
গ্রেফতারি মেমোতে একটি টাইপোগ্রাফিক্যাল বা মুদ্রণজনিত ভুল থাকলেই কি কোনও অভিযুক্তের গ্রেফতার অবৈধ হয়ে যায়? আর সেই ত্রুটির ভিত্তিতেই কি একটি খুনের মামলায় জামিন বহাল রাখা যায়? এই গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে সুপ্রিম কোর্ট। প্রয়োজনে বিষয়টি বৃহত্তর বেঞ্চে পাঠানো হতে পারে বলেও বৃহস্পতিবার ইঙ্গিত দিয়েছে শীর্ষ আদালত।
মেঘালয়ের বহুল আলোচিত হানিমুন হত্যা মামলায় স্বামী রাজা রঘুবংশীকে হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত সোনম রঘুবংশীর জামিন বহাল রেখেছিল মেঘালয় হাইকোর্ট। কারণ, পুলিশের তৈরি করা গ্রেফতারি মেমোতে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার খুনের ধারা ১০৩(১)-এর পরিবর্তে ভুলবশত ৪০৩ ধারা উল্লেখ করা হয়েছিল।
এই আইনি ভিত্তি কতটা গ্রহণযোগ্য, তা খতিয়ে দেখছে বিচারপতি মনোজ মিশ্র ও বিচারপতি শ্রী চন্দ্রশেখরের ডিভিশন বেঞ্চ। আদালত ইতিমধ্যেই মেঘালয় পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছে, গ্রেফতারের সময় ব্যবহৃত মূল নথিপত্রের স্পষ্ট ও পাঠযোগ্য অনুলিপি জমা দিতে, যাতে বোঝা যায় অভিযুক্তকে ঠিক কী তথ্য জানানো হয়েছিল।
রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি
মেঘালয় সরকারের পক্ষে সওয়াল করতে গিয়ে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা বলেন, গ্রেফতারি মেমোতে ভুল ধারা লেখা নিছক একটি কেরানিগত বা টাইপোগ্রাফিক্যাল ত্রুটি। শুধু এই ধরনের নথিগত ভুলের ভিত্তিতে কোনও অভিযুক্তের গ্রেফতারকে অবৈধ ঘোষণা করা বা জামিন বহাল রাখা আইনসঙ্গত হতে পারে না।
তাঁর বক্তব্য, 'এটি অত্যন্ত গুরুতর একটি হত্যা মামলা। অভিযুক্ত দাবি করছেন, তাঁকে গ্রেফতারের লিখিত কারণ জানানো হয়নি। অথচ নথিতে দেখা যাচ্ছে, গ্রেফতারের সময়ই তাঁকে সেই কারণ জানানো হয়েছিল। কাগজে একটি কারিগরি ভুলের আড়ালে এত গুরুতর অপরাধকে আড়াল করা যায় না।'
মেহতা আরও বলেন, অভিযোগ অনুযায়ী, মধুচন্দ্রিমায় মেঘালয়ে গিয়ে সোনম পরিকল্পিতভাবে তাঁর স্বামীকে হত্যা করেন এবং দেহ একটি গভীর খাদে ফেলে দেন। তাই মামলার গুরুত্ব বিবেচনায় শুধু একটি টাইপোর কারণে জামিন বহাল রাখা উচিত নয়।
সুপ্রিম কোর্ট কী বলল?
তবে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, গ্রেফতারের সময় লিখিতভাবে কারণ জানানো বাধ্যতামূলক কি না এবং সেই প্রক্রিয়ায় ত্রুটি থাকলে তার আইনি প্রভাব কী হবে, তা নিয়ে অতীতে বিভিন্ন রায়ে ভিন্ন ভিন্ন মত প্রকাশ করা হয়েছে।
বিচারপতি মনোজ মিশ্র বলেন, 'আমরা বিষয়টি বিস্তারিতভাবে বিবেচনা করব। প্রয়োজনে এটি বৃহত্তর বেঞ্চে পাঠানোর বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।'
আদালত মৌখিকভাবে আরও পর্যবেক্ষণ করেছে, যদি দেখা যায় হাইকোর্ট যে আইনি ভিত্তিতে জামিন বহাল রেখেছিল তা গ্রহণযোগ্য নয়, তাহলে সেই জামিনের আদেশও টিকবে না।
বিতর্কের সূত্রপাত কীভাবে?
এই আইনি বিতর্কের সূত্রপাত মেঘালয় হাইকোর্টের একটি রায়কে কেন্দ্র করে। হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ছিল, পুলিশ গ্রেফতারের কারণ যথাযথভাবে জানাতে ব্যর্থ হয়েছে। পাশাপাশি গ্রেফতারি মেমোতে খুনের ধারা ১০৩(১)-এর পরিবর্তে ভুল করে ৪০৩ ধারা উল্লেখ করায় আদালত পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।
এই ত্রুটির ভিত্তিতেই নিম্ন আদালত গত ২৭ এপ্রিল সোনম রঘুবংশীকে জামিন দেয়। পরে ২৯ জুন মেঘালয় হাইকোর্টও রাজ্য সরকারের জামিন বাতিলের আবেদন খারিজ করে দেয়। এর আগে ৩ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের অন্য একটি বেঞ্চও হাইকোর্টের আদেশে অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দিতে অস্বীকার করেছিল।
কী এই হানিমুন হত্যা মামলা?
ইন্দোরের ব্যবসায়ী রাজা রঘুবংশী ও তাঁর স্ত্রী সোনম রঘুবংশী গত বছরের মে মাসে মধুচন্দ্রিমায় মেঘালয়ের সোহরা (চেরাপুঞ্জি) এলাকায় বেড়াতে যান। ২৩ মে তাঁরা নিখোঁজ হন। পরে ২ জুন একটি গভীর খাদ থেকে রাজা রঘুবংশীর দেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
তদন্তকারীদের অভিযোগ, এটি কোনও দুর্ঘটনা নয়। আর্থিক লাভের উদ্দেশ্যে সোনম ভাড়াটে খুনিদের সঙ্গে যোগসাজশ করে স্বামীকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিলেন। এই ঘটনায় সোনম, তাঁর প্রেমিক এবং আরও কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়।
এখন সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের দিকে নজর গোটা দেশের। কারণ, এই মামলার রায় শুধু সোনম রঘুবংশীর ভবিষ্যৎ নয়, গ্রেফতারি প্রক্রিয়ায় নথিগত ত্রুটির আইনি গুরুত্ব সম্পর্কেও একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির তৈরি করতে পারে।