
লাদাখ নিয়ে উস্কানিমূলক মন্তব্য চিনের। চিনের বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, লাদাখকে কখনও স্বীকৃতি দেয়নি চিন। ভারতের বিরুদ্ধে লাদাখে একতরফা এবং অবৈধ ভাবে দখলদারির অভিযোগও তুলেছে বেজিং। যদিও ভারত তাতে গুরুত্ব দিতে নারাজ।
ভারতের সরকারি ও ধারাবাহিক অবস্থান হল, জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ ভারতের অবিচ্ছেদ্য ও অবিভাজ্য অংশ। বর্তমানে পাকিস্তানের (গিলগিট-বালতিস্তান-সহ) অথবা চিনের (আকসাই চিন) অবৈধ দখলে থাকা অঞ্চলগুলিও এর অন্তর্ভুক্ত। ভারত এই অঞ্চলগুলিকে নিজেদের অংশ বলে মনে করে। এই প্রেক্ষাপটে চিনের এই মন্তব্য যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ এবং উস্কানিমূলক বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক মহল।
চিনের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র মাও নিং বেজিংয়ে বলেন, 'ভারতীয় পক্ষের একতরফা ও অবৈধ ভাবে তৈরি করা তথাকথিত লাদাখ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলকে চিন কখনও স্বীকৃতি দেয়নি। পাশাপাশি, ভারতীয় পক্ষের প্রকাশ করা বিভিন্ন স্থানের তথাকথিত প্রমিত নামকরণের তীব্র বিরোধিতা করে চিন।'চিনের বিদেশ মন্ত্রক আরও জানিয়েছে, চিন-ভারত সীমান্তের পশ্চিম অংশ বরাবরই চিনের।
মাও নিং বলেন, 'ভারতীয় পক্ষের এই পদক্ষেপ অবৈধ ও অকার্যকর। এর ফলে এই বাস্তব সত্যের কোনও পরিবর্তন হবে না যে, চিন-ভারত সীমান্তের পশ্চিম অংশ বরাবরই চিনের।'
মঙ্গলবার বেজিংয়ে চিনের বিদেশ মন্ত্রকের সাংবাদিক বৈঠকে মুখপাত্র মাও নিংকে ভারত সরকারের একটি সিদ্ধান্ত সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়। চলতি মাসের গোড়ায় কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল লাদাখের ২৮টি স্থান ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের নাম নির্ধারণ করেছে ভারত সরকার। সেই সিদ্ধান্তের বিষয়ে চিনের বিদেশ মন্ত্রকের প্রতিক্রিয়া জানতে চান এক সাংবাদিক।
উল্লেখ্য, ২ অক্টোবর ভারতের সরকারি মানচিত্রে লাদাখের ২৮টি কৌশলগত স্থান ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বা LAC-র কাছে অবস্থিত গোগরা ও হট স্প্রিংসের মতো উত্তেজনাপ্রবণ এলাকাও রয়েছে। লাদাখ প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে এই পদক্ষেপ করেছে কেন্দ্র। সরকারি মানচিত্র তৈরির প্রক্রিয়া আরও উন্নত করা, স্থানগুলির সঠিক পরিচিতি নিশ্চিত করা এবং সংবেদনশীল সীমান্তবর্তী এলাকা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোই এর উদ্দেশ্য।
গোগরা ও হট স্প্রিংস গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত স্থান। ২০২০ সালে ভারত ও চিনের সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘাতের সময় এই এলাকাগুলিতে উত্তেজনা ছড়িয়েছিল। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার কাছে ভারতীয় সেনাবাহিনীর টহলদারির ক্ষেত্রেও এই স্থানগুলি গুরুত্বপূর্ণ।
পূর্ব লাদাখ সীমান্তে উত্তেজনার সূত্রপাত হয়েছিল ২০২০ সালের ৫ মে। সে দিন প্যাংগং হ্রদ এলাকায় ভারত ও চিনের সেনাদের মধ্যে হিংসাত্মক সংঘর্ষ হয়। পরবর্তী সময়ে ২০২২ সালে দুই দেশ সেনা প্রত্যাহার বা ডিসএনগেজমেন্ট প্রক্রিয়া শুরু করে।
ভারত যে অন্য স্থানগুলিকে চিহ্নিত করেছে, তার মধ্যে রয়েছে আলিশা গিরি, ব্রাংসা, চাপচিংল পাস, কনিষ্ক পিক, করুণ পীর পাহাড়, কুকসেল, মার্তণ্ড গিরি, পারপিক হিমবাহ, স্কমারি হিমবাহ, শচমিরিক পাস, শ্কোর্গা উপত্যকা, জোরাওয়ার পিক, ডেহরা কম্পাস, ড্র্যাক কার্পো, জোলমোরি, কুমারায়ানা পয়েন্ট, পাংলুং, রিনচেন জাংপো, সাক্যাশ্রী গিরি, গুরু রিনপোছে, শামল লুংপা, ইয়াংপা নদী, মারপা লোৎসাওয়া রি, মিলারেপা কাংরি, শিবা রি এবং মহেশ্বরা রি।
লাদাখে গোগরা ও হট স্প্রিংস-সহ ২৮টি স্থানকে আনুষ্ঠানিক ভাবে মানচিত্রে চিহ্নিত করার পরেই এই কূটনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে। অন্যদিকে, চিন আবারও এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করে জানিয়েছে, এর ফলে চিন-ভারত সীমান্তের পশ্চিম অংশ নিয়ে তাদের অবস্থানের কোনও পরিবর্তন হবে না।
চিনের মন্তব্যের জবাব ভারতের
চিনের বিদেশ মন্ত্রকের মন্তব্যের কড়া জবাব দিয়েছে ভারত। বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, 'আমরা আবারও স্পষ্ট করে জানাতে চাই, লাদাখ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ভারতের অবিচ্ছেদ্য ও অবিভাজ্য অংশ। চিন অস্বীকার করলেও এই প্রতিষ্ঠিত সত্যের কোনও পরিবর্তন হবে না।'
তিনি আরও বলেন, ভারত সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের যে প্রেস বিজ্ঞপ্তির উল্লেখ করা হচ্ছে, তা যথেষ্ট স্পষ্ট। ওই বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, লাদাখ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ২৮টি স্থান ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যকে ‘সার্ভে অফ ইন্ডিয়া’-র সরকারি মানচিত্রে প্রমিত নাম-সহ চিহ্নিত করা হয়েছে। লাদাখ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের প্রশাসন এবং স্থানীয় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির সঙ্গে আলোচনা করেই এই কাজ করা হয়েছে।
রণধীর জয়সওয়াল জানান, ‘সার্ভে অফ ইন্ডিয়া’-র সরকারি মানচিত্রে লাদাখের এই স্থানগুলিকে আনুষ্ঠানিক ভাবে চিহ্নিত করার উদ্দেশ্য হল, মানুষ যাতে সেগুলিকে সঠিক ভাবে শনাক্ত করতে পারেন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ওই স্থানগুলি সম্পর্কে আরও ভাল ধারণা তৈরি হয়।