
দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনে তরুণ প্রজন্মের পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন নেহা বোরা। কখনও নিট-ইউজি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ঘিরে প্রতিবাদ, কখনও দীর্ঘ অনশন, আবার কখনও ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR নিয়ে আন্দোলন, বিভিন্ন ইস্যুতে তাঁকে সামনের সারিতে দেখা গিয়েছে। সম্প্রতি দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া এবং পুলিশের হাতে আটক হওয়ার ঘটনাও তাঁকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। অনেকে মনে করছেন নেহা বোরা পরিচিত দুই বাম দল CPI বা CPI(M)-এর সদস্য। কিন্তু, নেহা আগে উল্লেখিত দুই দলের কোনওটিরও সদস্য নন।
CPI বা CPI(M) নয়, নেহার সংগঠন কোনটি?
নেহা বোরার বর্তমান সাংগঠনিক পরিচয় হল অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (AISA)-র সর্বভারতীয় সভানেত্রী। AISA একটি বামপন্থী ছাত্র সংগঠন। যেটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯০ সালে। সংগঠনটির ঘোষিত লক্ষ্য ছাত্রদের অধিকার রক্ষা, শিক্ষার গণতন্ত্রীকরণ, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখা।
AISA-র নিজস্ব ঘোষণাপত্রে CPI(ML)-কে নিজেদের রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে সম্পর্কিত কমিউনিস্ট পার্টি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা রয়েছে। সংগঠনটি শ্রমিক, কৃষক এবং বৃহত্তর গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে ছাত্র আন্দোলনের সংহতির কথাও বলে। সেই সূত্রেই AISA-র রাজনৈতিক যোগসূত্র CPI(ML) Liberation-এর সঙ্গে। CPI(M), CPI বা RSP-র সঙ্গে নয়। আরও সহজভাবে বললে SFI যেমন CPI(M)-এর ছাত্র সংগঠন তেমনই AISA-ও CPI(ML) Liberation-এর ছাত্র সংগঠন।
এই দলের বর্তমান পরিস্থিতি
CPI(ML) Liberation-এর বর্তমানে লোকসভায় ২ জন সাংসদ এবং বিহার ও ঝাড়খণ্ডের বিধানসভা মিলিয়ে ৪ জন বিধায়ক রয়েছেন। বিহার থেকে লোকসভার সাংসদ রাজা রাম সিং (কারাকাট) ও সুদামা প্রসাদ (আরা)। বিধায়কদের মধ্যে বিহারের সন্দীপ সৌরভ (পালিগঞ্জ) ও অরুণ সিং (কারাকাট) রয়েছেন। ঝাড়খণ্ডের বিধায়ক অরূপ চট্টোপাধ্যায় (নিরসা) ও চন্দ্রদেও মাহাতো (সিন্দরি)। অর্থাৎ, দুই সাংসদ ও চার বিধায়ক মিলিয়ে মোট ছ’জন জনপ্রতিনিধি রয়েছেন এই দলের।
CPI(ML) Liberation ও চারু মজুমদারের সঙ্গে সম্পর্ক
CPI(ML) Liberation-এর ইতিহাস বুঝতে গেলে ফিরে যেতে হয় ১৯৬০-এর দশকের শেষ দিকে। ১৯৩৮ সালে চারু মজুমদার CPI দলে যোগ দেন। ১৯৬৪ সালে আদর্শগত পার্থক্যের কারণে CPI ভেঙে যখন CPI(M) গঠিত হয়, তখন তিনি নতুন দলে নাম লেখান। পরবর্তীতে তিনি উত্তরবঙ্গে এই দলের ভেতরেই একটি উগ্র-বামপন্থী গোষ্ঠী বা উপদল গড়ে তোলেন। ১৯৬৭ সালের মে মাসে উত্তরবঙ্গের নকশালবাড়িতে কৃষক অভ্যুত্থান ভারতের কমিউনিস্ট রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আনে। এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন চারু মজুমদার-সহ একাধিক বিপ্লবী কমিউনিস্ট নেতা। জমি, কৃষকের অধিকার এবং রাষ্ট্রক্ষমতার বিরুদ্ধে বিপ্লবী সংগ্রামের প্রশ্নে তৎকালীন কমিউনিস্ট আন্দোলনের ভিতরে মতপার্থক্য তীব্র হয়।
এরপর ১৯৬৯ সালের গঠিত হয় Communist Party of India (Marxist-Leninist), সংক্ষেপে CPI(ML)। চারু মজুমদার এই দলের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হন। প্রথম পর্বে সংগঠনটি সশস্ত্র সংগ্রাম ও গেরিলা যুদ্ধের কৌশল গ্রহণ করেছিল। পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, নেতৃত্বের মৃত্যু এবং মতাদর্শগত বিভাজনের কারণে আন্দোলনটি একাধিক সংকটের মুখে পড়ে।
চারু মজুমদার ১৯৭২ সালে পুলিশের হেফাজতে মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পর CPI(ML)-এর বিভিন্ন অংশের মধ্যে কৌশল ও রাজনৈতিক পথ নিয়ে বিভাজন তৈরি হয়। CPI(ML) Liberation নিজেদের ইতিহাসকে সেই বিপ্লবী কমিউনিস্ট ধারার উত্তরাধিকার হিসেবে তুলে ধরে। দলটির ইতিহাস অনুযায়ী, ১৯৭৪ সালে জওহর, বিনোদ মিশ্র এবং অন্য নেতাদের উদ্যোগে সংগঠনটি পুনর্গঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে এই ধারার রাজনীতিতে গণআন্দোলন ও নির্বাচনী রাজনীতিতে অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
অর্থাৎ, চারু মজুমদারের সঙ্গে CPI(ML)-এর ঐতিহাসিক যোগ সরাসরি। CPI(ML) Liberation সেই বৃহত্তর কমিউনিস্ট আন্দোলনের একটি ধারার উত্তরাধিকার দাবি করে। কিন্তু ১৯৬৯ সালের মূল CPI(ML) এবং পরবর্তী সময়ে পুনর্গঠিত CPI(ML) Liberation-এর ইতিহাসকে একেবারে অভিন্ন বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। সময়ের সঙ্গে সংগঠনের রাজনৈতিক কৌশল ও কার্যপদ্ধতিতেও পরিবর্তন এসেছে।
AISA-র জন্ম কীভাবে?
AISA গঠিত হয় ১৯৯০ সালে। সংগঠনটির নিজস্ব ইতিহাস অনুযায়ী, নকশালবাড়ির কৃষক আন্দোলন থেকে অনুপ্রাণিত ছাত্র আন্দোলন এবং ১৯৭৪ সালের বিহারের গণআন্দোলনের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে একটি সর্বভারতীয় ছাত্র সংগঠনের প্রয়োজন থেকেই এর জন্ম।
AISA-র ঘোষিত রাজনৈতিক অবস্থানের কেন্দ্রে রয়েছে শিক্ষার অধিকার, ফি বৃদ্ধি ও শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের বিরোধিতা, কর্মসংস্থানের দাবি, ক্যাম্পাসে গণতন্ত্র এবং সাম্প্রদায়িকতা ও জাতিভিত্তিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই। সংগঠনটি নিজেদের বামপন্থী, বিপ্লবী ও গণতান্ত্রিক ছাত্র আন্দোলনের অংশ হিসেবে পরিচয় দেয়। CPI(ML) Liberation-এর সঙ্গে তার আদর্শগত সম্পর্কও এই রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যেই স্পষ্ট হয়।
কেন জাতীয় স্তরে আলোচনায় নেহা বোরা?
নেহার পরিচিতি বাড়ার পিছনে রয়েছে একাধিক আন্দোলন। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা CAA-বিরোধী আন্দোলনের সময় থেকেই তিনি প্রতিবাদী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। পরে ছাত্রদের অধিকার, পরীক্ষায় অনিয়ম এবং নিট-ইউজি প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ নিয়ে আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা নেন। আনন্দবাজারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে দিল্লির যন্তর মন্তরে নিট-ইউজি পরীক্ষার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দাবিতে আন্দোলনের সময় তিনি জাতীয় স্তরে বেশি পরিচিতি পান।
এই আন্দোলনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল তাঁর ২৩ দিনের অনশন। সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকের সঙ্গে রাজধানীতে অনশনে অংশ নেন নেহা। পরীক্ষাব্যবস্থার স্বচ্ছতা, শিক্ষার্থীদের অধিকার এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি ঘিরে আন্দোলনের জেরে তাঁর নাম সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে।
এর পর ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR-এ অনিয়মের অভিযোগ এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লির বিক্ষোভেও সক্রিয় হন তিনি। ১০ অক্টোবর ২০২৬-এর বিক্ষোভে পুলিশের বাধা ও আটক হওয়ার ঘটনা তাঁকে আবারও সংবাদ শিরোনামে নিয়ে আসে। সাম্প্রতিক সময়ে ‘One Piece’ লোগো-যুক্ত টি-শার্ট পরে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার ছবিও সামাজিক মাধ্যমে আলোচনার বিষয় হয়েছে।
নেহার রাজনীতি কোন দিকে?
নেহার বক্তব্যে বামপন্থী আদর্শ, ধর্মনিরপেক্ষতা, শিক্ষার অধিকার এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির দাবি বারবার উঠে আসে। তিনি বিভিন্ন আন্দোলনে শুধু ছাত্রদের সমস্যা নয়, ভোটাধিকার, নাগরিক অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে মতভেদ থাকলেও ছাত্র আন্দোলনের মঞ্চ থেকে বৃহত্তর রাজনৈতিক ইস্যুতে তাঁর সক্রিয়তা তাঁকে তরুণ প্রজন্মের এক পরিচিত প্রতিবাদী মুখে পরিণত করেছে।
তবে নেহা বোরাকে বুঝতে গেলে শুধু সাম্প্রতিক বিক্ষোভ বা সামাজিক মাধ্যমে তাঁর জনপ্রিয়তার দিকে তাকালে হবে না। তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলায় কাটানো ছাত্রজীবন, নাটকের মাধ্যমে রাজনীতির সঙ্গে পরিচয়, AISA-র ছাত্র আন্দোলন এবং CPI(ML) Liberation-এর দীর্ঘ কমিউনিস্ট রাজনৈতিক ইতিহাস।
নেহার ব্যক্তিগত জীবন
নেহা বোরা উত্তরাখণ্ডের বাসিন্দা। তাঁর বাবা সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। সেই সূত্রে পরিবারের সঙ্গে কয়েক বছর পশ্চিমবঙ্গে কাটিয়েছেন তিনি। শিলিগুড়িতে মাধ্যমিক, একাদশ শ্রেণি এবং উচ্চ মাধ্যমিকের পড়াশোনা করেন। পরে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং অম্বেদকর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ আর্টস অ্যান্ড এস্থেটিক্সে পিএইচডি করছেন।