Advertisement

চিনের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের পাল্টা বিরাট বাঁধ নির্মাণ ভারতের, অথচ বিরোধিতা করছে দেশেরই জেন জি-রা

এই নদীর উপরেই বিশাল বাঁধ তৈরির পরিকল্পনা করেছে ভারত। প্রকল্পের প্রাথমিক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য NHPC-কে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয়দের একাংশের আশঙ্কা, এই সমীক্ষার অনুমতি দেওয়া হলে ভবিষ্যতে বাঁধ নির্মাণের পথ আরও প্রশস্ত হয়ে যাবে।

অরুণাচলে উত্তেজনা অরুণাচলে উত্তেজনা
Aajtak Bangla
  • দিল্লি,
  • 26 Oct 2026,
  • अपडेटेड 9:57 PM IST
  • তিব্বত থেকে উৎপন্ন সিয়াং নদী অরুণাচল প্রদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে
  • পরে অসমে ব্রহ্মপুত্র নামে পরিচিত এই নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে

চিনের ব্রহ্মপুত্র প্রকল্পের মোকাবিলায় কৌশলগত নিরাপত্তার হাতিয়ার হিসেবে ১১,২০০ মেগাওয়াটের সিয়াং বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে ভারত। কিন্তু কেন্দ্রের এই পরিকল্পনা ঘিরেই উত্তপ্ত অরুণাচল প্রদেশ। কারণ প্রস্তাবিত বাঁধের বিরোধিতায় পথে নেমেছে স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায় এবং জেন জিরা। গত ২৩ অক্টোবর, শুক্রবার, সেই বিক্ষোভ হিংসাত্মক রূপ নেয়। স্থানীয় নেতাদের বাড়ি, একটি পুলিশ স্টেশন এবং সরকারি সংস্থা ন্যাশনাল হাইড্রোইলেকট্রিক পাওয়ার কর্পোরেশন (NHPC)-এর দফতরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলাকায় মোতায়েন করা হয় কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী।

কেন এই বাঁধ তৈরি করতে চাইছে ভারত? আর কেনই বা তার বিরোধিতায় সরব স্থানীয় বাসিন্দা থেকে জেন জি? স্থানীয় সাংবাদিকরা জানিয়েছেন,  চিনের জলপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের আশঙ্কার পাশাপাশি জমি, জীবিকা ও সাংস্কৃতিক পরিচয় হারানোর আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। আবার মহিলা বিক্ষোভকারীদের উপর পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করার জেরে তরুণ প্রজন্মও ক্ষুব্ধ হয়। আর তাই বিক্ষোভের আগুনে হাওয়া দেয়।।

কোথায় তৈরি হওয়ার কথা এই বাঁধ?

অরুণাচল প্রদেশের পূর্ব সিয়াং জেলায় প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের নাম সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রজেক্ট (SUMP)। প্রায় ১১,২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতাসম্পন্ন এই বহুমুখী প্রকল্পের লক্ষ্য শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, জলপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ এবং ভারতের জলনিরাপত্তা জোরদার করাও।

তিব্বত থেকে উৎপন্ন সিয়াং নদী অরুণাচল প্রদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। পরে অসমে ব্রহ্মপুত্র নামে পরিচিত এই নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। নদীটি স্থানীয় আদি সম্প্রদায়ের কাছে শুধু জলের উৎস নয়, তাদের জীবনযাত্রা, জীবিকা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও অবিচ্ছেদ্য অংশ।

এই নদীর উপরেই বিশাল বাঁধ তৈরির পরিকল্পনা করেছে ভারত। প্রকল্পের প্রাথমিক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য NHPC-কে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয়দের একাংশের আশঙ্কা, এই সমীক্ষার অনুমতি দেওয়া হলে ভবিষ্যতে বাঁধ নির্মাণের পথ আরও প্রশস্ত হয়ে যাবে।

চিনের বাঁধের মোকাবিলায় ভারতের কৌশল কী?

Advertisement

সিয়াং বাঁধ নিয়ে ভারতের উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে চিনের তিব্বতে ব্রহ্মপুত্রের উপর তৈরি হতে থাকা বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। তিব্বতে ব্রহ্মপুত্র নদী পরিচিত ইয়ারলুং সাংপো নামে। এই নদী পূর্ব দিকে প্রবাহিত হওয়ার পর দক্ষিণ দিকে বাঁক নিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছে। অরুণাচল প্রদেশে নদীটি সিয়াং বা দিহাং নামে পরিচিত।

২০২৫ সালের জুলাইয়ে চিন তিব্বতের মেডং কাউন্টিতে একটি বৃহৎ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণ শুরু করে। প্রকল্পটির সম্ভাব্য বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৬০,০০০ মেগাওয়াট। সম্পূর্ণ হলে এটি বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ প্রকল্প হয়ে উঠতে পারে।

আসলে নদীর উজানে থাকা কোনও দেশ জলপ্রবাহের পরিমাণ ও সময়কে প্রভাবিত করতে পারলে ভাটির দেশগুলির উপর তার প্রভাব পড়তে পারে। চিনের প্রকল্প ঘিরে ভারতের উদ্বেগও সেখানেই। বিশেষজ্ঞদের একাংশের আশঙ্কা, জলপ্রবাহের পরিবর্তন, জল অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া কিংবা অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ জল ছাড়ার মতো পরিস্থিতি ভাটির অঞ্চলে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও জলনিরাপত্তার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে সিয়াং নদীর উপর ভারতের প্রস্তাবিত বাঁধকে কৌশলগত জলভাণ্ডার হিসেবে দেখছে কেন্দ্র। সরকারের যুক্তি, পর্যাপ্ত জল সঞ্চয় করে প্রয়োজন অনুযায়ী নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা গেলে সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় সুবিধা হবে।

অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডুর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত SUMP-এর লাইভ স্টোরেজ ক্ষমতা প্রায় ৯.২ বিলিয়ন ঘনমিটার। অন্যদিকে, চিনের মেডং প্রকল্পের সম্ভাব্য জল সঞ্চয়ের ক্ষমতা প্রায় ৫.৫ বিলিয়ন ঘনমিটার বলে দাবি করা হয়েছে। 

কেন বিরোধিতা করছেন স্থানীয় আদি সম্প্রদায়ের মানুষ?

কেন্দ্রের কাছে সিয়াং প্রকল্প জলনিরাপত্তা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা। কিন্তু স্থানীয় আদি সম্প্রদায়ের একাংশের কাছে এই প্রকল্পই অস্তিত্বের সঙ্কট তৈরি করতে পারে। তাঁদের আশঙ্কা, বিশাল জলাধার তৈরি হলে বিস্তীর্ণ এলাকা জলের তলায় চলে যেতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বসতি, কৃষিজমি, জীবিকা এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। নদীকে তাঁরা শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে দেখেন না, বরং নিজেদের জীবন ও সমাজব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত বলে মনে করেন।

ইটানগরের সাংবাদিক টংগাম রিনার মতে, সিয়াং নদীকে ঘিরে প্রকল্পের বিরোধিতা প্রায় চার দশক ধরে চলছে। সাম্প্রতিক প্রস্তাবিত বাঁধকে কেন্দ্র করে গত তিন বছরে সেই আন্দোলন আরও তীব্র হয়েছে।

'অরুণাচল টাইমস'-এর সঙ্গে যুক্ত সাংবাদিক রিনা জানিয়েছেন, মহিলা বিক্ষোভকারীদের উপর পুলিশের কাঁদানে গ্যাস ব্যবহারের ঘটনায় জেন জি-র মধ্যে ক্ষোভ বেড়েছে। অর্থাৎ, এই আন্দোলনে তরুণ প্রজন্মের অসন্তোষের পিছনে শুধু বাঁধের পরিবেশগত প্রভাব নয়, বিক্ষোভ মোকাবিলায় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

রিনার বক্তব্য, স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করেন, নদীর চরিত্র ও তার সঙ্গে জড়িত ঝুঁকি সম্পর্কে তাঁদের অভিজ্ঞতা বাইরের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের তুলনায় অনেক বেশি। বাঁধের বিরোধিতা করলেই কাউকে দেশবিরোধী বলে দাগিয়ে দেওয়ার প্রবণতাও মানুষের ক্ষোভ বাড়িয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি।

সমীক্ষা নিয়েই কেন এত আপত্তি?

সিয়াং বাঁধ নিয়ে বিরোধের অন্যতম প্রধান কারণ প্রকল্পের প্রাথমিক সম্ভাব্যতা প্রতিবেদন বা প্রি-ফিজিবিলিটি রিপোর্ট (PFR)। সরকারের বক্তব্য, এই সমীক্ষার মাধ্যমে প্রকল্পটি প্রযুক্তিগত ও ভূতাত্ত্বিক দিক থেকে বাস্তবসম্মত কি না, তা যাচাই করা হবে। সম্ভাব্য নির্মাণস্থল, ভূমিকম্পের ঝুঁকি এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হবে।

কিন্তু আন্দোলনকারীদের আশঙ্কা, সমীক্ষার অনুমতি দেওয়া হলে পরবর্তী সময়ে প্রকল্পটি বাতিল করা আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে। তাঁদের মতে, কোনও প্রকল্পের প্রাথমিক পর্যায়ে সম্মতি পাওয়া মানেই স্থানীয় মানুষের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

সিয়াং ইন্ডিজেনাস ফার্মার্স ফোরাম (SIFF) এবং আদি সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সংগঠন দাবি করেছে, প্রকল্প নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে গ্রামবাসী, প্রথাগত সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা জরুরি। কিছু পরিবারের স্বাক্ষরকে গোটা গ্রামের সম্মতি হিসেবে দেখানোর বিরুদ্ধেও আপত্তি রয়েছে তাঁদের।

Advertisement

আদি বানে কেবাং নামে স্থানীয় সম্প্রদায়ের একটি প্রধান সংগঠন এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে। তাদের দাবি, সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রজেক্ট বাতিল করতে হবে এবং প্রাথমিক সম্ভাব্যতা প্রতিবেদন খারিজ করতে হবে।

মুখ্যমন্ত্রীর আশ্বাসেও কাটছে না ক্ষোভ

মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডু একাধিকবার জানিয়েছেন, সিয়াং বাঁধ নির্মাণ নিয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নে প্রকল্পটি উপযুক্ত বলে বিবেচিত না হলে সরকার এগোবে না বলেও আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।

খান্ডুর বক্তব্য, প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাবের মূল্যায়ন, বিস্তারিত প্রকল্প প্রতিবেদন, প্রয়োজনীয় আইনি অনুমোদন এবং ক্ষতিগ্রস্ত সম্প্রদায়ের সঙ্গে আলোচনা বাধ্যতামূলক। প্রকল্প নিয়ে ভুল তথ্য ও ভ্রান্ত ধারণা মানুষের মনে আতঙ্ক তৈরি করছে বলেও দাবি করেছেন তিনি।

তবে সেই আশ্বাসে আন্দোলনকারীদের উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি। গত ৩০ সেপ্টেম্বর উচ্চ সিয়াং জেলার ইয়িংকিয়ংয়ে মুখ্যমন্ত্রী পৌঁছলে বাঁধবিরোধী বিক্ষোভকারীরা তাঁর কনভয় আটকে দেন বলে জানা গিয়েছে। তাঁদের মূল দাবি, প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে স্থানীয় মানুষের মতামতকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে।

উন্নয়ন বনাম অস্তিত্বের লড়াই

সিয়াং বাঁধ বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে দুটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। কেন্দ্রের যুক্তি, চিনের বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলা, জলপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ভারতেরও শক্তিশালী পরিকাঠামো প্রয়োজন। প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে উত্তর-পূর্ব ও পূর্ব ভারতের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি অরুণাচল প্রদেশে পরিকাঠামো ও অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরির সম্ভাবনাও রয়েছে।

অন্যদিকে, স্থানীয় বাসিন্দা ও আন্দোলনকারীদের প্রশ্ন, জাতীয় নিরাপত্তা ও উন্নয়নের যুক্তিতে তাঁদের জমি, জীবিকা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ঝুঁকি কতটা বিবেচনা করা হচ্ছে? তাঁদের আশঙ্কা, নদীর উপর বিশাল বাঁধ তৈরি হলে তার দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব সামলানো কঠিন হতে পারে।

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, জেন জি-র ক্ষোভও এই আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। বিশেষ করে মহিলা বিক্ষোভকারীদের উপর কাঁদানে গ্যাস ব্যবহারের ঘটনা তরুণদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়িয়েছে বলে স্থানীয় সাংবাদিকের দাবি। ফলে সিয়াং বাঁধের বিরোধিতা এখন শুধু পরিবেশ বা জমি রক্ষার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্থানীয় মানুষের সম্মতি, প্রতিবাদের অধিকার এবং প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক।
 

Read more!
Advertisement
Advertisement