
২০২৫ সালের মে মাসে পহেলগাঁও সন্ত্রাসবাদী হামলার জবাবে ভারত 'অপারেশন সিঁদুর' শুরু করে। পাকিস্তান এবং পাক অধিকৃত কাশ্মীরের জঙ্গি ঘাঁটিগুলিতে হামলা চালিয়ে সেগুলি ধ্বংস করে ভারত। ভারতীয় বিমান বাহিনী এবং সশস্ত্র বাহিনী অসংখ্য লয়টারিং মিউনিশন বা আত্মঘাতী ড্রোন ব্যবহার করেছিল এই হামলায়। এই ড্রোনগুলি টার্গেট খুঁজে আঘাত করার সঙ্গে সঙ্গেই বিস্ফোরণে ফেটে যায়।
এক বছর পর প্রাক্তন চিফ অফ ডিফেন্স স্টাফ জেনারেল অনিল চৌহান বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশনের একটি অনুষ্ঠানে ঘটনাটি প্রকাশ্যে আনলেন। তিনি বলেন, 'সারগোদা বিমানঘাঁটির চারপাশের ব়্যাডার ব্যবস্থা শনাক্ত করার জন্য বেশ কয়েকটি লোহার লয়টারিং মিউনিশন পাঠানো হয়েছিল।
কিরানা হিলস সারগোদা থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। জানা যায়, 'অপারেশন সিঁদুর'-এর সময়ে আত্মঘাতী ড্রোনগুলির মধ্যে একটি প্রায় ২ ঘণ্টা আকাশে ভেসে থাকার পর জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়ায় পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে ভেঙে যায়। তৎকালীন পাকিস্তানি মিডিয়া কিরানা হিলস থেকে ওঠা ধোঁয়ার ছবি দেখিয়েছিল, যা জল্পনাকে আরও উস্কে দিয়েছিল।
জেনারেল চৌহান স্পষ্ট ভাবে বলেছেন, ভারত ইচ্ছাকৃত ভাবে কিরানা হিলসকে টার্গেট করেনি। এর আগে এয়ার মার্শাল একে ভারতী (তৎকালীন ডিরেক্টর জেনারেল অফ এয়ার অপারেশনস) ২০২৫ সালের মে মাসে একটি সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, বারত কিরানা হিলসে হামলা করেনি। সেখানে পরমাণু পরিকাঠামোর উপস্থিতি সম্পর্কেও ভারত অবগত ছিল না।
লয়টারিং মিউনিশনের একটি সীমিত আয়ুকাল থাকে। এগুলি ২ ঘণ্টা পর্যন্তই আকাশে উড়তে পারে। এই সময়ের মধ্যে যদি এগুলি ব়্যাডার বা অন্য কোনও টার্গেট শনাক্ত করতে না পারে, তাহলে এদের জ্বালানি শেষ হয়ে যায় এবং কোথাও বিস্ফোরণে ফেটে যায়। কিরানা হিলস এলাকার কোথাও সম্ভবত এটাই হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেনারেল অনিল চৌহান।
কিরানা হিলস কেন গুরুত্বপূর্ণ?
কিরানা হিলস পাকিস্তানের পঞ্জাব প্রদেশের সারগোদার কাছে অবস্থিত পর্বতমালা। এটি দীর্ঘদিন ধরে পরমাণু পরিকাঠামো এবং ভূগর্ভস্থ অস্ত্রাগারগুলির সঙ্গে যুক্ত। যেখানে পরমাণু অস্ত্র গচ্ছিত রয়েছে বলেও বহু মিডিয়া প্রতিবেদনে সে সময়ে দাবি করা হয়েছিল।
এই কারণেই 'অপারেশন সিঁদুর' চলাকালীন সেখানে দেখা ধোঁয়ার কারণে এই জল্পনা তৈরি হয়েছিল, ভারত পরমাণু পরিকাঠামোয় হামলা করেছে। তবে ভারতের অবস্থান বরাবরই একইরকম রয়েছে। এত সংবেদনশীল একটি টার্গেটে কখনওই ইচ্ছাকৃত ভাবে হামলা করা হয়নি। জেনারেল চৌহানের বিবৃতি থেকে এটা স্পষ্ট, ঘটনাটি ছিল অনভীপ্রেত এবং নিছক দুর্ঘটনা। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ব়্যাডার ব্যবস্থা অকার্যকর করে দেওয়া যাতে ভারতীয় হামলার সময়ে পাকিস্তানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অরক্ষিত হয়ে পড়ে।
লয়টারিং মিউনিশন কী এবং এটি কীভাবে কাজ করে?
লয়টারিং মিউনিশন হল প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনের একটি সংমিশ্রন। উৎক্ষেপণের পর এগুলি দীর্ঘ সময় ধরে একটি এলাকার উপর টার্গেটের সন্ধানে ঘোরাঘুরি করে এবং তারপর আঘাত হানার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিরক্ষা ব়্যাডারকে টার্গেট করতে পারে। কারণ এর কিছু সংস্করণ ব়্যাডার বিকিরণ সঙ্কেত শনাক্ত করে সেদিকে এগিয়ে যেতে পারে। ভারত 'অপারেশন সিঁদুর'-এ প্রধানত ব়্যাডার এবং সামরিক পরিকাঠামোগুলির বিরুদ্ধে এগুলি ব্যবহার করেছিল।
আত্মঘাতী ড্রোন
জেনারেল অনিল চৌহান অস্ত্রটির নাম উল্লেখ করেননি, তবে একাধিক প্রতিবেদন ও বিশ্লেষকদের মতে, এটি সম্ভবত ইজরায়েলি নকশার IAI হারোপ লয়টারিং মিউনিশন ছিল। ভারত কয়েক বছর আগেই হারোপ সিস্টেম কিনেছিল। হারোপের বিকিরণ রোধকারী ক্ষমতা রয়েছে। এটি শত্রুর ব়্যাডার সঙ্কেত শনাক্ত করে তাদের উপর আক্রমণ চালাতে পারে।
এর উড়ান পরিসীমা কয়েক ঘণ্টা হতে পারে। কিন্তু এই অভিযানে ব্যবহৃত সংস্করণ বা পরিস্থিতি অনুযায়ী, এর পরিসীমা ছিল প্রায় ২ ঘণ্টা। পাকিস্তানও দাবি করেছ, এই অভিযান চলাকালীন তারা কয়েক ডজন হারোপ ড্রোন নামিয়েছে। অন্যান্য সম্ভাব্য লয়টারিং মিউনিশনের মধ্যে থাকতে পারে ইজরায়েল-ভারতের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত স্কাইস্ট্রাইকার, দেশীয় নাগাস্ত্র-১, পোলিশ ওয়ারমেট এবং আরও কিছু দেশীয় অস্ত্র।
কিন্তু ব়্যাডার শনাক্তকরণের অভিযান এবং সারগোদার মতো এলাকার জন্য হারোপই সবচেয়ে উপযুক্ত অস্ত্র। হারোপ প্রায় ২৩ কিলোগ্রানের একটি ওয়ারহেড বহন করে যা ব়্যাডার বা ছোট সামরিক পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য যথেষ্ট।
আকস্মিক ঘটনা না কৌশলী বার্তা?
এই ঘটনাটি আধুনিক যুদ্ধের জটিলতা তুলে ধরে। লয়টারিং মিউনিশন হল নির্ভুল ও কম ঝুঁকিপূর্ণ অস্ত্র, কিন্তু এর সীমিত উড়ানকাল কখনও কখনও অপ্রত্যাশিত আঘাতের কারণ হতে পারে। ভারত ইচ্ছাকৃত ভাবে পরমাণু পরিকাঠামোগুলিকে টার্গেট করা থেকে বিরত থেকে সংঘাত সীমিত রাখার নীতি স্পষ্ট ভাবে উল্লেখ করেছে।
ব়্যাডার ব্যবস্থাকে টার্গেট করে পাকিস্তানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল করার কৌশল সফল হয়েছিল। কিরানা হিলসের মতো সংবেদনশীল স্থানের কাছাকাছি পৌঁছনোর ক্ষেত্রেও ভারতীয় ড্রোনের সক্ষমতা প্রমাণিত হয়েছিল। পাকিস্তানি গণমাধ্যমে ধোঁয়ার ছবি জল্পনা উস্কে দিলেও স্যাটেলাইট চিত্র একটি দুর্ঘটনাজনিত সংঘর্ষকেই নিশ্চিত মনে করছে।
এই তথ্য প্রকাশ 'অপারেশন সিঁদুর'-এর এক বছরব্যাপী পর্যালোচনার অংশ। জেনারেল অনিল চৌহান আরও কিছু বিবরণের কথা উল্লেখ করেছেন, যেমন স্কার্দুতে আক্রমণের অনুমোদন পেলেও খারাপ আবহাওয়ার কারণ টার্গেট পরিবর্তন করা হয়েছিল। সামগ্রিক ভাবে এই ঘটনাটি প্রমাণ করে, আধুনিক যুদ্ধে ভারতের ড্রোন এবং লয়টারিং মিউনিশন সক্ষমতা কতটা কার্যকর হয়ে উঠেছে এবং একইসঙ্গে সংযমের প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরে।