
ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়ার জঙ্গলে দেখা মেলে ওদের। সেই লালচে রঙের ওরাংওটাং প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার দূরে ওড়িশার জঙ্গলে। ৮ সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবার সকালে ওড়িশার বালেশ্বরে পাঁচটি প্রাণীকে দেখে প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেননি স্থানীয়রা। সেগুলিকে দেখতে অনেকটা ওরাংওটাংয়ের মতো। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, ভারতের জঙ্গলে তো ওরাংওটাং দেখা যায় না! তাহলে কীভাবে এল তারা?
মঙ্গলবার সকালে বালেশ্বরের রানাকথা সংরক্ষিত অরণ্যে স্থানীয় বাসিন্দাদের নজরে আসে পাঁচটি ওরাংওটাং। খবর ছড়িয়ে পড়তেই ওই প্রাণীগুলিকে দেখতে সেখানে ভিড় জমতে শুরু করে। ছড়িয়ে পড়ে ছবি ও ভিডিও। ঘটনাস্থলে পৌঁছয় বন দফতরের দল। নিরাপদে পাঁচটি ওরাংওটাংকেই উদ্ধার করা হয়। পরে তাদের উদয়পুর ফরেস্ট সেকশন অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রাণীগুলির শারীরিক পরীক্ষা করেন চিকিৎসকরা।
বালেশ্বরের ডিভিশনাল ফরেস্ট অফিসার প্রতীক প্রকাশ ইন্দলকর জানিয়েছেন, পাঁচটি প্রাণীরই বয়স এক বছরের কম। খুব সম্ভবত আগের রাতেই বা ৮ সেপ্টেম্বর ভোরে তাদের ওই এলাকায় এনে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।
কেন এমনটা মনে করা হচ্ছে?
ডিএফও-র বক্তব্য, প্রাণীগুলি খুবই ছোট এবং তাদের চলাফেরার ক্ষমতাও সীমিত। নিজেদের মতো করে খুব বেশি দূর যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাছাড়া কোনও বন্য প্রাণীকে সারা রাত এমন একটি এলাকায় রাখা হলে তাদের বেঁচে থাকাও কঠিন। কারণ ওই এলাকায় শেয়াল, কুকুর এবং হনুমানের মতো প্রাণী রয়েছে। তাদের এড়িয়ে পাঁচটি প্রাণী যদি রাত কাটিয়ে থাকে, তাহলে অনুমান করা যায় যে খুব বেশি দিন তারা সেখানে ছিল না। সম্ভবত এক রাত বা খুব ভোরে তাদের সেখানে ছেড়ে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে।
বন্যপ্রাণী পাচারের সঙ্গে যোগ রয়েছে?
গোটা ঘটনায় শুধু বন দফতর নয়, বন্যপ্রাণী অপরাধ দমনকারী সংস্থাগুলিও সতর্ক হয়েছে। সন্দেহ করা হচ্ছে, এর নেপথ্যে আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী পাচার চক্র থাকতে পারে। বন দফতরের আধিকারিকদের কথায়, পাচারের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে এখনও পর্যন্ত এমন কোনও প্রমাণ হাতে আসেনি, যার ভিত্তিতে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে পাঁচটি ওরাংওটাং পাচার করে ভারতে আনা হয়েছিল।
সবচেয়ে বড় বিষয় হল, বালেশ্বর ওরাংওটাংয়ের স্বাভাবিক বাসস্থান নয়। আর নিজেদের স্বাভাবিক বাসস্থান থেকে তারা এতটা দূরে চলে আসতে পারে না। ফলে কোনও মানুষই তাদের সেখানে নিয়ে এসে থাকতে পারে। এমনটাই মনে করছেন তদন্তকারীরা। তবে কে বা কারা তাদের নিয়ে এসেছিল, তা এখনও স্পষ্ট নয়। সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তদন্ত শুরু হয়েছে।
তদন্ত শুরু
আশঙ্কা করা হচ্ছে, কোনও আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী পাচার চক্রের মাধ্যমে ওরাংওটাংগুলিকে ভারতে আনা হয়ে থাকতে পারে। পাচারকারীরা হয়তো তাদের অন্য কোথাও নিয়ে যাচ্ছিল। কোনও কারণে বালেশ্বরের জঙ্গলে তাদের ছেড়ে দিয়ে পালিয়ে যায়। এখন শুধু ওড়িশার বন দফতর নয়, তদন্তে নামতে পারে ওয়াইল্ডলাইফ ক্রাইম কন্ট্রোল ব্যুরোও। এই কেন্দ্রীয় সংস্থার তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখবেন, এই পাঁচটি ওরাংওটাংকে কে ভারতে নিয়ে এসেছিল এবং কীভাবে তারা বালেশ্বর পর্যন্ত পৌঁছল।
বালেশ্বরের বিভিন্ন এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা হবে। রেল, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ এবং পরিবহণ দফতরের কাছ থেকেও তথ্য সংগ্রহ করা হবে। পাঁচটি প্রাণী কীভাবে ভারতে ঢুকল এবং তারপর কীভাবে বালেশ্বর পর্যন্ত পৌঁছল, সেই যোগসূত্রই এখন খুঁজছেন তদন্তকারীরা।
এখন কোথায় ৫ ওরাংওটাং?
উদ্ধারের পর পাঁচটি প্রাণীকেই বন দফতরের নজরদারিতে রাখা হয়েছে। তাদের শারীরিক অবস্থার উপর নিয়মিত নজর রাখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের সাহায্যে চলছে স্বাস্থ্য পরীক্ষা। ভুবনেশ্বরের নন্দনকানন চিড়িয়াখানায় আপাতত রাখা হয়েছে তাদের।