
একটু মৌমাছির ভনভন। একটু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানে AI। আর তাতেই প্রাণ বাঁচল ২৫৫টি হাতির। প্ল্যান এ যখন কাজে এল না, তখন প্ল্যান Bee-তেই বাজিমাত। ভাবছেন Plan Bee টাইপিং মিসটেক! একদম নয়। Bee মানে মৌমাছিকে কাজে লাগিয়েই ট্রেনের সঙ্গে হাতির সংঘর্ষ রোখা হল। AI নির্ভর প্রযুক্তি এবং Plan Bee কাজে লাগিয়ে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২৫৫টি হাতিকে রক্ষা করেছে নর্থ ইস্ট ফ্রন্টিয়ার রেলওয়ে (NFR)। পুরো কাহিনিটা জানলে অবাক হবেন। চলুন জেনে নেওয়া যাক।
জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যাওয়া রেললাইনে প্রায়ই হাতির পাল চলে আসে। ট্রেনের সঙ্গে সংঘর্ষ হলে একসঙ্গে একাধিক হাতির মৃত্যু ঘটে। এই ধরনের দুর্ঘটনা রুখতে বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হলেও সমস্যা পুরোপুরি মেটেনি। নর্থ ফ্রন্টিয়ার রেলের মুখপাত্র কপিঞ্জল কিশোর শর্মা জানালেন, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে সময়মতো পদক্ষেপ করে মোট ২৫৫টি হাতিকে ট্রেনের ধাক্কা থেকে রক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আলিপুরদুয়ার ডিভিশনে ১০৬টি, রঙ্গিয়া ডিভিশনে ১৪টি, লামডিংয়ে ১২২টি এবং তিনসুকিয়ায় ১৫টি হাতি। AI নির্ভর প্রযুক্তি, ট্রেনের গতি নিয়ন্ত্রণ, বাড়তি নজরদারি এবং বন দফতরের সঙ্গে সমন্বয় রেখেই এসেছে এই সাফল্য।
মৌমাছিকে কেন ভয় হাতির?
বিশালদেহী হাতির কাছে ছোট্ট মৌমাছির ভনভন শব্দই অস্বস্তির কারণ। হাতির চামড়া বেশ মোটা হলেও চোখের চারপাশ, কানের পিছনের অংশ এবং শুঁড়ের ভিতরের অংশ তুলনামূলকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল। মৌমাছির ঝাঁক ওই সব জায়গায় আক্রমণ করলে হাতির সমস্যা হয়। ফলে মৌমাছির গুঞ্জনকে ভয় পায় হাতি। দূর থেকেই মৌমাছির ঝাঁকের ভনভন শব্দ শুনতে পেলে অনেক সময় হাতি সেই এলাকা থেকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করে। শুঁড় দিয়ে ধুলো উড়িয়েও নিজেদের রক্ষা করার চেষ্টা করে সে।
আফ্রিকার কৌশল ভারতে
মৌমাছি নিয়ে হাতির ভয়কেই কাজে লাগানো হচ্ছে Plan Bee। হাতিকে মৌমাছির শব্দের মাধ্যমে ভয় দেখিয়ে ফসলের জমি থেকে দূরে রাখার কৌশল বের করেছে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং সেভ দ্য এলিফ্যান্টস নামে একটি সংস্থার গবেষণা। এই পদ্ধতিতে চাষের জমির চারপাশে মৌমাছির বাক্স রাখা হয়। হাতি সেই এলাকায় ঢোকার চেষ্টা করলে দড়ির টানে বাক্স নড়ে যায়। বেরিয়ে আসে মৌমাছির ঝাঁক। মৌমাছির গুঞ্জন ও সম্ভাব্য আক্রমণের আশঙ্কায় হাতি ফসলের ক্ষতি না করে ফের জঙ্গলের দিকে চলে যায়। আফ্রিকায় মানুষ ও হাতির সংঘাত কমাতেও এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে।
আসল মৌমাছি নয়
এখন প্রযুক্তির যুগ। তাই রেললাইনের ধারে সত্যিকারের মৌমাছির বাক্স বসিয়ে রাখার বদলে প্রযুক্তির সাহায্যেই তৈরি করা হয়েছে মৌমাছির গুঞ্জনের শব্দ। হাতির গতিবিধি শনাক্ত করতে রেল ব্যবহার করছে এআই নির্ভর প্রযুক্তি। এর মাধ্যমে রেললাইনের আশপাশে হাতির উপস্থিতি শনাক্ত করে লোকো পাইলট, স্টেশন মাস্টার এবং কন্ট্রোলরুমে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়।
কীভাবে কাজ করে প্রযুক্তি?
রেললাইনের পাশে থাকা অপটিক্যাল ফাইবারকে এক ধরনের সেন্সর হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ফাইবারের আশপাশে কোনও প্রাণীর চলাচল, কম্পন বা শব্দের মতো পরিবর্তন ঘটলে সেটি শনাক্ত করা সম্ভব। হাতির চলাফেরার নির্দিষ্ট কম্পন চিহ্নিত করে এআই নির্ভর প্রযুক্তি। হাতির উপস্থিতি বোঝা গেলেই সংশ্লিষ্ট রেলকর্মী এবং ট্রেনের চালককে দ্রুত সতর্ক করা হয়। ফলে ট্রেনের গতি কমানো বা প্রয়োজন হলে থামানোর মতো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়।
শুধু সতর্কবার্তা পাঠিয়েই থেমে থাকছে না রেল। গুরুত্বপূর্ণ হাতি করিডরগুলিতে বসানো হয়েছে 'Plan Bee'। সেখানে হাতির কাছে মৌমাছির ঝাঁকের গুঞ্জনের মতো শব্দ পৌঁছে দেওয়া হয়। হাতি সেই শব্দ শুনে রেললাইন থেকে দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টা করে। অর্থাৎ এক দিকে এআই আগেভাগে হাতির উপস্থিতি শনাক্ত করছে, অন্যদিকে মৌমাছির গুঞ্জনের কৃত্রিম শব্দ হাতিকে রেললাইন থেকে সরিয়ে দিচ্ছে।