
প্যারাকোয়াট ডাইক্লোরাইড (Paraquat Dichloride)। ভয়ঙ্কর বিষ। তা সত্ত্বেও ভারতে কৃষিক্ষেত্রে আগাছানাশক হিসেবে এর ব্যবহার করা হত। তবে অবশেষে তা নিষিদ্ধ করল কেন্দ্রীয় সরকার। চিকিৎসক, বিষবিজ্ঞানী এবং কৃষি বিশেষজ্ঞদের একাংশ দীর্ঘদিন ধরে এই রাসায়নিক আগাছানাশক নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। অবশেষে সেই পথেই হাঁটল কেন্দ্র। কেন্দ্রীয় কৃষি ও কৃষক কল্যাণ মন্ত্রক প্যারাকোয়াটের আমদানি, উৎপাদন, বিক্রি, পরিবহণ, বিতরণ এবং ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার জন্য খসড়া বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে।
তবে এটি এখনও চূড়ান্ত নির্দেশ নয়। আগামী ৩০ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট পক্ষরা আপত্তি বা পরামর্শ জানাতে পারবে। সেই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরই চূড়ান্ত বিজ্ঞপ্তি জারি হবে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কার্যকর হলে ভারতের কৃষিনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে পারে।
কেন?
প্যারাকোয়াট সাধারণ আগাছানাশক নয়। চিকিৎসকদের মতে, এটি বিশ্বের অন্যতম সবচেয়ে বিষাক্ত হার্বিসাইড। শরীরে অল্প পরিমাণ প্রবেশ করলেও মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, এই বিষক্রিয়ার কোনও নির্দিষ্ট প্রতিষেধক নেই।
প্যারাকোয়াট শরীরে প্রবেশ করলে প্রথমেই ফুসফুসে মারাত্মক ক্ষতি করে। অনেক ক্ষেত্রে স্থায়ী ফাইব্রোসিস তৈরি হয়, ফলে রোগীর স্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাস প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। পাশাপাশি কিডনি, লিভার, ত্বক এবং চোখও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দুর্ঘটনাবশত পান করা, স্প্রে করার সময় শ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করা বা ক্ষতস্থানের মাধ্যমে শরীরে ঢুকে গেলেও প্রাণঘাতী পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
বিশ্বের বহু দেশে আগে থেকেই নিষিদ্ধ
স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকির কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ব্রিটেন, সুইৎজ়ারল্যান্ড, চিন-সহ ৭০টিরও বেশি দেশ বহু আগেই প্যারাকোয়াটের ব্যবহার নিষিদ্ধ বা ধাপে ধাপে বন্ধ করেছে। অথচ এত দিন পর্যন্ত ভারতে নির্দিষ্ট কিছু ফসলে এই রাসায়নিক ব্যবহারের অনুমতি ছিল।
সরকারি নথি অনুযায়ী, চা, আলু, তুলো, রাবার, কফি, ধান, ভুট্টা, গম এবং আঙুর— এই নয়টি ফসলে প্যারাকোয়াট ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।
অপব্যবহারের অভিযোগও ছিল
যদিও বাস্তবে বহু জায়গায় এই রাসায়নিক নির্ধারিত নিয়মের বাইরে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ। বিভিন্ন রাজ্যে ফসল দ্রুত শুকিয়ে কাটার সুবিধার জন্য প্যারাকোয়াট স্প্রে করার অভিযোগ ওঠে। বিশেষ করে মুগ ডালের মতো ফসলে এই ধরনের ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, এতে রাসায়নিকের অবশিষ্টাংশ খাদ্যশৃঙ্খলে ঢুকে মানুষের শরীরেও পৌঁছতে পারে।
সরকারি সূত্রের মতে, এই অপব্যবহারের ঘটনাগুলিও সর্বভারতীয় নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব আনার অন্যতম কারণ।
নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে কী হবে?
চূড়ান্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর প্যারাকোয়াটের আমদানি, উৎপাদন, বিক্রি, পরিবহণ, বিতরণ এবং ব্যবহার— সবই বেআইনি হয়ে যাবে। এই রাসায়নিকের জন্য জারি করা সমস্ত রেজিস্ট্রেশনও বাতিল করা হবে।
যেসব সংস্থা বা ব্যবসায়ীর কাছে বৈধ নিবন্ধন রয়েছে, তাঁদের তিন মাসের মধ্যে সেই নিবন্ধনপত্র জমা দিতে হবে। তা না হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। পাশাপাশি রাজ্য সরকারগুলিকেও এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার দায়িত্ব দেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্যারাকোয়াট নিষিদ্ধ হওয়া হয়তো শুরু মাত্র। বর্তমানে ভারতে এমন একাধিক কীটনাশক ও আগাছানাশক ব্যবহারের অনুমতি রয়েছে, যেগুলি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ক্যানসার, স্নায়ুর ক্ষতি, প্রজনন সমস্যা বা পরিবেশ দূষণের আশঙ্কায় নিষিদ্ধ বা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত।
ফলে প্যারাকোয়াটের পরে অন্য বিতর্কিত রাসায়নিকগুলির ব্যবহার নিয়েও নতুন করে পর্যালোচনা শুরু হতে পারে বলে মনে করছেন কৃষি ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাংশ। কেন্দ্রের এই পদক্ষেপ ভারতের কৃষিক্ষেত্রে নিরাপদ ও বিজ্ঞানভিত্তিক রাসায়নিক ব্যবহারের দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলেই মনে করা হচ্ছে।