
Indian Massage Therapist Jailed Australia: সুদূর অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেড থেকে শিউরে ওঠার মতো ঘটনা সামনে এসেছে। এক-আধজন নয়, একে একে ৬১ জন মহিলার ওপর চরম যৌন নির্যাতন ও গোপনে আপত্তিকর ছবি তোলার অভিযোগে এক ভারতীয় বংশোদ্ভূত মাসাজ থেরাপিস্টকে ১৩ বছর ১০ মাসের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করল সাউথ অস্ট্রেলিয়ার জেলা আদালত। আদালতের বিচারপতি কারমেন মাতেও অপরাধীর এই আচরণকে ‘নিয়ন্ত্রণহীন’ এবং ‘শোষণমূলক’ বলে তীব্র ভর্ৎসনা করেছেন।
দিল্লির বাসিন্দা ৩৯ বছর বয়সী সুমিত সতীশ রাস্তোগি ২০১১ সালে ভাগ্য অন্বেষণে পাড়ি জমিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডে। সেখানে গ্লেনেলগের এক মাসাজ পার্লারে কাজ শুরু করেন তিনি। তবে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই কাজের জন্য সুমিতের কোনও প্রথাগত বা বৈধ যোগ্যতাই ছিল না। বিনা যোগ্যতায় অবলীলায় চলছিল তার এই ব্যবসা। আর সেই মাসাজ পার্লারের চার দেওয়ালের আড়ালেই ২০২১ সালের অক্টোবর থেকে ২০২২ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত, মাত্র ৯ মাসের মধ্যে একের পর এক ঘৃণ্য অপরাধ ঘটিয়ে চলে সে।
অবশেষে ২০২২ সালের জুলাই মাসে পুলিশের জালে ধরা পড়ে সুমিত। আদালতে তার বিরুদ্ধে মোট ৯৭টি অপরাধের মামলা দায়ের করা হয়। যার মধ্যে রয়েছে ৪২টি গুরুতর যৌন নির্যাতন (Aggravated Indecent Assault) এবং ৫৫টি গোপনে আপত্তিকর ভিডিও ও ছবি তোলার (Indecent Filming) অভিযোগ। আদালতে নিজের সমস্ত অপরাধ কবুল করেছে এই ভারতীয় বংশোদ্ভূত যুবক।
ধীরে ধীরে বাড়ছিল সাহস, লাগামহীন হয়ে ওঠে বিকৃতি
গত শুক্রবার মামলার তিন ঘণ্টার দীর্ঘ রায়দান পর্বে বিচারপতি কারমেন মাতেও জানান, সুমিতের এই অপরাধ ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং নিয়মিত। সুমিতকে তীব্র কটাক্ষ করে বিচারপতি বলেন, “আপনার কাছে যে মহিলারা আসতেন, তাঁরা সম্পূর্ণ বিশ্বাস নিয়ে আসতেন। তাঁদের নিরাপত্তা ও সম্মান পাওয়ার অধিকার ছিল। কিন্তু আপনি সেই বিশ্বাসের চরম সুযোগ নিয়েছেন।”
তদন্তে জানা গেছে, প্রথম দিকে সুমিতের অপরাধের মাত্রা কিছুটা কম থাকলেও, সময় বাড়ার সাথে সাথে তার সাহস ও আত্মবিশ্বাস বাড়তে থাকে। একসময় সে গ্রাহকদের অন্তর্বাসে হাত দেওয়া এবং গোপনে তাঁদের আপত্তিকর ছবি তুলতে শুরু করে। বিচারপতির ভাষায়, ২০২২ সালের জুন ও জুলাই মাসের দিকে সুমিতের এই বিকৃত আচরণ সম্পূর্ণ ‘নিয়ন্ত্রণহীন’ হয়ে পড়েছিল। ধরা না পড়া পর্যন্ত সে থামার কোনো লক্ষণই দেখায়নি।
হানিমুনের আনন্দ বদলে গেল দুঃস্বপ্নে: ট্রমা কাটছে না পিয়াসীদের
সুমিতের এই লালসার শিকার হয়ে মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছেন বহু মহিলা। আদালতে নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা জানাতে গিয়ে চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি অনেকেই। এক নির্যাতিতা মহিলা জানান, তিনি তাঁর জীবনের অন্যতম সেরা মুহূর্ত—'হানিমুন' কাটাতে সেখানে গিয়েছিলেন। কিন্তু সুমিতের সেই কুকীর্তি তাঁর জীবনের সবচেয়ে সুখের দিনগুলোকে একটা ভয়ঙ্কর ও তাড়া করে বেড়ানো দুঃস্বপ্নে পরিণত করে দিয়েছে। এখন তিনি কোনো পুরুষ চিকিৎসক বা ফিজিওথেরাপিস্টকেও বিশ্বাস করতে পারেন না। এমনকি তাঁর দাম্পত্য জীবনেও এর গভীর প্রভাব পড়েছে।
অন্য এক নির্যাতিতা ক্ষোভ উগরে দিয়ে জানান, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘ বিলম্ব তাঁদের ক্ষতকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ঘটনার পর ১২৭১ দিন কেটে গেলেও আইনি জটিলতার কারণে তাঁরা সঠিক থেরাপি বা মানসিক চিকিৎসা শুরু করতে পারছিলেন না। আদালতের বাইরে এসে দুই নির্যাতিতা অন্য মহিলাদের উদ্দেশে বার্তা দিয়ে বলেন, “যদি কোনো পরিস্থিতি আপনার ঠিক মনে না হয়, তবে জানবেন সেখানে সত্যিই কোনো গলদ আছে। চুপ থাকবেন না।” সুমিতের ক্ষমাপ্রার্থনাকে ‘অজুহাতে ভরা’ বলে তারা উড়িয়ে দেন।
মানসিক রোগ নাকি স্রেফ অপরাধ?
মামলার শুনানিতে জানা যায়, একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ সুমিতকে পরীক্ষা করে জানিয়েছেন যে সে ‘ভয়ারিস্টিক ডিসঅর্ডার’ (Voyeuristic Disorder) নামক এক মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা গোপনে অর্ধনগ্ন মহিলাদের দেখে যৌন উত্তেজনা লাভ করে। তবে বিচারপতি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, এই রোগ কোনোভাবেই সুমিতের অপরাধের তীব্রতা কমাতে পারে না। উপরন্তু, এই রোগের কোনো চিকিৎসা এখনও হয়নি এবং জেল খাটার সময়ও এর কোনো চিকিৎসা সম্ভব নয়।
সুমিতের আইনজীবী অ্যাডাম রিচার্ডস আদালতে জানান, সুমিত নিজের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত এবং সে নিজেই নিজেকে ক্ষমা করতে পারছে না। আদালত সুমিতকে ১৩ বছর ১০ মাসের সাজা শুনিয়েছে, যার মধ্যে প্রথম ১০ বছর ১০ মাস কোনো প্যারোল (শর্তাধীন মুক্তি) মিলবে না। ২০২২ সালের জুলাই থেকে এই সাজার মেয়াদ গণনা শুরু হওয়ায় ২০৩৫ সালে সে প্রথম প্যারোলের আবেদন করতে পারবে। তবে সাজা শেষ হতেই অস্ট্রেলিয়া সরকার তাকে ভারত ফেরত (Deport) পাঠিয়ে দেবে বলে আদালত সূত্রে জানা গিয়েছে।