
বর্ষার মরসুম শেষ হওয়ার আগেই মহারাষ্ট্র জল সঙ্কটের সম্মুখীন। এল নিনোর প্রভাবে এই বছর রাজ্যে বৃষ্টিপাত উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কম হয়েছে, যার ফলে জলের ভান্ডার সীমিত হয়ে পড়েছে। সম্ভাব্য খরা পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য, জলসম্পদ বিভাগ ২০২৭ সালের ৩১ অগাস্ট পর্যন্ত বিস্তারিত জল ম্যানেজমেন্ট পরিকল্পনা তৈরি করেছে। এই পরিকল্পনায় প্রতিটি বাঁধ এবং তার জল ব্যবহারের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। জলসম্পদ মন্ত্রী গিরিশ মহাজন ঘোষণা করেছেন, মানুষ যাতে জলের অভাবে না ভোগে তা নিশ্চিত করতে পানীয় জলকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ফলস্বরূপ, সমস্ত পৌর সংস্থাকে ২০২৬ সালের ১৬ অক্টোবর থেকে কমপক্ষে ১০ শতাংশ জল সরবরাহ কমানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ইতিমধ্যেই মহারাষ্ট্রের ২৬৫টি তালুকে খরা ঘোষণা করা হয়েছে, যেখানে ২০১৬ সালের খরিফ মরসুমের নিয়ম অনুযায়ী ‘ট্রিগার-১’ পরিস্থিতি দেখা গেছে। মহাজন জানিয়েছেন, আগামী বছর পর্যন্ত এল নিনো অব্যাহত থাকার সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখে, জলসম্পদ বিভাগ সমস্ত সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে বিচক্ষণতার সঙ্গে জল ব্যবহার করতে এবং কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য স্পষ্ট নির্দেশ জারি করেছে।
এই পরিস্থিতি শুধু মহারাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ নেই। প্রতিবেশী গুজরাত জুড়েও বাঁধের জলস্তর নীচে রয়েছে। অন্যদিকে কৃষক ও সম্প্রদায়গুলি জল সঙ্কটের সম্মুখীন হওয়ায় কর্ণাটক খরা ত্রাণ হিসাবে হাজার হাজার কোটি টাকা চেয়েছে। কর্নাটকে মুখ্যমন্ত্রী ডিকে শিবকুমার কেন্দ্রের কাছে খরা ত্রাণ বাবদ ৭,১৪২.৬৪ কোটি টাকা চেয়েছেন। রাজ্যের ২৪০টি তালুকের মধ্যে ২১৭টিকে খরা-আক্রান্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং এর মধ্যে ১৭৭টিকে সরকারিভাবে খরা-পীড়িত ঘোষণা করা হয়েছে। গুজরাতের চিত্রটি আরও জটিল। রাজ্য জরুরি কার্যক্রম কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসের শেষে রাজ্যের ২০৬টি বাঁধের মধ্যে ১০৯টির ধারণক্ষমতা ৫০ শতাংশের নিচে ছিল।
এল নিনো তীব্র হচ্ছে
এল নিনো তীব্র হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে অক্টোবর মাসে পশ্চিমবঙ্গসহ দেশের বেশিরভাগ অংশে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের থেকে বেশি থাকবে। পূর্বাভাস দিয়েছে কেন্দ্রীয় আবহাওয়া দফতর। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে পশ্চিমবঙ্গসহ দেশের বড়ো অংশে স্বাভাবিকের থেকে কম বৃষ্টিপাতেরও পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। বর্ষাকালীন পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ের আবহাওয়ার পূর্বাভাস নিয়ে দিল্লির মৌসম ভবন থেকে ভার্চুয়াল সাংবাদিক বৈঠক করেন কেন্দ্রীয় আবহাওয়া দফতরের ডিজি মৃত্যুঞ্জয় মহাপাত্র। তিনি জানান, দেশে এবার জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাসে বর্ষাকালীন বৃষ্টি সার্বিকভাবে দীর্ঘকালীন গড়ের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ (১২.৫৭) কম হয়েছে। কম বৃষ্টিপাতের নিরিখে ১৯০১ সাল থেকে এটা ছিল ১৩তম। ২০০১ সাল থেকে ধরলে চতুর্থ। ২০১৫ সালে দেশে ১২.৭ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছিল। আবহাওয়া দফতরের শীর্ষকর্তা জানান, বর্ষা বিদায়ের প্রক্রিয়া দেশে ফের শুরু হতে চলেছে। ১৫ অক্টোবরে স্বাভাবিক সময়ের মধ্যে গোটা দেশ থেকে বর্ষা বিদায় নেবে। আপাতত এমনই ভাবছে আবহাওয়া দফতর।
এল নিনো যে এবার তীব্রতর হতে চলেছে তা বেশকিছু দিন ধরেই বলছে আবহাওয়া সংস্থাগুলি। এর জেরে তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রচুর প্রাণহানি ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় হতে পারে। এমন আশঙ্কা প্রকাশ পেয়েছে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণামূলক রিপোর্টে। মৃত্যুঞ্জয় মহাপাত্র জানান, নভেম্বর মাসে এল নিনোর তীব্রতা সবথেকে বেশি থাকবে। আগামী মার্চ পর্যন্ত এল নিনো পরিস্থিতি থাকবে। ভারত মহাসাগরের ডাইপোল পরিস্থিতি পজিটিভ হলে তা এল নিনোর নেতিবাচক দিক কিছুটা আটকায় বলে মনে করা হয়। বর্ষাকালে ডাইপোল পরিস্থিতি নিউট্রাল ছিল। আবহাওয়া কর্তা জানান, মাঝেমধ্যে কিছুটা পজিটিভ হলেও ডাইপোল আগামী দিনে নিউট্রাল থাকবে বলেই মনে করা হচ্ছে। তবে এল নিনো পরিস্থিতি ভারতে বর্ষার উপর কতটা প্রভাব ফেলে প্রশ্ন তা নিয়েও। আবহাওয়া দফতর যে রিপোর্ট দিয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে জুন মাস পর্যন্ত এল নিনো দুর্বল ছিল। কিন্তু জুন মাসে দেশে সবথেকে কম বৃষ্টি হয়েছে। জুলাই ও অগাস্ট মাসে এল নিনো মাঝারি শক্তিশালী হলেও দেশে বৃষ্টি বাড়ে। বিশেষ করে জুলাইয়ে স্বাভাবিকের থেকে বেশি বৃষ্টি হয়েছে। এল নিনো খুব শক্তিশালী হয়েছে সেপ্টেম্বরে। কিন্তু সেপ্টেম্বরে নিম্নচাপের প্রভাবে দেশে অনেক জায়গায় প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে। এবার বর্ষাকালে বিভিন্ন তীব্রতার নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়েছিল ১৪টি, যা স্বাভাবিক। নিম্নচাপ ঠিকঠাক না-হলে বৃষ্টির ঘাটতি অনেক বেশিই হত।
এদিকে এল নিনোর হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার তার শস্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা কমিয়েছে। কেন্দ্র জানিয়েছে যে, ২০২৬-২৭ শস্য বছরের (জুলাই-জুন) জন্য শস্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৩৭৩.৯৩ মিলিয়ন টন করা হয়েছে। এটি ২০২৬-২৭ শস্য বছরের প্রকৃত উৎপাদন ৩৭৬.৫৬ মিলিয়ন টনের চেয়ে প্রায় ২.৬৩ মিলিয়ন টন কম। তবে, এবারের লক্ষ্যমাত্রাটি ২০২৫-২৬ সালের জন্য নির্ধারিত ৩৬২ মিলিয়ন টনের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি।
এল নিনো ও শীত
আইএমডি-র অনুমান অনুযায়ী, নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে প্রশান্ত মহাসাগরীয় এল নিনো পরিস্থিতি আরও শক্তিশালী হতে পারে। এর ফলে ভবিষ্যতের আবহাওয়ার ওপর প্রভাব পড়তে পারে এবং তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ বছর শীতকালও তুলনামূলকভাবে হালকা হতে পারে।