
১৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় উত্তর আরব সাগরে ভারত ও পাকিস্তানের নৌবাহিনীর দু’টি জাহাজের মধ্যে সংঘর্ষ। তবে এই ঘটনার পর সবচেয়ে বেশি আলোচনা শুরু হয়েছে দু’টি জাহাজের শক্তি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিয়ে। এমনও দাবি করা হচ্ছে, পাকিস্তান ভুল জাহাজের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে। যে জাহাজটি বেছে নিয়েছিল, সেটি তুলনায় অনেকটাই ছোট ও কম ক্ষমতাসম্পন্ন। কোন জাহাজের কী বৈশিষ্ট্য, সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে জেনে নেওয়া যাক, ১৫ সেপ্টেম্বর ঠিক কী ঘটেছিল।
ভারতীয় জাহাজের পিছনে ধাওয়া করছিল পাকিস্তানের জাহাজ। ধীরে ধীরে দু'টি জাহাজের মধ্যে কমতে থাকে দূরত্ব। অভিযোগ, পাকিস্তানের জাহাজটি দ্রুত গতিতে এগিয়ে আসে। এরপরেই দু'টি জাহাজের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। ভারতীয় নৌবাহিনীর আইএনএস কলকাতা তখন আরব সাগরে রুটিন নজরদারিতে মোতায়েন ছিল। অন্যদিকে, পাকিস্তানের পিএনএস হুনাইন ‘সিকিউর ২৬’ (Seacure 26) নৌ-মহড়ায় অংশ নিয়েছিল।
ইন্ডিয়া টুডে-কে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক সন্দীপ উন্নীনাথন জানিয়েছেন, পিএনএস হুনাইনের ডিসপ্লেসমেন্ট প্রায় ২,৬০০ টন। অন্ দিকে, আইএনএস কলকাতার ফুল-লোড ডিসপ্লেসমেন্ট প্রায় ৭,৪০০ টন। অর্থাৎ ওজনের বিচারে আইএনএস কলকাতা পিএনএস হুনাইনের প্রায় ২.৮ গুণ ভারী। ফলে দু’টি জাহাজকে একই শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
পিএনএস হুনাইন কতটা শক্তিশালী?
পিএনএস হুনাইনের প্রযুক্তিগত বিষয় বোঝা জরুরি। ড্যামেন সংস্থার তৈরি OPV 2600 নকশার অফশোর পেট্রল ভেসেল হিসেবে এটি পাকিস্তান নৌবাহিনীর জন্য নির্মিত হয়েছিল। ড্যামেনের তথ্য অনুযায়ী, এই নকশার জাহাজের দৈর্ঘ্য ৯৮ মিটার, প্রস্থ ১৪.৬ মিটার এবং ওজন প্রায় ২,৬০০ টন। জাহাজটির সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় প্রায় ২২ থেকে ২৫ নট। ২০২৪ সালে পিএনএস হুনাইনকে পাকিস্তান নৌবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।
তবে পিএনএস হুনাইনকে শুধুই ছোট জাহাজ হিসেবে দেখাও ঠিক হবে না। OPV 2600 ডিজাইনটি দীর্ঘ সময় সমুদ্রে নজরদারি, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং বিভিন্ন ধরনের মিশনের জন্য তৈরি। ড্যামেনের তথ্য অনুযায়ী, এই নকশার জাহাজে সর্বোচ্চ ৭৬ মিমি ক্যালিবারের কামান বসানো যায়। মিশনের প্রয়োজন অনুযায়ী অ্যান্টি-সাবমেরিন ওয়ারফেয়ার, ইউএভি এবং অন্যান্য সরঞ্জামের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে হেলিকপ্টার ওড়ার সুবিধা।
কতটা শক্তিশালী আইএনএস কলকাতা?
আইএনএস কলকাতা ভারতীয় নৌবাহিনীর কলকাতা ক্লাসের গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার। এটি প্রজেক্ট ১৫এ-র অধীনে তৈরি প্রথম জাহাজ। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ১৬৪ মিটার। ওজন প্রায় ৭,৪০০ টন। এর সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ৩০ নটেরও বেশি। ২০১৪ সালের অগাস্টে আইএনএস কলকাতাকে ভারতীয় নৌবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
আইএনএস কলকাতার শুধু তার বিশাল আকারের নয়, এটি একটি গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার, যা আকাশ, সমুদ্রপৃষ্ঠ এবং জলের নীচের বিভিন্ন ধরনের হামলার মোকাবিলার জন্য একাধিক অস্ত্র ও সেন্সর দিয়ে সজ্জিত।
এতে রয়েছে দীর্ঘপাল্লার নজরদারির জন্য ব়্যাডার, এয়ার ডিফেন্স ও অ্যান্টি-শিপ মিসাইল ব্যবস্থা, বিভিন্ন ধরনের গান সিস্টেম এবং অ্যান্টি-সাবমেরিন ওয়ারফেয়ারের জন্য প্রয়োজনীয় সেন্সর ও অস্ত্র। পাশাপাশি দু'টি হেলিকপ্টার পরিচালনার ক্ষমতাও রয়েছে।
সংঘর্ষের ঘটনায় কী জানা যাচ্ছে?
ভারত ও পাকিস্তানের নৌবাহিনীর জাহাজের এই সংঘর্ষ এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন আরব সাগর এবং উত্তর ভারত মহাসাগর নৌ-নিরাপত্তা ও কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। ঘটনার পরে ভারত পাকিস্তানের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সকে তলব করে। সেখানে সমুদ্রে নিরাপত্তা প্রোটোকল নিয়ে বিষয়টি তোলা হয়। ১৯৯১ সালের ভারত-পাকিস্তান সামুদ্রিক চুক্তির কথাও মনে করানো হয়েছে ইসলামাবাদকে।