
মেয়েদের মানুষের মতো মানুষ করতে চেয়েছিলেন। সেই জন্য সারাজীবন চেষ্টার কোনও অন্ত রাখেননি। কিন্তু সেই বাবারই শেষযাত্রায় কোনও মেয়ে পাশে থাকলেন না। উল্টে তাঁর তিন মেয়ে নেপাল, উত্তরপ্রদেশ এবং মুম্বই থেকে ভিডিও কলের মাধ্যমে বাবার শেষকৃত্য দেখলেন। এমনই ঘটনার সাক্ষী থাকল হরিয়ানা।
মুম্বইয়ের বাসিন্দা এবং পেশায় প্রাক্তন বস্ত্র ব্যবসায়ী শিবচরণ রামরতন গুপ্ত গত দেড় বছর ধরে সোনিপতের পশ্চিম রামনগরে সমাজ কল্যাণ শিক্ষা সমিতি পরিচালিত একটি বৃদ্ধাশ্রমে থাকতেন। স্ত্রী মীনা গুপ্তকে নিয়ে তিনি সেখানে এসেছিলেন। তবে তাঁর স্ত্রী আগেই প্রয়াত হন।
দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৩টা নাগাদ শিবচরণেরও মৃত্যু হয়। এরপর বৃদ্ধাশ্রম কর্তৃপক্ষ তাঁর তিন মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
ভিডিও কলে বাবার শেষকৃত্য
মেয়েদের অদ্ভুত আচরণ নিয়ে মুখ খুলেছেন বৃদ্ধাশ্রমের প্রশাসক আনন্দ কুমার। তিনি জানান, শিবচরণের কাছে একটি মোবাইল ফোন ছিল। সেটির মাধ্যমে তিনি নিয়মিত মেয়েদের সঙ্গে কথা বলতেন। কিন্তু অসুস্থ হয়ে হয়ে পড়ার পর সেই যোগাযোগও ধীরে ধীরে কমে যায়।
আনন্দ কুমারের দাবি, মৃত্যুর প্রায় ২০ দিন আগে বাবার শারীরিক অবস্থার অবনতির কথা মেয়েদেরকে জানানো হয়েছিল। তবুও তাঁরা দেখতে আসেননি।
এরপর শিবচরণের মৃত্যুর পর আবারও মেয়েদের জানানো হয়। সোনিপতে এসে শেষকৃত্যে যোগ দেওয়ার অনুরোধ করা হয়। কিন্তু তাঁরা সময়ের অভাবের কথা শুনিয়ে আসতে পারবেন না বলে জানান।
শেষ পর্যন্ত বৃদ্ধাশ্রমের কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় বাসিন্দারাই শিবচরণ রামরতন গুপ্তর শেষকৃত্য সম্পন্ন করেন। আর তাঁর তিন মেয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত এবং নেপাল থেকে ভিডিও কলে সেই শেষ বিদায়ের সাক্ষী থাকেন।
যতদূর জানা যাচ্ছে, নেপালে বসবাসকারী পেশায় শিক্ষিকা বড় মেয়ে অনিতা অনলাইনে ৫,১০০ টাকা পাঠান। এর মাধ্যমেই বাবার শেষকৃত্য করার অনুরোধ করেন।
শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়ার পর মেয়েরা বৃদ্ধাশ্রম কর্তৃপক্ষকে পুরো অনুষ্ঠানের ভিডিও পাঠানোরও অনুরোধ করেন। ভিডিও কলে এক মেয়েকে বলতে শোনা যায়, 'আর কতক্ষণ লাগবে? আমাদের খেতে হবে, স্নানও করতে হবে।'
তিন মেয়েকে উচ্চশিক্ষিত করেছিলেন বাবা
বৃদ্ধাশ্রম সূত্রে জানা গিয়েছে, শিবচরণ তাঁর তিন মেয়ের পড়াশোনার জন্য সারাজীবন পরিশ্রম করেছেন। তাঁদের ভাল শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন। মেয়েদের সাফল্য নিয়ে তিনি গর্ব করতেন। তাঁর দুই মেয়ে বর্তমানে শিক্ষকতা করেন।
বড় মেয়ে অনিতা নেপালে থাকেন। দ্বিতীয় মেয়ে নিশা উত্তরপ্রদেশের আজমগড়ে থাকেন। ছোট মেয়ে প্রিয়া মুম্বইয়ে থাকেন। তিন জনেরই বিয়ে হয়েছে। তাঁদের নিজস্ব পরিবার রয়েছে।
প্রথমে পরিবারের পক্ষ থেকে শিবচরণের অস্থি সংরক্ষণ করার কথা বলা হয়েছিল। পরে তাঁরা জানান, সোনিপতে আসার সময় নেই। তাই বৃদ্ধাশ্রম কর্তৃপক্ষকেই গঙ্গায় তাঁর অস্থি বিসর্জনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। আর এই ঘটনা সামনে আসার পর থেকেই চারিদিকে নিন্দার ঝড়। সোশ্যাল মিডিয়ায় মেয়েদের কর্তব্যজ্ঞান নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠেছে।
মৃত্যুর পর চক্ষুদান
শিবচরণবাবুর মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের ইচ্ছানুসারে তাঁর চক্ষুদানও করা হয়। ফলে তাঁর দু'টি চোখ অন্য কারও জীবনে আলো ফিরিয়ে আনতে পারে।