
যন্তর মন্তর। গত কয়েকদিন ধরে এই নামটা আপনারা শুনছেন। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রে প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরার অন্যতম ঠিকানা যন্তর মন্তর। দিল্লির এই দীর্ঘ, ছায়াঘেরা রাস্তা আজও নানা আন্দোলন ও বিক্ষোভের সাক্ষী। কখনও মাথায় এসেছে, যন্তর মন্তর জায়গাটা আসলে কী? কেনই বা যন্তর মন্তর নাম? যন্তর মন্তর শুধু বিক্ষোভ দেখানোর জায়গা নয়। বরং কয়েক শতাব্দী আগে বৈজ্ঞানিক চিন্তার ফসল। সেই কাহিনিই আজ জানাব আপনাদের।
দিল্লির যন্তর মন্তর কোনও সমাধি নয়, মন্দিরও নয়। এখানে মুঘল স্থাপত্যের চেনা অলঙ্করণ নেই, নেই হিন্দু মন্দিরের ধর্মীয় প্রতীক। মাথার উপরে গম্বুজ নেই, নেই কারুকাজও। স্থাপত্যের দিক থেকে দেখলে, ভারতীয় উপমহাদেশের প্রচলিত নির্মাণশৈলীর সঙ্গে এই স্মৃতিসৌধের পার্থক্য রয়েছে। লাল চুনের প্রলেপ দেওয়া এই স্থাপত্যের গঠন জ্যামিতিক। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, এটি যেন নিজের সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকা কোনও নির্মাণ, মধ্যযুগীয় স্থাপত্যের বদলে আধুনিক স্থাপত্যের নিদর্শন।
কে নির্মাণ করেছিলেন যন্তর মন্তর?
আমেরের রাজপুত শাসক দ্বিতীয় সওয়াই জয় সিংহ যে পাঁচটি মানমন্দির বা অবজার্ভেটরি নির্মাণ করিয়েছিলেন, দিল্লির যন্তর মন্তর ছিল তার মধ্যে প্রথম। পরে জয়পুর, উজ্জয়িনী, বারাণসী ও মথুরাতেও এমন মানমন্দির তৈরি করা হয়। সহজ ভাষায় গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থান দেখার জায়গা। দিল্লির যন্তর মন্তরের নির্মাণকাজ শেষ হয় ১৭২৪ সালে। শাহজাহানাবাদের দক্ষিণে এটি নির্মাণ করা হয়েছিল। তৎকালীন মুঘল সম্রাটের জন্য উপহার হিসাবেও এই স্থাপনাকে দেখা হয়।
কিছু গবেষকের মতে, যন্তর মন্তর ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানের ঐতিহ্যের অংশ। অন্যদের মতে, এর সঙ্গে সমরকন্দের মানমন্দির এবং ইসলামি জ্যোতির্বিজ্ঞানের ধারার যোগ রয়েছে। আবার কয়েক জন গবেষক এর মধ্যে ইউরোপীয় প্রভাবও দেখতে পান।
যন্তর মন্তরের অর্থ কী?
বর্তমানে প্রচলিত 'যন্তর' শব্দটি সম্ভবত 'যন্ত্র'। সংস্কৃত থেকে আসা এই শব্দের অর্থ জ্যোতির্বিজ্ঞানের কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি। আর 'মন্তর' সম্ভবত 'মন্ত্র'। আরও একটি মত হল ছন্দ মেলানোর জন্য জুড়ে দেওয়া হতে পারে মন্তর। ১৮০৩ সালে এই জায়গা পরিদর্শন করেছিলেন মেজর উইলিয়াম থার্ড। তাঁর বিবরণে এই নামের উল্লেখ রয়েছে। তা থেকে অনুমান করা হয়, যন্তর মন্তর নামটি সম্ভবত প্রথমে দিল্লিতেই স্থানীয়ভাবে প্রচলিত হয়েছিল। পরে জয়পুর, উজ্জয়িনী, মথুরা ও বারাণসীর অন্যান্য মানমন্দিরের ক্ষেত্রেও এই নাম ব্যবহৃত হতে শুরু করে।
হিন্দু-মুসলিম জ্যোতিষীদের মতানৈক্য
দিল্লির যন্তর মন্তর নির্মাণের কাহিনি জড়িয়ে রয়েছে ১৭১৯ সালে মুঘল দরবারে ঘটে যাওয়া একটি বিতর্কের সঙ্গে। সে সময়ে হিন্দু ও মুসলিম জ্যোতিষীরা একমত হতে পারছিলেন না, সম্রাট মহম্মদ শাহের একটি সামরিক অভিযানে রওনা হওয়ার জন্য কোন দিনটি সবচেয়ে শুভ। এই ঘটনার কেন্দ্রে ছিলেন দ্বিতীয় সওয়াই জয় সিং। জ্যোতির্বিজ্ঞান ও গণিতের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। তাঁর ধারণা ছিল, সে সময়ে ব্যবহৃত ছোট ছোট যন্ত্র দিয়ে যথেষ্ট নির্ভুল পরিমাপ করা সম্ভব নয়। সেই ভাবনা থেকেই তাঁর মাথায় একটি বড় মানমন্দির তৈরির পরিকল্পনা আসে।
সম্রাটের অনুমতি
সম্রাট মহম্মদ শাহের কাছে মানমন্দির নির্মাণের অনুমতি চান তিনি। কিন্তু প্রশ্ন হল, রাজধানীর মধ্যে এত বড় ও বিশাল একটি মানমন্দির তৈরির অনুমতি কেন দিয়েছিলেন সম্রাট তাঁর অধীনস্থ এক রাজাকে? দিল্লিতে মানমন্দির নির্মাণের পরিকল্পনাকে এভাবেও ব্যাখ্যা করা যায় যে সরাসরি মুঘল শাসনকে চ্যালেঞ্জ না জানিয়েও বিজ্ঞানের মাধ্যমে নিজের মর্যাদা ও প্রভাবকে রাজ্যের সীমানার বাইরে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন জয় সিং।
অন্য দিকে, সম্রাটেরও নিজস্ব রাজনৈতিক কারণ ছিল। সেই সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশে শুভ-অশুভ মুহূর্ত এবং জ্যোতিষশাস্ত্রের বিশ্বাসের প্রভাব ছিল গভীর। সাম্রাজ্যের স্থিতিশীলতার সঙ্গেও অনেক সময় ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান এবং গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থানকে যুক্ত করে দেখা হত। তাই গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান সম্পর্কে নির্ভুল তথ্য পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হত। জয় সিং তাঁর বিখ্যাত বই 'জিজে মহম্মদ শাহী'তে ১০১৮টি তারার একটি নতুন ও অত্যন্ত নির্ভুল তালিকা দিয়েছিলেন। সূর্যবংশীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন জয় সিং। তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন, ভারতীয় পঞ্জিকা পদ্ধতিকে আরও নির্ভুল করে তোলার উদ্দেশ্যেই এই মানমন্দিরগুলি তৈরি করা হচ্ছে। এর ফলে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান এবং কৃষিকাজের জন্য প্রয়োজনীয় জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গণনা আরও নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠবে।
কীভাবে তৈরি হয়েছিল এই স্থাপত্য?
দিল্লির যন্তর মন্তর তৈরি হয়েছিল ইটের গাঁথনি এবং লাল চুনের প্রলেপ দিয়ে। অষ্টাদশ শতকের রাজপুত স্থাপত্যে এই ধরনের উপকরণের ব্যবহার ছিল প্রচলিত। যেখানে আরও বেশি নির্ভুলতা প্রয়োজন ছিল, সেখানে ব্যবহার করা হয়েছিল মার্বেল। এর ফলে যন্ত্রগুলির স্থায়িত্ব এবং পরিমাপের স্পষ্টতা বজায় রাখা সম্ভব হয়েছিল। তির্বিজ্ঞানে পারদর্শী গণিতজ্ঞ এবং দক্ষ রাজমিস্ত্রিরা একসঙ্গে কাজ করে এই মানমন্দির নির্মাণ করেছিলেন। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মজবুত থেকেছে যন্ত্রগুলি।
আজ যন্তর মন্তর শুধু একটি বৈজ্ঞানিক কেন্দ্র নয়, একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক স্মৃতিসৌধও। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় এর স্থান রয়েছে। ভারতের জ্ঞানচর্চা ও স্থাপত্যের ইতিহাসে এই স্থাপনার বিশেষ গুরুত্বই তার অন্যতম কারণ।