
আবারও শিরোনামে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। একটি ইংরেজি দৈনিকের খবরে দাবি করা হয়েছে, বিভিন্ন বিষয়ে মতভেদ তৈরি হয়েছে কমিশনের অন্দরেই। গত ১০ মাসে ১৪ বার লিখিতভাবে আপত্তি করেছিলেন দুই নির্বাচন কমিশনার বিবেক যোশী এবং সুখবীর সান্ধু। যদিও নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে মতভেদ হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে বিরোধীরা মানতে নারাজ। এবার মূল খবরে আসা যাক।
জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে প্রথমবার অপসারণের প্রস্তাব আনার চেষ্টা হয়েছিল বাংলার ভোটের সময়। তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্বে বিরোধী দলগুলি ১২ মার্চ সংসদের দুই কক্ষে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের দাবিতে নোটিস জমা দিয়েছিল। লোকসভার নোটিসে ১৩০ জন এবং রাজ্যসভার নোটিসে ৬৩ জন সাংসদ সই করেছিলেন। নিয়ম অনুযায়ী, এই প্রস্তাব আনার জন্য লোকসভায় অন্তত ১০০ জন এবং রাজ্যসভায় অন্তত ৫০ জন সাংসদের সই প্রয়োজন। ফলে সংখ্যার বিচারে প্রয়োজনীয় সমর্থন ছিল বিরোধীদের।
এই নোটিশের পর সংসদে আলোচনা হতে পারত। কিন্তু, তা হয়নি। কারণ ৬ এপ্রিল রাজ্যসভার চেয়ারম্যান সি পি রাধাকৃষ্ণন ওই নোটিশ খারিজ করে দেন। বলা হয়, বিরোধীদের আনা অভিযোগগুলি প্রাথমিকভাবে সংবিধানের ৩২৪(৫) এবং ১২৪ অনুচ্ছেদের অধীনে পড়ে না। বিরোধীরা যে বিষয়গুলির উল্লেখ করেছিলেন, তার কয়েকটি নিয়ে ইতিমধ্যেই সিদ্ধান্ত হয়ে গিয়েছে, আবার কয়েকটি বিষয় আদালতের বিচারাধীন। লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাও একই ধরনের যুক্তি দেখিয়ে নোটিশ খারিজ করেন।
এতো গেল আগের বারের কথা। এবার কী হবে? তা বুঝতে হলে প্রথমে জানতে হবে, নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ এবং অপসারণের নিয়ম কী?
নিয়োগের নিয়ম কী?
সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদ এবং সম্প্রতি কার্যকর হওয়া মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার আইন, ২০২৩-এ নিয়োগের নিয়ম ঠিক করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি একটি সিলেকশন প্যানেলের সুপারিশের ভিত্তিতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগ করেন। ওই প্যানেলে তিন জন সদস্য থাকেন, দেশের প্রধানমন্ত্রী, লোকসভায় বিরোধী দলনেতা এবং প্রধানমন্ত্রী মনোনীত কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার এক জন সদস্য।
নির্বাচন কমিশনার হতে কী যোগ্যতা?
নিয়োগের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ভারত সরকারের সচিব পর্যায়ের পদে কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকতে হয়। পাশাপাশি ২০২৩ সালের আইনে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সৎ ও নিষ্ঠাবান হতে হবে। থাকতে হবে নির্বাচন পরিচালনার অভিজ্ঞতা।
বেতন কত?
মেয়াদ ৬ বছর বা ৬৫ বছর বয়স পর্যন্ত, যেটি আগে হবে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির সমান বেতন, ভাতা এবং সুযোগ-সুবিধা পান।
কোন আইনে অপসারণ?
সংবিধানের ৩২৪(৫) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের কোনও বিচারপতিকে অপসারণের যে প্রক্রিয়া রয়েছে, তা মেনেই পদ থেকে সরাতে হবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে। ২০২৩ সালের নতুন আইনের ১১(২) ধারাতেও রয়েছে এই বিধান। অন্য দুই নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণ করতে হলে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের সুপারিশ প্রয়োজন।
এবার মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের পদ্ধতি যেহেতু সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির মতোই, তাই দেখতে হবে সংবিধানের ১২৪ অনুচ্ছেদ। সেখানে বলা হয়েছে, কোনও বিচারপতি বা মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের দু'টি কারণ হতে পারে। প্রথমত, প্রমাণিত অনুচিত কাজ। দ্বিতীয়ত, অক্ষমতা।
এখানে অনুচিত কাজের অর্থ, দুর্নীতিতে যুক্ত হওয়া বা নিজের পদের অপব্যবহার করা। আর অক্ষমতা বলতে বোঝায়, কোনও আধিকারিক শারীরিক বা মানসিক কারণে নিজের দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হয়ে পড়লে।
কীভাবে অপসারণ?
প্রথম ধাপ, নোটিশ দেওয়া। লোকসভার ক্ষেত্রে অন্তত ১০০ জন এবং রাজ্যসভার ক্ষেত্রে অন্তত ৫০ জন সাংসদের সই থাকতে হবে ওই নোটিশে। জমা দিতে হবে রাজ্যসভায় চেয়ারম্যান এবং লোকসভায় স্পিকারের কাছে।
দ্বিতীয় ধাপ, প্রাথমিকভাবে অভিযোগ খতিয়ে দেখা। স্পিকার বা চেয়ারম্যান অভিযোগ খারিজ করে দিলে সেখানেই প্রক্রিয়া শেষ। আর অভিযোগ গ্রহণ করা হলে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। সেই কমিটি প্রমাণ এবং সাক্ষীদের ভিত্তিতে রিপোর্ট তৈরি করবে।
তৃতীয় ধাপ, তদন্ত কমিটির রিপোর্টে অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করা হলে প্রস্তাবটি সংসদের দুই কক্ষে আলোচনা এবং ভোটাভুটির জন্য পেশ হবে।
চতুর্থ ধাপ, দুই কক্ষেই উপস্থিত সাংসদদের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থনে প্রস্তাবটি পাশ হতে হবে। তবেই সেটি সংসদে গৃহীত হয়েছে বলে ধরা হবে।
পঞ্চম এবং শেষ ধাপ, সংসদের প্রস্তাব রাষ্ট্রপতির কাছে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। রাষ্ট্রপতি তাতে স্বাক্ষর করার পরই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে পদ থেকে অপসারণ করা যাবে।
এখন প্রশ্ন হল, নোটিশ গ্রহণ করা হবে কি? সংসদের দুই কক্ষে প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা মিলবে?
ইতিহাস কী বলছে?
আজ পর্যন্ত ভারতে কোনও নির্বাচন কমিশনার বা বিচারপতিকে অপসারণের প্রস্তাব এনে পদ থেকে সরানো হয়নি।