
১৯৭৭ সালের লোকসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর একবার ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন, 'দুঃখ বৃত্তের মতো আসে, তাকে মাদুরের মতো গুটিয়ে রাখা যায় না।' তাঁর জীবন লেখক পপুল জয়করের মতে, ক্ষমতা হারানোর পর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের একের পর এক সরে যাওয়া তাঁকে গভীরভাবে আঘাত করেছিল। কিন্তু ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাস বলছে, দু'বার কংগ্রেস থেকে কার্যত বহিষ্কৃত হয়েও ইন্দিরা গান্ধী আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে এসেছিলেন।
বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে যে টানাপোড়েন চলছে, তার জেরে অনেকের মনেই ফিরে আসছে ইন্দিরা গান্ধীর সেই রাজনৈতিক লড়াইয়ের স্মৃতি। যদিও দুই সময়, দুই দল এবং দুই নেত্রীর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ আলাদা, তবুও মিল খুঁজছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
দু'বার দল হারিয়েও ফিরে এসেছিলেন ইন্দিরা
১৯৬৯ সালে প্রথমবার কংগ্রেসের শক্তিশালী পুরনো নেতৃত্বের সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন ইন্দিরা গান্ধী। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী নীলম সঞ্জীব রেড্ডির পরিবর্তে তিনি সমর্থন করেন তৎকালীন উপরাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরিকে। তিনি সাংসদ ও বিধায়কদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার আবেদন জানান। শেষ পর্যন্ত ভি ভি গিরির জয় হয়। রপর কংগ্রেস সভাপতি এস নিজালিঙ্গাপ্পা ইন্দিরা গান্ধীকে দল থেকে বহিষ্কার করেন। কংগ্রেস ভেঙে তৈরি হয় কংগ্রেস (আর) এবং কংগ্রেস (ও)।
জনসমর্থনই ছিল সবচেয়ে বড় অস্ত্র
দলীয় বিরোধিতার মুখে পিছিয়ে না গিয়ে ইন্দিরা গান্ধী নিজেকে সাধারণ মানুষের নেত্রী হিসেবে তুলে ধরেন। ১৯৬৯ সালে ১৪টি বড় ব্যাঙ্ক জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত তাঁকে নতুন রাজনৈতিক উচ্চতায় নিয়ে যায়। পরে বামপন্থী দল এবং DMK-র সমর্থনে তিনি সরকার টিকিয়ে রাখেন। ১৯৭১ সালের লোকসভা নির্বাচনে 'গরিবি হটাও' স্লোগানকে সামনে রেখে তিনি কার্যত ব্যক্তিগত লড়াইয়ে নেমে পড়েন। সেই নির্বাচনে কংগ্রেস (আর) বিপুল জয় পায়।
জরুরি অবস্থার পর দ্বিতীয়বার সঙ্কট
১৯৭৭ সালে জরুরি অবস্থার পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধীর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় পরাজয় আসে। জনতা পার্টি ক্ষমতায় আসে এবং কংগ্রেসের একাংশ মনে করতে শুরু করে, ইন্দিরাকে সরিয়ে না দিলে দল ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না।
পুপুল জয়কর লিখেছেন, এই সময় ইন্দিরা গান্ধী নিজেকে প্রবল বিশ্বাসঘাতকতার শিকার বলে মনে করেছিলেন। অনেক পুরনো সহকর্মী তাঁকে ছেড়ে চলে যান। দলীয় নেতৃত্বের সমর্থন না থাকলেও দেশজুড়ে তাঁর জনসভাগুলিতে বিপুল ভিড় হতে থাকে। বিশেষ করে বিহারের বেলচি সফর তাঁর রাজনৈতিক ভাবমূর্তিকে নতুন করে শক্তিশালী করে তোলে। বন্যাকবলিত এলাকায় হাতির পিঠে চড়ে দলিত নির্যাতনের শিকার মানুষদের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া সাধারণ মানুষের কাছে তাঁকে আবারও জননেত্রীর আসনে বসিয়ে দেয়।
১৯৭৮ সালে আবার বহিষ্কার, আবার নতুন দল
১৯৭৮ সালের জানুয়ারিতে ইন্দিরা অনুগামীরা দিল্লিতে 'ন্যাশনাল কনভেনশন অফ কংগ্রেসম্যান' আয়োজন করে তাঁকে কংগ্রেস সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত করেন। এর জবাবে তৎকালীন কংগ্রেস নেতৃত্ব তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করে। এরপর গঠিত হয় কংগ্রেস (আই), যেখানে 'আই' মানে ইন্দিরা।
প্রথম দিকে এটি ছিল বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি। কিন্তু মাত্র দু'বছরের মধ্যেই পরিস্থিতি বদলে যায়। ১৯৮০ সালের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস (আই) ক্ষমতায় ফিরে আসে এবং ইন্দিরা গান্ধী আবার দেশের প্রধানমন্ত্রী হন। প্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেস গোষ্ঠীগুলি ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারায়।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তুলনা কেন?
বর্তমানে তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে ভাঙনের জল্পনা, বিদ্রোহী গোষ্ঠীর উত্থান এবং দলের নাম ও প্রতীক নিয়ে সম্ভাব্য টানাপোড়েনের খবরে অনেকেই ইন্দিরা গান্ধীর সেই রাজনৈতিক লড়াইয়ের সঙ্গে তুলনা টানছেন। যদিও রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দুই পরিস্থিতির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে এবং সরাসরি তুলনা করা ঠিক হবে না।
তবে ইতিহাস একটাই শিক্ষা দেয়, কোনও জনপ্রিয় নেতার হাতে দলীয় সংগঠন না থাকলেও, যদি জনসমর্থন অটুট থাকে, তাহলে রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের পথ কখনও পুরোপুরি বন্ধ হয় না। ইন্দিরা গান্ধীর জীবনের দুই অধ্যায় সেই কথাই প্রমাণ করে, যেখানে বিশ্বাসঘাতকতা, দল থেকে বহিষ্কার এবং রাজনৈতিক ভাবে একঘরে হয়ে যাওয়ার পরও তিনি দু'বার নতুন করে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন।