড়েন তৈরি হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে কূটনৈতিক ও সামরিক স্তরে একাধিক আলোচনার মাধ্যমে সীমান্ত পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে। তবে সীমান্ত সমস্যা এখনও পুরোপুরি সমাধান হয়নি।
বাণিজ্য ও অর্থনীতি নিয়েও আলোচনা
দুই দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। ভারত ও চিনের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে উদ্বেগের বিষয়গুলি রয়েছে, সেগুলি সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন দুই নেতা।
এর মধ্যে রয়েছে কাঠামোগত বাণিজ্য ঘাটতি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যা। দুই দেশের মধ্যে বাজারে প্রবেশের সুযোগ আরও অর্থবহ, স্থিতিশীল এবং পূর্বানুমানযোগ্য করার প্রয়োজনীয়তার উপরও জোর দেওয়া হয়।
এছাড়াও দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ আরও বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়। সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান, ব্যবসায়িক যোগাযোগ এবং দুই দেশের মধ্যে মানুষের যাতায়াত আরও সহজ ও বৃদ্ধি করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন দুই নেতা।
সাম্প্রতিক সময়ে ভারত-চিনের মধ্যে বিমান যোগাযোগ, ভিসা এবং ব্যবসায়িক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে বাণিজ্য ঘাটতি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার মতো বিষয়গুলি এখনও দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে সহযোগিতা
আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে ভারত ও চিনের মধ্যে অভিন্ন জায়গা আরও বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার বিষয়েও একমত হন মোদী এবং শি। বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দুই দেশকে আরও বেশি করে একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে আলোচনা হয়।
প্রধানমন্ত্রী মোদী ভারতের ব্রিকস সভাপতিত্বকে চিনের সমর্থনের জন্য শি জিনপিংকে ধন্যবাদ জানান। ২০২৬ সালের ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন সফল করার ক্ষেত্রে চিনের অবদানেরও প্রশংসা করেন তিনি।
আগামী বছর ব্রিকসের দায়িত্ব চিনের হাতে
এদিকে ২০২৭ সালে ব্রিকসের সভাপতিত্ব করবে চিন। চিন আগামী বছর ১৯তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করবে। এই দায়িত্বকে কাজে লাগিয়ে ব্রিকসের সদস্য দেশগুলির মধ্যে ঐকমত্য তৈরি এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নিয়ে একসঙ্গে কাজ করার কথা জানিয়েছে চিন।
দুই দশকে আরও বড় হয়েছে BRICS
ব্রিকস সহযোগিতা ব্যবস্থা নিয়েও শনিবার বক্তব্য রাখেন চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তিনি বলেন, উদীয়মান বাজার এবং উন্নয়নশীল দেশগুলির মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্রে ব্রিকস বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী মঞ্চে পরিণত হয়েছে।
শির বক্তব্য, প্রায় দুই দশকে ব্রিকস সহযোগিতা ব্যবস্থা ক্রমাগত বিস্তৃত ও শক্তিশালী হয়েছে। এই সময়কালে সদস্য দেশগুলি নিজেদের জাতীয় পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উন্নয়নের পথ খুঁজে নিয়েছে। উদীয়মান বাজার এবং উন্নয়নশীল দেশগুলির মধ্যে ঐক্যের মাধ্যমে ব্রিকস দেশগুলি নিজেদের শক্তিশালী করার একটি উদাহরণ তৈরি করেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
২০২৬ সালের নয়াদিল্লি সম্মেলনটি ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন। আগামী বছর চিনে হবে ১৯তম শীর্ষ সম্মেলন।
গালওয়ান সংঘর্ষের পর প্রথম ভারত সফর
উল্লেখ্য, ২০২০ সালের ১৫ জুন রাতে পূর্ব লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বা LAC-তে ভারতীয় এবং চিনা সেনার মধ্যে হিংসাত্মক সংঘর্ষ হয়েছিল। ওই সংঘর্ষে ২০ জন ভারতীয় এবং চার জন চিনা সেনা নিহত হন। তার পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্কের উপর গভীর প্রভাব পড়ে।
শি জিনপিংয়ের শেষ ভারত সফর হয়েছিল ২০১৯ সালের অক্টোবরে। এরপর ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষ এবং পরবর্তী সীমান্ত উত্তেজনার কারণে তাঁর আর ভারতে আসা হয়নি। ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে তাঁর নয়াদিল্লি সফর তাই প্রায় সাত বছর পর তাঁর প্রথম ভারত সফর।
সেই প্রেক্ষাপটে মোদী-শি বৈঠককে ভারত-চিন সম্পর্কের নতুন পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সীমান্তে শান্তি ও স্থিতাবস্থা বজায় রাখা, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানো, মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে সমন্বয়—একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েই দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সম্পর্কের বরফ কিছুটা গললেও সীমান্ত সমস্যা, বাণিজ্য ঘাটতি এবং কৌশলগত অবিশ্বাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি এখনও দুই দেশের সামনে রয়েছে।