
পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলার পর থেকে সিন্ধু জল চুক্তি সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে ভারত। আর তা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না পাকিস্তান। ভারতকে সেজন্য মাঝে মাঝে ফাঁকা হুমকিও দিচ্ছে শেহবাজ শরিফের সরকার। তবে তা সেভাবে পাত্তা দিচ্ছে না ভারতের বিদেশ বা প্রতিরক্ষা মন্ত্রক। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে,ভারতের হাতে এমন কিছু যুক্তি রয়েছে যা অকাট্য। আমেরিকা, রাশিয়া বা চিনের মতো বড় বড় দেশ আন্তর্জাতিক চুক্তি ভঙ্গ করেছে নিজেদের স্বার্থে। পাকিস্তানের সঙ্গে সিন্ধু জল চুক্তি স্থগিত রাখার ক্ষেত্রেও ভারতও তেমনই পথ নিয়েছে।
সম্প্রতি পাকিস্তানের তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার একটি সেমিনারে দাবি করেন, ভারত সিন্ধু জল চুক্তি (Indus Waters Treaty-IWT) সংশোধন, বাতিল বা স্থগিত করতে পারে না। ভারতের প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বড় শক্তিগুলির নেওয়া সিদ্ধান্তের উদাহরণ তুলে ধরে জানান, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে ভারতও সিন্ধু জল চুক্তি সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার অধিকার রাখে।
অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল পি. আর. শঙ্কর এক্স হ্যান্ডেলে লেখেন, 'যদি আমেরিকা JCPOA থেকে বেরিয়ে যেতে পারে, রাশিয়া INF চুক্তি ছেড়ে দিতে পারে এবং চিন দক্ষিণ চিন সাগর নিয়ে হেগ ট্রাইব্যুনালের রায় প্রত্যাখ্যান করতে পারে, তাহলে ভারতও জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সিন্ধু জল চুক্তি সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে পারে।'
অর্থাৎ, বিশ্বের বড় শক্তিগুলি যখন দেখেছে কোনও আন্তর্জাতিক চুক্তি তাদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করছে না, তখন তারা সেই চুক্তি থেকে সরে এসেছে বা উপেক্ষা করেছে। পি. আর. শঙ্করের মতে, শক্তিশালী দেশগুলি আন্তর্জাতিক চুক্তির তুলনায় নিজেদের কৌশলগত ও নিরাপত্তাজনিত স্বার্থকেই বেশি গুরুত্ব দেয়। তাই ভারতও একই নীতি অনুসরণ করতে পারে।
সিন্ধু জল চুক্তি কী?
১৯৬০ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিশ্বব্যাঙ্কের মধ্যস্থতায় সিন্ধু জল চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে সিন্ধু অববাহিকার ছয়টি নদীর জল দুই দেশের মধ্যে ভাগ করা হয়। তারমধ্যে রাভি, বেয়াস ও শতদ্রু নদীর অধিকাংশ জল ব্যবহারের অধিকার পায় ভারত। অন্যদিকে সিন্ধু, ঝিলম ও চেনাব নদীর প্রধান ব্যবহারের অধিকার দেওয়া হয় পাকিস্তানকে। ভারত দীর্ঘদিন ধরেই পাকিস্তান-সমর্থিত সন্ত্রাসবাদের প্রেক্ষিতে এই চুক্তির পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়ে আসছে।
২০১৮ সালে ইরান পারমাণবিক চুক্তি (JCPOA) থেকে আমেরিকা সরে গিয়েছিল, কী ঘটেছিল?
২০১৮ সালে তৎকালীন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৫ সালের Joint Comprehensive Plan of Action (JCPOA) থেকে একতরফাভাবে তাদের দেশকে প্রত্যাহার করে নেন। ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া, চিন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিরোধিতা সত্ত্বেও আমেরিকা ইরানের ওপর পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
USA-এর যুক্তি
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি ছিল, এই চুক্তি মৌলিকভাবেই ত্রুটিপূর্ণ। এতে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রক্সি কার্যকলাপ এবং নির্দিষ্ট সময় পর পারমাণবিক কর্মসূচির সীমাবদ্ধতা উঠে যাওয়ার মতো বিষয়গুলির সমাধান করা হয়নি। ফলে ভবিষ্যতে ইরান আবার উন্নত পারমাণবিক কর্মসূচি শুরু করতে পারত। ট্রাম্প এটিকে সবচেয়ে খারাপ চুক্তি বলে উল্লেখ করেছিলেন।
INF চুক্তি থেকে আমেরিকা ও রাশিয়ার সরে আসা, কী ঘটেছিল?
১৯৮৭ সালে আমেরিকা ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে Intermediate-Range Nuclear Forces (INF) চুক্তি হয়। এতে ৫০০ থেকে ৫,৫০০ কিলোমিটার পাল্লার স্থলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র নিষিদ্ধ করা হয়।
কিন্তু পরে আমেরিকা অভিযোগ তোলে, রাশিয়া চুক্তি ভঙ্গ করে নতুন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে। ২০১৯ সালে USA চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায়। এরপর রাশিয়াও একই সিদ্ধান্ত নেয় এবং কার্যত INF চুক্তি শেষ হয়ে যায়।
দক্ষিণ চিন সাগর নিয়ে রাষ্ট্রসংঘের রায় প্রত্যাখ্যান করে চিন, কী ঘটেছিল?
ফিলিপাইনের করা মামলায় UNCLOS-এর অধীনে গঠিত আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল দক্ষিণ চিন সাগরে চিনের কৃত্রিম দ্বীপ নির্মাণকে বেআইনি বলে রায় দেয়।
চিনের যুক্তি
চিন ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারই স্বীকার করেনি। তাদের দাবি ছিল, বিষয়টি সার্বভৌমত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত, তাই আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার নেই। চিন এই রায়কে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও অবৈধ বলে প্রত্যাখ্যান করে এবং দক্ষিণ চিন সাগরে নিজেদের কার্যকলাপ চালিয়ে যায়।
ভারতের ক্ষেত্রে এর তাৎপর্য
এই উদাহরণগুলি দেখায়, বিশ্বের বড় শক্তিগুলি জাতীয় নিরাপত্তা, কৌশলগত স্বার্থ বা অন্য পক্ষের চুক্তিভঙ্গের অভিযোগের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে সরে এসেছে বা তা কার্যকরভাবে মানেনি। ভারতের ক্ষেত্রেও বিশেষজ্ঞদের মতে, পাকিস্তান-সমর্থিত সন্ত্রাসবাদের বিষয়টি সামনে রেখে সিন্ধু জল চুক্তি সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার যুক্তি তুলে ধরা যেতে পারে। পাকিস্তান চাইলে বিশ্বব্যাঙ্ক বা আন্তর্জাতিক আদালতের দ্বারস্থ হতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তবতায় বহু ক্ষেত্রে জাতীয় নিরাপত্তা ও শক্তির ভারসাম্য আইনি বাধ্যবাধকতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়, এমনটাই দাবি প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের।