
India Missile Test 2026: মিসাইল ও রকেটের দিক থেকে আরও শক্তিশালী ভারত। আজ থেকে এক যুগ পরেও যদি ভারতের ডিফেন্সের ইতিহাস লেখা হয়, তাহলে ২০২৬ এর মে মাসের প্রথম ১০ দিন নিঃসন্দেহে আলাদা করে উল্লেখ করতে হবে। কেন? কারণ, এই ১০ দিনের মধ্যে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে ভারত। হাইপারসনিক অ্যান্টি-শিপ মিসাইল থেকে শুরু করে স্ক্র্যামজেট ইঞ্জিন। একের পর এক ধামাকায় প্রতিরক্ষা গবেষণায় রীতিমতো নতুন দিগন্ত খুলছে, মত বিশেষজ্ঞদের একাংশের। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধের আবহে দূরপাল্লার নির্ভুল হামলার গুরুত্ব ফের সামনে আসতেই ভারতের এই ‘মিসাইল Week’ ঘিরে বাড়ছে আগ্রহ।
১ মে থেকে ১০ মে-র মধ্যে ভারত চারটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা চালায়। তার মধ্যে ছিল লং রেঞ্জ অ্যান্টি-শিপ মিসাইল বা LR-AShM-এর পরীক্ষা, ট্যাকটিক্যাল অ্যাডভান্সড রেঞ্জ অগমেন্টেশন বা TARA-র প্রথম ফ্লাইট ট্রায়াল, MIRV প্রযুক্তি-সহ উন্নত অগ্নি ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা এবং স্ক্র্যামজেট ইঞ্জিনের দীর্ঘ সময়ের ট্রায়াল। প্রতিটি পরীক্ষাই ভারতের সামরিক কৌশলে আলাদা গুরুত্ব বহন করছে।
সমুদ্রের দূর প্রান্তে আঘাত, নজরে LR-AShM
প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা DRDO তৈরি করেছে LR-AShM। রিপোর্ট অনুযায়ী, এই ক্ষেপণাস্ত্র প্রায় ১৫০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। শব্দের গতির প্রায় ১০ গুণ বেগে ছুটতে পারে এটি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মিসাইল মূলত বিমানবাহী রণতরী ধ্বংসের জন্য তৈরি।
ব্রহ্মোসের তুলনায় অনেক বেশি গতিসম্পন্ন হলেও এটি পুরোপুরি প্রচলিত হাইপারসনিক মিসাইল নয়। ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রথমে উপরের বায়ুমণ্ডলে উঠে যায়। পরে গ্লাইড করে লক্ষ্যবস্তুর দিকে এগোয়। ফলে এর গতিপথ আন্দাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। শত্রুপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য এটিকে আটকানোও কঠিন হতে পারে।
TARA: সাধারণ বোমাকে ‘স্মার্ট’ বানানোর প্রযুক্তি
৭ মে পরীক্ষিত TARA প্রযুক্তিকে ভারতের যুদ্ধ কৌশলে বড় পদক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে সাধারণ বা ‘ডাম্ব’ বোমাকে নির্ভুল নিশানায় আঘাত হানতে সক্ষম ‘স্মার্ট’ অস্ত্রে পরিণত করা যায়।
সাধারণত যুদ্ধবিমানকে লক্ষ্যবস্তুর কাছে গিয়ে বোমা ফেলতে হয়। এতে শত্রুপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষার ঝুঁকি বাড়ে। কিন্তু TARA প্রযুক্তিতে বোমার সঙ্গে বিশেষ গ্লাইড কিট জুড়ে দেওয়া হয়। ফলে অনেক দূর থেকেই বোমা ছোড়া যায় এবং সেটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর দিকে নিজে থেকেই গ্লাইড করে পৌঁছে যায়।
২০১৯ সালের বালাকোট এয়ারস্ট্রাইকে ভারতীয় বায়ুসেনা ইজরায়েলের SPICE কিট ব্যবহার করেছিল। এখন সেই ধরনের প্রযুক্তি দেশেই তৈরি হওয়ায় বিদেশি নির্ভরতা কমবে বলেই মত প্রতিরক্ষা মহলের।
MIRV প্রযুক্তি-সহ অগ্নি
৮ মে ওড়িশার ড. এপিজে আব্দুল কালাম দ্বীপ থেকে MIRV প্রযুক্তি-সহ উন্নত অগ্নি ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা চালানো হয়। MIRV বা Multiple Independently Targetable Re-entry Vehicle প্রযুক্তির ফলে একটি ক্ষেপণাস্ত্র থেকেই একাধিক ওয়ারহেড আলাদা আলাদা লক্ষ্যবস্তুতে পাঠানো যায়।
একটি সাধারণ ব্যালিস্টিক মিসাইল যেখানে একটি মাত্র লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে, সেখানে MIRV প্রযুক্তি একাধিক টার্গেটকে একসঙ্গে নিশানা করতে সক্ষম। ফলে শত্রুপক্ষের পক্ষে প্রতিরোধ করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। ভারতের স্থলভিত্তিক পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থায় অগ্নি সিরিজ বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। নতুন প্রযুক্তি সেই শক্তিকে আরও বাড়াল বলে মনে করা হচ্ছে।
স্ক্র্যামজেট ইঞ্জিন
৯ মে-র স্ক্র্যামজেট ইঞ্জিন পরীক্ষা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। প্রায় ২০ মিনিট ধরে এই ইঞ্জিনের পরীক্ষা চালানো হয়। এই প্রযুক্তিই ভবিষ্যতে এমন হাইপারসনিক ক্রুজ মিসাইল তৈরির রাস্তা খুলতে পারে, যা শব্দের গতির পাঁচ গুণেরও বেশি বেগে উড়তে সক্ষম হবে।
স্ক্র্যামজেট ইঞ্জিনের বিশেষত্ব হল, এতে বায়ু সুপারসনিক গতিতেই ইঞ্জিনের ভিতর প্রবেশ করে এবং সেই অবস্থাতেই জ্বালানি পুড়ে শক্তি উৎপন্ন হয়। এত উচ্চ গতিতে তাপমাত্রা ও চাপ সামলানো অত্যন্ত কঠিন। ফলে এই প্রযুক্তি আয়ত্ত করা যে কোনও দেশের পক্ষেই বড় সাফল্য বলে ধরা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মে মাসের এই ধারাবাহিক পরীক্ষাগুলি শুধু নতুন অস্ত্রের প্রদর্শন নয়। বরং দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা ভারতের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এখন আরও উন্নত পর্যায়ে পৌঁছচ্ছে, সেই ইঙ্গিতই মিলছে। সমুদ্রে দূরপাল্লার হামলা, আকাশপথে কম খরচে নির্ভুল আঘাত, আরও জটিল কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র এবং ভবিষ্যতের হাইপারসনিক প্রযুক্তি; সব ক্ষেত্রেই এগোচ্ছে ভারত।