
নতুন করে উত্তপ্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে। ইরানে হামলা শুরু করে দিয়েছে আমেরিকা। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করা জাহাজের উপর ২০ শতাংশ চার্জ নেবে ওয়াশিংটন বলে জানিয়ে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর এই চার্জ বসানো হলে ফের সমস্যায় পড়তে পারে ভারত। তেল ও গ্যাস আমদানি খরচ বাড়তে পারে। দামি হতে পারে পেট্রোল, ডিজেল ও রান্নার গ্যাস। পাশাপাশি আরও বিপদের আশঙ্কাও থাকছে।
সোমবার ট্রাম্প দাবি করেন, হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতকারী পণ্যবাহী জাহাজগুলির উপর ২০ শতাংশ চার্জ আরোপ করবে ওয়াশিংটন। পাশাপাশি ইরানের বন্দরগুলির বিরুদ্ধে আবারও অবরোধ (ব্লকেড) চালু করা হবে।
কেন এই চার্জ নিচ্ছে আমেরিকা?
এই প্রশ্নেরও ব্যাখ্যা দিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি জানিয়েছেন, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ হল হরমুজ প্রণালী। এই প্রণালীকে নিরাপদ রাখতে মার্কিন সেনাবাহিনীর টাকা খরচ হচ্ছে। তার ক্ষতিপূরণ হিসেবেই এই জাহাজগুলির থেকে চার্জ নেওয়া হবে।
মাথায় রাখতে হবে, ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে একাধিক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে।
আর এমন পরিস্থিতিতে ভারতের সামনেও রয়েছে বড় প্রশ্ন, এই নতুন সঙ্কট কি আবারও দেশের তেলের দাম বাড়াবে? এটা কি মূল্যস্ফীতির কারণ হতে পারে? আসলে ভারত তার মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানি করে। এই আমদানির বড় অংশই আসে ইরাক, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কুয়েত এবং কাতারের মতো গালফ দেশগুলি থেকে। এই তেল হরমুজ প্রণালী পেরিয়েই ভারতে পৌঁছয়।
শুধু তেল নয়, শিল্প, সার কারখানা এবং গৃহস্থালির প্রয়োজনে ব্যবহৃত এলএনজি-এর আমদানির ক্ষেত্রেও হরমুজ প্রণালী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে হরমুজে যা ঘটে, তার প্রভাব শুধু এসে পড়ে ভারতে।
২০ শতাংশ চার্জ কত বড় সমস্যার?
হরমুজ দিয়ে যাতায়াত করা জাহাজের উপর ট্রাম্পের ২০ শতাংশ চার্জ নিয়ে অনেকেই চিন্তিত। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, আসল ঝুঁকি অন্য জায়গায়। হরমুজ প্রণালী ঘিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ইতিমধ্যেই তেল পরিবহণের খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এই এলাকায় চলাচলকারী জাহাজগুলিকে এখন বেশি বিমা প্রিমিয়াম ও যুদ্ধকালীন ঝুঁকির অতিরিক্ত খরচ দিতে হচ্ছে। পাশাপাশি বিপজ্জনক এলাকায় পরিষেবা দেওয়ার জন্য ট্যাঙ্কার সংস্থাগুলিও বেশি ভাড়া দাবি করছে।
ফলে ভারতকে যদি সরাসরি হরমুজ প্রণালী ব্যবহারের জন্য কোনও চার্জ নাও দিতে হয়, তবুও বেশি দাম দিয়ে অপরিশোধিত তেল কিনতে হতে পারে। পাশাপাশি এহেন সঙ্কটের মুখে বাড়তে পারে আপরিশোধিত তেলের দাম। আর সেটাই চিন্তার বিষয়।
ভারতের উপর কী কী প্রভাব পড়তে পারে?
অনেকেই মনে করেন, অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে পেট্রোল-ডিজেলের দাম বাড়বে। মহার্ঘ হতে পারে রান্নার গ্যাস। যদিও সমস্যা শুধু এখানেই সীমাবদ্ধ থাকে না।
দীর্ঘদিন তেলের দাম বেশি থাকলে দেশের আমদানি বিল বাড়ে। বাণিজ্য ঘাটতির উপর চাপ বাড়তে থাকে। এমনকী কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ডেফিসিট বাড়তে পারে, টাকার উপর চাপ পড়তে পারে এবং আমদানি আরও খরচ সাপেক্ষ হয়ে যেতে পারে।
এছাড়া জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মূল্যস্ফীতিও। সেই সঙ্গে পরিবহণ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন পণ্য ও পরিষেবার দামও বাড়ে। যেসব শিল্প জ্বালানির উপর বেশি নির্ভরশীল, তাদের উৎপাদন খরচও বৃদ্ধি পায়।
তাই সহজ ভাষায় বলতে গেলে, হরমুজকে কেন্দ্র করে জ্বালানি সঙ্কট তৈরি হলে তা শুধু তেলের বাজারে সীমাবদ্ধ থাকবে না। খুব দ্রুত তা মূল্যস্ফীতি, বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক বৃদ্ধির উপরও প্রভাব ফেলবে।
আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রস্তুত ভারত
মধ্যপ্রাচ্যে ঝামেলা শুরুর পর থেকেই তেল নিয়ে নয়া চাল দিয়েছে ভারত। গত তিন মাসে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগারগুলি ধীরে ধীরে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে থেকেও তেল কেনা বাড়িয়েছে। এই সময় রাশিয়া থেকে তেল আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। পাশাপাশি আমেরিকা, পশ্চিম আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশ থেকেও তেল কেনা বাড়ানো হয়েছে। তাই ঝুঁকি অবশ্যই কিছুটা কমেছে।