
কেরলমের বিশিষ্ট মুসলিম ধর্মগুরু কান্থাপুরম এ পি আবুবকর মুসলিয়ারের একটি মন্তব্যকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মহিলাদের ঘরের মধ্যেই থাকা উচিত এবং তাঁদের জনপরিসরে প্রবেশ করা উচিত নয় বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। তাঁর দাবি, মহিলাদের মর্যাদা ও সম্মান রক্ষার জন্যই ইসলাম ধর্মে পর্দা প্রথার বিধান রয়েছে।
কোচিতে একটি ইসলামিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখার সময় এই মন্তব্য করেন কান্থাপুরম। তাঁর মুসলিম ধর্মীয় সংগঠনটি এই মর্মে ফতোয়াও জারি করেছে।
শেখ আবুবকর আহমদ নামেও পরিচিত এই ধর্মগুরুকে ভারতের দশম গ্র্যান্ড মুফতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তিনি বলেন, 'কোরানে মহিলাদের ঘরে থাকার এবং জনসমক্ষে না আসার কথা বলা হয়েছে। মহিলাদের তাঁদের ঘরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। তাঁদের জনপরিসরে প্রবেশ করা উচিত নয়। পবিত্র কোরানেও এমনটাই বলা হয়েছে।' তাঁর ব্যাখ্যা, এই নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য মহিলাদের মর্যাদা কমানো নয়, বরং তাঁদের সম্মান ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা। তাঁর দাবি, মহিলাদের জনসমক্ষে নিয়ে এলে 'অনর্থ' নেমে আসতে পারে। আর সেই কারণেই ইসলামে পর্দা প্রথার বিধান দেওয়া হয়েছে।
নিজের বক্তব্য বোঝাতে মহিলাদের সঙ্গে সোনার অলঙ্কারের তুলনাও করেন এই মুসলিম ধর্মগুরু। তিনি বলেন, 'কোনও গয়নার দোকান থেকে একটি সোনার নেকলেস কেনার পর সেটিকে খুব যত্ন করে আলমারি, বাক্স এবং তার মোড়কের মধ্যে রাখা হয়। পরে ক্রেতাকে দেখানোর সময় সেগুলি একে একে খুলে হারটি বের করা হয়।' তিনি পাথরের তৈরি শিলনোড়ার উদাহরণ দেন। তাঁর কথায়, 'শিলনোড়া রাস্তার ধারে রাখা যেতে পারে। মানুষ তার পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে পারে, এমনকী তার উপর পা-ও দিতে পারে। কিন্তু একইভাবে যদি কোনও সোনার হার রাস্তার ধারে ফেলে রাখা হয়, তাহলে মানুষ সেটি ছোঁবে এবং ধীরে ধীরে তার সৌন্দর্য ও মূল্য নষ্ট হয়ে যাবে।'
মুসলিম ধর্মগুরু কান্থাপুরম আরও বলেন, 'হারটির সৌন্দর্য ধরে রাখতে হলে সেটিকে একটি বাক্সের মধ্যে নিরাপদে রাখতে হবে। খারাপ ধরনের পরিণতি এড়াতেই পর্দার বিধান দেওয়া হয়েছে।'
কান্থাপুরমের এই মন্তব্যের কয়েক দিন আগেই সামস্তা কেরালা জামিয়াতুল উলামার কান্থাপুরম গোষ্ঠী একটি সার্কুলার জারি করেছিল। সেখানে মহিলাদের পুরুষদের সঙ্গে একই মঞ্চে না ওঠা এবং জনসমক্ষে পুরুষদের পাশে উপস্থিত না হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। ওই নির্দেশিকা নিয়ে একাধিক মহিলা রাজনৈতিক নেত্রী সমালোচনা করেছিলেন।
তবে নিজের অবস্থানেই অনড় থেকেছেন কান্থাপুরম। তাঁর দাবি, ধর্মীয় পণ্ডিতদের, বিশেষ করে সামস্তা নেতাদের কাছ থেকে গত প্রায় ১০০ বছর ধরে এই ধরনের শিক্ষা মিলছে। তাঁর বক্তব্য, 'এই শিক্ষার ফলে মহিলারা তাঁদের ম্মান ও মর্যাদা বজায় রাখতে পেরেছেন।'
একইসঙ্গে ইসলাম ঐতিহাসিকভাবে মহিলাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে বলেও দাবি করেন তিনি। ইসলাম-পূর্ব আরবের প্রসঙ্গ তুলে কান্থাপুরম বলেন, 'ইসলাম কন্যাসন্তান হত্যা নিষিদ্ধ করেছিল এবং মহিলাদের সম্পত্তি ও উত্তরাধিকারের অধিকার দিয়েছিল, এমন এক সময়ে যখন এই অধিকার স্বীকৃত ছিল না। ইসলাম মহিলাদের একটি মহান মর্যাদা দিয়েছে। তবে একইসঙ্গে জনজীবনে মহিলাদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধকেও সম্মান ও সুরক্ষার একটি রূপ হিসেবে বোঝা উচিত।' তাঁর সংযোজন, 'আমরা ধর্ম নিয়ে পড়াশোনা করেছি। তাই এই কথা বলা আমাদের কর্তব্য। আমরা বলব এবং বলে যাব। কেউ আমাদের থামাতে পারবে না।'
তাঁর মন্তব্যের সমালোচনা করেছেন রাজনৈতিক নেতারা। প্রবীণ CPIM নেত্রী পি কে শ্রীমতী এই মন্তব্যকে নারীবিদ্বেষী বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, 'কেরলমের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটাই বদলে গিয়েছে।'