
আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন AISA-র সভানেত্রী নেহা বোরা। তবে এবার তাঁকে ছাড়িয়ে গেল তাঁরই পরা টি শার্ট। দেখা যাচ্ছে সেই টি-শার্টে আঁকা রয়েছে একটি খুলি, নীচে লেখা ‘ওয়ান পিস’। আর তা দেখেশুনে অনেকে জানতে চাইছেন, এই প্রতীকের অর্থ কী? অনেকে দাবি করছেন, এই প্রতীক শুধুই জনপ্রিয় জাপানি অ্যানিমে ও মাঙ্গা সিরিজের পরিচিত চিহ্ন। তবে তা সঠিক নয়। আসুন জানি এই প্রতীক সম্পর্কে।
জলদস্যুদের পতাকা থেকে খুলি ও হাড়ের প্রতীক
খুলি ও হাড়ের ছবি-সহ পতাকার ব্যবহার কয়েক শতাব্দী পুরনো। সপ্তদশ শতকের শেষ ভাগে জলদস্যুদের এমন পতাকার উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রায় ১৭০০ সালের দিকে জলদস্যু ইমানুয়েল উইনের ব্যবহৃত একটি পতাকায় খুলি, হাড় এবং ঘণ্টার মতো চিহ্নের উল্লেখ রয়েছে।
সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে বিভিন্ন জলদস্যু নিজেদের পরিচয় বোঝাতে নানা নকশার পতাকা ব্যবহার করতেন। কালো পতাকা অনেক ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের জাহাজকে ভয় দেখিয়ে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার সংকেত হিসেবে ব্যবহৃত হত। লাল পতাকা কখনও আরও প্রাণঘাতী আক্রমণের ইঙ্গিত দিত।
খুলি, হাড়, কঙ্কাল, তরোয়াল বা ঘণ্টার মতো চিহ্নের সঙ্গে মৃত্যু ও বিপদের ধারণা জড়িয়ে ছিল। সমুদ্রে দূর থেকে এই পতাকা দেখেই প্রতিপক্ষকে সিদ্ধান্ত নিতে হত, তারা লড়াই করবে, নাকি আত্মসমর্পণ করবে। ফলে পতাকা শুধুমাত্র পরিচয়ের মাধ্যম ছিল না, ভয় তৈরি করার কৌশল হিসেবেও ব্যবহৃত হত।
‘ওয়ান পিস’-এ কীভাবে নতুন পরিচয় পেল এই প্রতীক?
১৯৯৭ সালে জাপানি মাঙ্গা শিল্পী ইইচিরো ওদা ‘ওয়ান পিস’ নামে একটি মাঙ্গা সিরিজ শুরু করেন। জলদস্যুদের জগৎকে কেন্দ্র করে তৈরি এই গল্পের প্রধান চরিত্র মাঙ্কি ডি. লুফি। তার স্বপ্ন বিশ্বের সবচেয়ে বড় জলদস্যু বা ‘পাইরেট কিং’ হওয়া। সেই লক্ষ্যে নিজের সঙ্গীদের নিয়ে সমুদ্রযাত্রা করে সে। তাদের উদ্দেশ্য ‘ওয়ান পিস’ নামের রহস্যময় গুপ্তধনের সন্ধান পাওয়া।
লুফি ও তার সঙ্গীদের দল পরিচিত ‘স্ট্র হ্যাট পাইরেটস’ নামে। তাদের পতাকায় রয়েছে একটি খুলি, যার মাথায় দেখা যায় স্ট্র হ্যাট বা খড়ের টুপি। এই নকশাই ‘ওয়ান পিস’-এর অন্যতম পরিচিত প্রতীক।
গল্পে এই জলদস্যুরা শুধু গুপ্তধনের সন্ধান করে না। বিভিন্ন সময়ে তারা অত্যাচারী শাসক ও ক্ষমতাশালী শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, বিপদে পড়া মানুষকে সাহায্য করে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে। সেই কারণে সিরিজটির এই প্রতীক জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে স্বাধীনতা, প্রতিরোধ এবং কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার ধারণার সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে।
নেপালের Gen-Z আন্দোলনেও দেখা গিয়েছিল ‘ওয়ান পিস’-এর পতাকা
‘ওয়ান পিস’-এর প্রতীক শুধু বিনোদনের জগতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। নেপালে তরুণ প্রজন্মের আন্দোলনেও এই পতাকা দেখা গিয়েছিল। সমাজমাধ্যমের উপর নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদ থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন পরে আরও বিস্তৃত হয়। তরুণদের একাংশ ‘স্ট্র হ্যাট পাইরেটস’-এর পতাকাকে সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং পরিবর্তনের দাবির প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেন।
আন্দোলন ঘিরে সংঘর্ষে একাধিক মানুষের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল। শেষ পর্যন্ত তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি পদত্যাগ করেন। এই প্রেক্ষাপটে জনপ্রিয় মাঙ্গা সিরিজের প্রতীকটি তরুণদের প্রতিবাদের দৃশ্যমান চিহ্ন হিসেবে আন্তর্জাতিক আলোচনায় উঠে আসে।
ইন্দোনেশিয়াতেও সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক
২০২৫ সালে ইন্দোনেশিয়াতেও ‘ওয়ান পিস’-এর পতাকা বিভিন্ন জায়গায় দেখা যায়। বাড়ি, গাড়ি, মোটরবাইক ও ট্রাকে এই পতাকা লাগানোর প্রবণতা নজরে আসে। প্রথম দিকে ট্রাকচালকদের একাংশ সরকারের নীতি এবং অতিরিক্ত পণ্য বহন সংক্রান্ত নিয়ম নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করতে এই প্রতীক ব্যবহার করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে তরুণদের বিক্ষোভেও পতাকাটি দেখা যায়। এর ফলে ‘ওয়ান পিস’-এর খুলি ও টুপির নকশা জনপ্রিয় সংস্কৃতির পরিচিত চিহ্নের পাশাপাশি প্রতিবাদের ভাষা হিসেবেও আলোচনায় আসে।
নেহা বোরার টি-শার্টের তাৎপর্য কী?
দিল্লির বিক্ষোভে নেহা বোরার টি-শার্টে ‘ওয়ান পিস’-এর প্রতীক দেখা যাওয়ার পর এই প্রসঙ্গ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে শুধুমাত্র এই টি-শার্ট পরার ভিত্তিতে নেহা কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বার্তা দিতে চেয়েছেন, এমন সিদ্ধান্তে আসা না গেলেও বলা যায়, ‘ওয়ান পিস’-এর জনপ্রিয়তা এখন তুঙ্গে। বিভিন্ন দেশের তরুণদের আন্দোলনে এর ব্যবহার দেখা যাচ্ছে।