
রাজস্থানের জয়পুরে নীরজ শর্মা হত্যা মামলার তদন্তে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসছে। প্রথমে মনে করা হয়েছিল, সরকারি চাকরি ও সম্পত্তির লোভেই ২৪ বছরের আয়ুষী শর্মা তাঁর মাকে খুনের পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে উঠে এসেছে, বিষয়টি শুধু চাকরি বা সম্পত্তির নয়, বরং দীর্ঘদিনের পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও মায়ের প্রতি গভীর ক্ষোভও এই ঘটনার অন্যতম কারণ হতে পারে।
পুলিশের দাবি, জেরায় আয়ুষী মাকে হত্যার কথা স্বীকার করলেও তিনি জানান, ছোটবেলা থেকেই মায়ের আচরণের প্রতি তাঁর তীব্র বিরূপ মনোভাব তৈরি হয়েছিল। তাঁর অভিযোগ, পরিবারের মধ্যে মায়ের আচরণ ছিল অত্যন্ত রূঢ় এবং সেই কারণেই তিনি দীর্ঘদিন ধরে মানসিক ক্ষোভ পুষে রেখেছিলেন।
মোবাইলের ভিডিও ঘিরে নতুন প্রশ্ন
তদন্তে আয়ুষীর মোবাইল ফোন থেকে একাধিক ভিডিও উদ্ধার করেছে পুলিশ। তদন্তকারীদের দাবি, ওই ভিডিওগুলিতে নীরজ শর্মাকে তাঁর স্বামী বিজয় শর্মার সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও মারধর করতে দেখা যায়।
আয়ুষীর দাবি, এই ধরনের ঘটনা একবার নয়, বহুবার ঘটেছে। তাঁর অভিযোগ, বাবার উপর দীর্ঘদিনের নির্যাতনের জেরেই বিজয় শর্মার শারীরিক অবনতি ঘটে এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যু হয়। এই কারণেই তিনি মনে করতেন, বাবার চাকরি বা সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হওয়ার অধিকার তাঁর মায়ের থাকা উচিত নয়।
সরকারি চাকরি নিয়েও ছিল বিরোধ
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, বিজয় শর্মার মৃত্যুর পর তাঁর সরকারি চাকরিতে সহানুভূতিমূলক নিয়োগের আবেদন করেছিলেন আয়ুষী। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই চাকরি পান তাঁর মা নীরজ শর্মা। এরপর থেকেই মা-মেয়ের সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ।
পরিবারের সদস্যদের দাবি, আয়ুষী শুধু চাকরিই নয়, জয়পুরের দুটি বাড়ি এবং প্রায় ৫ বিঘা জমিসহ পরিবারের সম্পত্তিও নিজের নামে লিখিয়ে নিতে চাইছিলেন।
মামার বিস্ফোরক অভিযোগ
মামলায় নতুন মোড় এনে আয়ুষীর মামা রাকেশ কুমার শর্মা দাবি করেছেন, শুধু মাকেই নয়, এক বছর আগে নিজের বাবাকেও পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছিলেন আয়ুষী।
তাঁর অভিযোগ, ২০২৪ সালের শেষ দিকে অসুস্থ বিজয় শর্মাকে উন্নত চিকিৎসার নাম করে বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া হয়। পরিবারের অন্য সদস্যদের দীর্ঘদিন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। পরে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাঁকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয় এবং ২০২৫ সালের ২১ এপ্রিল তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর তড়িঘড়ি শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়ায় কোনও ময়নাতদন্তও হয়নি। মামার অভিযোগ, সেই সময় থেকেই তাঁর সন্দেহ হয়েছিল। তবে নীরজ শর্মার মৃত্যুর পর সেই সন্দেহ আরও জোরালো হয়েছে।
বলরামের ভূমিকা নিয়েও তদন্ত
পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, আয়ুষীর খুড়তুতো ভাই বলরামের ভূমিকাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পরিবারের একাংশের দাবি, বলরাম ও আয়ুষীর সম্পর্ক শুধু আত্মীয়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এমনকি বলরামের কাছে এমন কিছু ভিডিও ছিল, যা দিয়ে তিনি আয়ুষীকে ব্ল্যাকমেল করতেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। যদিও এই দাবির স্বাধীনভাবে কোনও সরকারি নিশ্চিতকরণ এখনও মেলেনি। বর্তমানে বলরাম পলাতক। তাঁকে খুঁজছে পুলিশ।
৩ জুলাই কী ঘটেছিল?
পুলিশের অভিযোগ, গত ৩ জুলাই নীরজ শর্মাকে হত্যা করতে ৭ লক্ষ টাকায় ভাড়াটে খুনি নিয়োগ করা হয়েছিল। ঘটনাটিকে প্রথমে সড়ক দুর্ঘটনা বলে দেখানোর চেষ্টা করা হলেও তদন্তে সেটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করা হয়েছে।
তদন্ত চলছে
জয়পুর পুলিশ জানিয়েছে, নীরজ শর্মা হত্যা মামলার পাশাপাশি বিজয় শর্মার মৃত্যুর ঘটনাও নতুন করে খতিয়ে দেখা হবে। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, উদ্ধার হওয়া ডিজিটাল প্রমাণ এবং অন্যান্য তথ্যের ভিত্তিতে তদন্তের পরিধি আরও বাড়ানো হয়েছে।