
India Artificial Sun: আচ্ছা, কখনও ভেবে দেখেছেন, দিনের পর দিন সূর্য কীভাবে এত বিপুল পরিমাণে শক্তি তৈরি করে? এর পিছনে জটিল বিজ্ঞান রয়েছে। তা বিজ্ঞানী অনেকদিন আগেই জেনে গিয়েছেন। সেই বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়েই যদি আমরা নিজেদের ছোটখাটো সূর্য বানিয়ে ফেলি? তা হলেই কেল্লা ফতে! দিনের পর দিন সেখান থেকেই তাপ উৎপন্ন হবে। ডিজেল, কয়লার মতো কিছু ছাড়াই। বিষয়টি দারুণ হবে, তাই না? ঠিক এই কথা মাথায় রেখেই, কৃত্রিম সূর্য বানিয়ে, তার থেকে ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ তৈরির স্বপ্ন দেখছেন বিজ্ঞানীরা। আর সেই স্বপ্ন পূরণে বড় পদক্ষেপ করল ভারত। গুজরাতে গবেষণাগারের ভিতরেই সূর্যের মতো শক্তি তৈরির প্রক্রিয়া নিয়ে চলছে পরীক্ষা।
গুজরাতের ইনস্টিটিউট ফর প্লাজ়মা রিসার্চ (IPR)। সেখানে ভারতের পরীক্ষামূলক ফিউশন যন্ত্র SST-1 টোকাম্যাকে নতুন ৮২.৬ গিগাহার্টজ় এবং ৪০০ কিলোওয়াট ক্ষমতার একটি গাইরোট্রন বসানো হয়েছে। যন্ত্রটি চালুও করা হয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এর সাহায্যে অত্যন্ত গরম প্লাজ়মাকে আরও বেশি সময় ধরে নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়ে গবেষণা করা সম্ভব হবে। কঠিন কঠিন শব্দ শুনে ভয় পাচ্ছেন? চিন্তা নেই, একটু সহজে এই কৃত্রিম সূর্যের বিষয়ে বুঝে নেওয়া যাক।
কী এই ‘কৃত্রিম সূর্য’?
সূর্যের কেন্দ্রে প্রচণ্ড চাপ ও তাপ রয়েছে। এর ফলে হালকা পরমাণুর নিউক্লিয়াস একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। অর্থাৎ জুড়ে যাচ্ছে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় নিউক্লিয়ার ফিউশন। এর ফলেই বিপুল শক্তি তৈরি হয়।
বিজ্ঞানীরা পৃথিবীতেও একই ধরনের প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রিতভাবে ঘটানোর চেষ্টা করছেন। সফল হলে ভবিষ্যতে বিপুল পরিমাণ শক্তি উৎপাদনের পথ খুলে যেতে পারে।
SST-1 কীভাবে কাজ করে?
SST-1-এর পুরো নাম Steady State Superconducting Tokamak। দেখতে অনেকটা সাউথ ইন্ডিয়ান খাবার 'বডা'র মতো।
এর ভিতরে অত্যন্ত গরম প্লাজ়মা তৈরি করা হয়। প্লাজ়মা হল পদার্থের এমন একটি অবস্থা যেখানে গ্যাস প্রচণ্ড উত্তপ্ত হয়ে বৈদ্যুতিক চার্জযুক্ত কণায় পরিণত হয়।
সমস্যা হল, এই প্লাজ়মার তাপমাত্রা এত বেশি যে কোনও সাধারণ পদার্থ দিয়ে তাকে আটকে রাখা সম্ভব নয়। সব গলে যাবে। তাই শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র ব্যবহার করা হয়। এর সাহায্যে প্লাজ়মাকে যন্ত্রের দেওয়াল থেকে অনেকটা দূরে রাখা হয়।
তাপমাত্রা ২০ কোটি ডিগ্রির বেশি!
ভারতে ফিউশন নিয়ে গবেষণায় ইতিমধ্যেই অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রায় প্লাজ়মা তৈরি করা হয়েছে। সেই তাপমাত্রা ২০ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি হতে পারে। অর্থাৎ সূর্যের কেন্দ্রের তাপমাত্রার থেকেও অনেক বেশি।
শুনতে অবাক লাগলেও এর কারণ রয়েছে। পৃথিবীতে সূর্যের মতো বিপুল মহাকর্ষীয় চাপ নেই। সেই চাপ আর্টিফিসিয়ালি তৈরি করাও যাবে না। তাই ফিউশন ঘটানোর প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি তৈরি করতে প্লাজ়মাকে অত্যন্ত বেশি তাপমাত্রায় নিয়ে যেতে হয়।
তবে শুধু তাপমাত্রা বাড়ালেই হবে না। সেই প্রচণ্ড গরম প্লাজ়মাকে দীর্ঘ সময় ধরে স্থির রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ।
এই নতুন গাইরোট্রন কী কাজ করবে?
নতুন গাইরোট্রন এই গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ। এটি অত্যন্ত উচ্চ কম্পাঙ্কের মাইক্রোওয়েভ এনার্জি জেনারেট করে। সেই শক্তি প্লাজ়মার মধ্যে পাঠিয়ে সেটিকে গরম রাখতে সাহায্য করবে।
নতুন যন্ত্রটির ক্ষমতা ৮২.৬ গিগাহার্টজ় এবং ৪০০ কিলোওয়াট। এর আগে SST-1-এ ৪২ গিগাহার্টজ় ক্ষমতার একটি সিস্টেম ব্যবহার করা হত। ফলে নতুন গাইরোট্রন গবেষকদের জন্য আরও শক্তিশালী হিটিং সিস্টেম তৈরি করছে।
এর সাহায্যে বেশি তাপমাত্রার প্লাজ়মাকে আরও দীর্ঘ সময় ধরে রাখার চেষ্টা করা হবে। প্লাজ়মা কতটা স্থির থাকে, কীভাবে আচরণ করে এবং কীভাবে তাকে আরও ভাল ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তা বোঝা যাবে।
এখনই বিদ্যুৎ তৈরি হচ্ছে না
তবে এই সাফল্যকে ভারতের ফিউশন বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি হয়ে যাওয়ার ঘটনা ভাবলে ভুল হবে। SST-1 এখনও একটি পরীক্ষামূলক যন্ত্র। এখনও বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়নি।
ফিউশন থেকে নিয়মিত এবং বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ তৈরি করা এখনও বিজ্ঞানীদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। অত্যন্ত গরম প্লাজ়মা তৈরি করা যেমন কঠিন, তেমনই সেটিকে দীর্ঘ সময় ধরে স্থিরভাবে এক জায়গায় ধরে রাখাও কঠিন।
এত খরচ করে লাভ কী?
সফল হলে এতে তুলনামূলক কম খরচেই ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে। শুধু তাই নয়, এতে দূষণ কমবে। কয়লা-ডিজেল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো ধোঁয়া চারদিক ভরে যাবে না। জ্বালানির জোগানের ঝামেলাও কমে যাবে।
তাহলে বুঝলেন তো, কৃত্রিম সূর্য কেন বানানো হচ্ছে? এই বিষয়ে আপনার বিশ্লেষণ কী? জানান কমেন্টে।